avertisements 2

ইলিশের উৎপাদন কমছে, ছোট হচ্ছে আকার

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর,সোমবার,২০২৬ | আপডেট: ০২:১০ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর,সোমবার,২০২৬

Text

বিভিন্ন বাধায় ছোট হয়ে আসছে সুস্বাদু ইলিশের সাইজ। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বাড়লেও দেশের ইলিশে এখন উল্টো প্রবণতা দেখা দিয়েছে। টানা দুই বছর কমেছে উৎপাদন। একই সঙ্গে কমছে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার ও ওজন।

গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নদীর নাব্যসংকট, পলি জমে চর জাগা, দূষণ, খাদ্য হিসেবে ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিকণার পরিমাণ কমে যাওয়া এবং নির্বিচারে ছোট ইলিশ ধরার কারণে সামগ্রিকভাবে চাপে রয়েছে দেশি প্রজাতির সুস্বাদু এই মাছ। অভয়াশ্রমগুলো থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা ধরে রাখতে নিয়মিত পরিবেশগত নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা জোরদারের তাগিদও এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার টন। এরপর প্রায় ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন, ২০১৭-১৮-তে ৫ লাখ ১৭ হাজার, ২০১৮-১৯-এ ৫ লাখ ৩৩ হাজার, ২০১৯-২০-এ ৫ লাখ ৫০ হাজার, ২০২০-২১-এ ৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২১-২২-এ ৫ লাখ ৬৭ হাজার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে ওঠে। এরপরই পতন শুরু। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ টনে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।

শুধু মোট উৎপাদন নয়, ইলিশের আকারেও পরিবর্তন স্পষ্ট। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে। মৎস্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প মূল্যায়নেও দেখা গেছে, সাত বছর আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ গ্রাম; বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমানের মতে, নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা, নাব্যসংকট, নদীর মুখে চর ও ডুবোচর, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং পানিদূষণ ইলিশের চলাচল, প্রজনন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে নির্বিচারে ও নিষিদ্ধ জালে মাছ ধরার কারণে পরিণত হওয়ার আগেই ইলিশ ধরা পড়ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলে ইলিশের খাদ্য হিসেবে থাকা ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিকণার পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে কমছে। গবেষণায় মেঘনা নদীতে এসব খাদ্যকণার পরিমাণ ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর প্রভাব ইলিশের আকারের ওপর পড়ছে বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যবিজ্ঞান ও জলচাষ বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল ওয়াহাব মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ ধরা ইলিশের আকার কমে যাওয়ার বড় কারণ হতে পারে।

পুষ্টিগুণেও পার্থক্য : ইলিশের আকার ছোট হওয়ার সঙ্গে পুষ্টিমান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে ‘ফুড কেমিস্ট্রি অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় মেঘনা নদীর ছোট ও বড় আকারের ইলিশের পুষ্টিমান তুলনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম বড় ইলিশে শক্তি ২৯১ কিলোক্যালরি, আমিষ ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মোট চর্বি ২২ দশমিক ৩২ শতাংশ। ছোট ইলিশে এসব পরিমাণ যথাক্রমে ২৪৫ কিলোক্যালরি, ১৮ দশমিক ১৪ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। বড় ইলিশে দেহের প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং ওমেগা-৩ ধরনের উপকারী চর্বির পরিমাণও বেশি পাওয়া গেছে। এদিকে ছোট ইলিশে জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি দেশে ইলিশের পুষ্টিগুণ সামগ্রিকভাবে কমে যাচ্ছে-এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেয়নি। এটি ছোট ও বড় ইলিশের পুষ্টিমানগত পার্থক্য দেখিয়েছে। ফলে ইলিশের গড় আকার ছোট হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রতি মাছ থেকে পাওয়া আমিষ, চর্বি ও ওমেগা-৩সহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভয়াশ্রমেও নজরদারি জরুরি : ইলিশ রক্ষায় দেশে ছয়টি অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রমটি ভোলার চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত শাহবাজপুর চ্যানেলের প্রায় ৯০ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিশারিজ রিসার্চ-এ প্রকাশিত গবেষণায় এই অভয়াশ্রমের বর্তমান পরিবেশগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চারটি এলাকায় চালানো ওই গবেষণায় দেখা যায়, অভয়াশ্রমের পানির অধিকাংশ ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য মাছের জন্য গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের গড় পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৪৯ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার।

গবেষকদের এই পর্যবেক্ষণ বলছে, শুধু অভয়াশ্রম ঘোষণা করলেই ইলিশের উৎপাদন ও আকার ধরে রাখা সম্ভব নয়। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিষিদ্ধ জাল বন্ধ, জাটকা সংরক্ষণ এবং ইলিশের খাদ্যভান্ডার রক্ষার পাশাপাশি সমুদ্র থেকে নদীর উজান পর্যন্ত পুরো চলাচলের পথকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। তবেই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বড় আকারের ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ইলিশের প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
 

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2