৫১ মানুষের দ্বীপে ৩৪ বছর পর প্রথমবার নতুন প্রাণের আগমন
ছবি: সিএনএন থেকে সংগৃহীত
স্কটল্যান্ডের প্রত্যন্ত নর্থ রোনাল্ডসে দ্বীপে ৩৪ বছর পর প্রথমবারের মতো একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ডানকান ওয়াইল্ডার থরস্টেইন ট্রেইল সুয়ারেজ ফোর্ড নামের শিশুটির জন্ম হয় বলে তার মা অ্যালিস ট্রেইল ফোর্ড বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানিয়েছেন।
নর্থ রোনাল্ডসে অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে উত্তরের দ্বীপ। মাত্র তিন মাইল লম্বা ও দুই মাইল চওড়া এই ছোট্ট দ্বীপটির জনসংখ্যাও খুব কম। ২০২৪ সালের স্কটিশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই সময় দ্বীপটিতে ৭২ জন বাসিন্দা ছিলেন। অ্যালিস ট্রেইল ফোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন ৫১ জন।
অ্যালিস, তার বাগদত্তা জর্জ সুয়ারেজ ও তাদের পরিবার কোস্টারিকা এবং নর্থ রোনাল্ডসের মধ্যে সময় ভাগ করে থাকেন। শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল, ডানকানের জন্ম হবে কোস্টারিকায়। এমনকি নর্থ রোনাল্ডসে যাওয়ার সময় তাদের ফেরার বিমানের টিকিটও করা ছিল। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর পর বদলে যায় সেই পরিকল্পনা।
অ্যালিস বলেন, নর্থ রোনাল্ডসেই সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, এখানেই তার জন্য সবচেয়ে বিশেষ, মায়াময় ও সহায়ক পরিবেশে সন্তানের জন্ম দেওয়া সম্ভব হবে।
“আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝেছিলাম, এটাই হবে আমার সন্তানের জন্য সবচেয়ে বিশেষ, জাদুময় ও সহায়তাপূর্ণ জন্মের অভিজ্ঞতা,” বলেন তিনি।
নর্থ রোনাল্ডসের সঙ্গে অ্যালিসের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তার পরিবার ১৭২৭ সালে দ্বীপটির মালিকানা কিনেছিল। সেই সূত্রে দ্বীপটির সঙ্গে তার পারিবারিক ও ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে।
অ্যালিস বলেন, “দ্বীপটির সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, সেটিই আমাকে প্রতি বছর এখানে ফিরিয়ে আনে। আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন থেকেই প্রতি বছর এখানে আসি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, এই দ্বীপই আমাকে বড় করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। সে কারণেই এখানকার পরিবেশ, বিশেষ করে আমাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িতে, আমি সবচেয়ে বেশি সংযোগ ও আপনত্ব অনুভব করি।”
ডানকানের জন্ম হয়েছে হল্যান্ড হাউসে। ঐতিহাসিক এই বাড়িটি অ্যালিসের পূর্বপুরুষেরা নির্মাণ করেছিলেন।
দ্বীপজুড়ে উৎসবের আবহ
৩৪ বছর পর দ্বীপটিতে কোনও শিশুর জন্ম হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ব্যাপক আনন্দ দেখা দিয়েছে। অ্যালিস জানান, সবাই এ ঘটনায় অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত।
নবজাতকের জন্ম উদযাপন করতে তিনি স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে ছোট ছোট হুইস্কির বোতল উপহার দেন। বোতলগুলো সাজানো হয়েছিল চারপাতা ক্লোভার ও ছোট ছোট ঝিনুক দিয়ে। স্থানীয়ভাবে এসব ঝিনুক ‘গ্রোটি বাকিজ’ নামে পরিচিত এবং এগুলো সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অ্যালিস বলেন, দ্বীপটির বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেকটা বৃহৎ একটি পরিবারের মতো। তার ভাষায়, “তারা যেন আমাদের বর্ধিত পরিবারের সদস্য। মনে হয়, আমরা একটি বিশাল পরিবার- দ্বীপের পরিবার, দূরের আত্মীয়স্বজন।”
কেন এত বছর কোনও শিশুর জন্ম হয়নি?
নর্থ রোনাল্ডসে এত দীর্ঘ সময় কোনও শিশুর জন্ম না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দ্বীপটির সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে মনে করেন অ্যালিস। দ্বীপটিতে কোনও চিকিৎসক বা হাসপাতাল নেই। সেখানে শুধু একজন স্থায়ী নার্স রয়েছেন।
তার মতে, সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় কোনও জটিলতা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হতে পারে- এমন আশঙ্কার কারণেই অনেকে দ্বীপের বাইরে হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়াকে নিরাপদ মনে করেন।
অ্যালিস বলেন, “আমার মনে হয়, মানুষ হয়তো প্রসবের সময় কী কী ভুল হতে পারে, তা নিয়ে ভয় পান। তাই কোনও সমস্যা হলে প্রয়োজনীয় সহায়তার সব ব্যবস্থা পাওয়া যাবে- এমন হাসপাতালে থাকাকেই তারা বেশি নিরাপদ মনে করেন।”
নর্থ রোনাল্ডসে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতেও দীর্ঘ সময় লাগে। নৌপথে অর্কনির মূল ভূখণ্ডে যেতে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় লাগে।
অ্যালিস জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে কোস্টগার্ডের হেলিকপ্টার দ্বীপে এসে রোগীকে নিয়ে যেতে পারে। তবে শারীরিক অবস্থা যদি ভ্রমণের উপযোগী থাকে, তাহলে তাকে নৌপথে অর্কনির মূল ভূখণ্ডের কির্কওয়ালে যেতে হয়।
দীর্ঘ ৩৪ বছর পর নর্থ রোনাল্ডসে একটি শিশুর জন্ম তাই শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, অল্পসংখ্যক বাসিন্দার এই প্রত্যন্ত দ্বীপটির জন্যও হয়ে উঠেছে বিশেষ এক ঘটনা। সূত্র: সিএনএন





