পলিন হ্যানসনের প্রত্যাবর্তন: অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে নতুন ঝড়
একসময় যাঁকে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির প্রান্তিক ও বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে দেখত মূলধারা, সেই পলিন হ্যানসনই এখন দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছেন।
অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান, বাড়িভাড়া ও মর্টগেজের চাপ, জ্বালানির বাড়তি খরচ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে সামনে রেখে হ্যানসনের ‘ওয়ান নেশন’ আবারও দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপের ফলাফল যদি কোনো ইঙ্গিত দিয়ে থাকে, তাহলে ২০২৮ সালের ফেডারেল নির্বাচনের আগে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন এখন শুধু পলিন হ্যানসন কতটা জনপ্রিয় হচ্ছেন, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কেন আবারও অস্ট্রেলিয়ার ভোটারদের একটি অংশ তাঁর কথা শুনতে শুরু করেছে?
ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকান থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
১৯৫৪ সালের ২৭ মে ব্রিসবেনের একটি শহরতলিতে জন্ম নেওয়া পলিন হ্যানসন মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি একটি ফিশ অ্যান্ড চিপসের দোকান পরিচালনা করেন।
১৯৯৬ সালে ফেডারেল পার্লামেন্টে প্রবেশের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান শুরু হয়। এরপর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশটির অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
১৯৯৭ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ান নেশন’ পার্টি অল্প সময়ের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে অভ্যন্তরীণ সংকট, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে পরবর্তী সময়ে দলটি বেশ কয়েক বছর প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়।
একসময় অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশের কাছে পলিন হ্যানসন ছিলেন অত্যন্ত অজনপ্রিয় একটি নাম। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্নের মুখে তাঁকে প্রায়ই অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যেত। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি নিয়েও তখন কম আলোচনা-সমালোচনা হয়নি।
অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান সাময়িক। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর দেখা যাচ্ছে, সেই ধারণা পুরোপুরি ঠিক ছিল না।
আবারও শক্তিশালী হচ্ছে ওয়ান নেশন
২০২৫ সালের নির্বাচনে সিনেটে ওয়ান নেশানের চারটি আসন লাভ এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার একটি উপনির্বাচনে দলের সাফল্য দেখিয়েছে, দলটির প্রভাব এখন কুইন্সল্যান্ডের বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সাম্প্রতিক জনমত জরিপ।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর News24/YouGov Pulse জরিপ অনুযায়ী, ওয়ান নেশানের প্রাইমারি ভোটের সমর্থন ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। একই জরিপে লেবারের সমর্থন ২৬ শতাংশ এবং কোয়ালিশনের ১৮ শতাংশ।
এটি যদি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় পরিণত হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কবার্তা।
অভিবাসনের পাশাপাশি অর্থনীতিও বড় ইস্যু
অভিবাসন এখনও পলিন হ্যানসনের রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর রাজনৈতিক বার্তা শুধু অভিবাসনকেন্দ্রিক নয়।
মর্টগেজের চাপ, বাড়িভাড়া, জ্বালানির মূল্য এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষকেও তিনি রাজনৈতিক সমর্থনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এখানেই লেবার ও কোয়ালিশন, উভয় দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
ওয়ান নেশন যদি লেবারের প্রতি অসন্তুষ্ট ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারে, একই সঙ্গে কোয়ালিশনের ঐতিহ্যগত ডানঘেঁষা ভোটব্যাংকেরও কিছু অংশ নিজেদের দিকে টানতে পারে, তাহলে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই চাপে পড়বে।
জনপ্রিয়তা মানেই সরকার গঠন নয়
তবে জনমত জরিপে শক্তিশালী অবস্থান এবং সরকার গঠন এক বিষয় নয়।
পপুলিস্ট রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ক্ষোভ, উদ্বেগ ও হতাশাকে রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দিতে পারা। কিন্তু সেই ক্ষোভকে বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতিতে রূপ দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।
ওয়ান নেশানের সামনে তাই বড় প্রশ্ন হলো, দলটি শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশের বাইরে গিয়ে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কতটা বাস্তবসম্মত নীতি দিতে পারে।
কেন মানুষ আবার তাঁর কথা শুনছে?
পলিন হ্যানসনকে পছন্দ করা বা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া এক বিষয়। কিন্তু তাঁর উত্থানকে শুধু উপহাস বা নিন্দার মাধ্যমে দেখলে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
বরং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন অস্ট্রেলিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভোটার আবার তাঁর বক্তব্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে?
মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হতাশা যদি এই সমর্থনের পেছনে কাজ করে থাকে, তাহলে সেই সমস্যাগুলোর সমাধান না করে শুধু ওয়ান নেশনকে আক্রমণ করলে মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।
২০২৮ সালের ফেডারেল নির্বাচন হয়তো এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দেবে।
তবে একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট: পলিন হ্যানসন আর অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির প্রান্তিক কোনো চরিত্র নন। তিনি আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় ফিরে এসেছেন।
এখন দেখার বিষয়, এই প্রত্যাবর্তন কি সাময়িক রাজনৈতিক ঢেউ, নাকি ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে একটি স্থায়ী নতুন শক্তির উত্থান।
পলিন হ্যানসনের উত্থান ঠেকাতে অভিবাসীদের করণীয় কী?
পলিন হ্যানসনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁকে মোকাবিলা করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে আবেগ, সংঘাত বা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সংগঠিত রাজনৈতিক সচেতনতা।
প্রথমত, অভিবাসীদের ভোটার হিসেবে আরও সক্রিয় হতে হবে। কে কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অভিবাসন নীতি কী, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কী পরিকল্পনা আছে এবং স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি অভিবাসীদের স্বার্থ কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেসব বিষয় দেখে ভোট দেওয়া জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ভুল তথ্য ও ভয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব দিতে হবে তথ্য দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করে কোনো পোস্ট বা ভিডিও শেয়ার না করে নির্ভরযোগ্য সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শুধু অভিবাসীদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেই হবে না। অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। অভিবাসীরা অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, পরিবহন, আতিথেয়তা, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতে কীভাবে অবদান রাখছেন, সেটিও তুলে ধরা দরকার।
চতুর্থত, অভিবাসী সম্প্রদায়ের উচিত স্থানীয় এমপি, কাউন্সিলর এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা। অভিবাসন নীতি, আবাসন, ভাড়া, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ সংগঠিতভাবে তুলে ধরলে রাজনৈতিক দলগুলোও বুঝতে পারবে যে এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পলিন হ্যানসনকে থামানোর দায়িত্ব শুধু অভিবাসীদের নয়। তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যদি মানুষের প্রকৃত উদ্বেগ থেকে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই উদ্বেগের সমাধান করা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব।
অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হতে পারে ভোট, তথ্য, ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ।
কারও বিরুদ্ধে ঘৃণা তৈরি করে নয়, বরং নিজেদের অধিকার, অবদান এবং অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে গঠনমূলকভাবে কথা বলেই অভিবাসী সম্প্রদায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে।
আরও পড়ুন
এই বিভাগের আরো খবর
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আলোচনা সভা
বিএনপি ক্ষমতা নয় দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে : আসাদুজ্জামান রিপন
অস্ট্রেলিয়ায় আইপিডিসি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানমালা





