ফর্সা হওয়ার ক্রিমের মরণফাঁদ
রাতারাতি গায়ের রং ফর্সা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার রং ফর্সাকারী প্রসাধনী বা ‘স্কিন লাইটেনিং ক্রিম’-এর বিশাল বাজার।
বিজ্ঞাপনের চটকদার প্রলোভনে পড়ে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই ক্ষতিকর এসব রাসায়নিক ক্রিম মুখে নিয়মিত ব্যবহার করছেন।
তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, সাময়িকভাবে ত্বক ফর্সা মনে হলেও, এই প্রসাধনীগুলো আসলে ত্বকের স্থায়ী সর্বনাশ ডেকে আনে এবং ক্যান্সারসহ মারাত্মক সব শারীরিক জটিলতা তৈরি করে।
ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনীর ক্ষতিকর দিক ও গোপন বিষ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের মতে, বাজারের অধিকাংশ রং ফর্সাকারী ক্রিমে তিনটি বিপজ্জনক উপাদান ব্যবহার করা হয়: মার্কারি (পারদ), হাইড্রোকুইনোন এবং কড়া স্টেরয়েড।
চিকিৎসা-বিষয়ক সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি’তে প্রকাশিত ‘টপিক্যাল স্টেরয়েড-ইনডিউসড স্কিন ড্যামেজ’ নামের গবেষণায় এর ক্ষতিকর দিকগুলো প্রমাণিত হয়েছে।
ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া: কড়া স্টেরয়েডের নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তর বা ‘এপিডার্মিস’ সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গিয়ে ত্বক কাগজের মতো পাতলা হয়ে যায়। ফলে ত্বকের ভেতরের সূক্ষ্ম নীল রক্তনালীগুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যেতে শুরু করে।
তীব্র ব্রণ ও লোম বৃদ্ধি: হাইড্রোকুইনোন এবং স্টেরয়েডের যৌথ প্রতিক্রিয়ায় মুখে হরমোনজনিত তীব্র ব্রণ বা ‘স্টেরয়েড অ্যাকনি’ দেখা দেয়। আর মুখের সংবেদনশীল ত্বকে অবাঞ্ছিত ঘন কালো লোম গজাতে শুরু করে।
কিডনি ও স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি: ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ‘স্কিন লাইটেনিং কসমেটিকস: আ গ্লোবাল পাবলিক হেলথ থ্রেট’ প্রতিবেদনে জানানো হয়, ফর্সাকারী ক্রিমের মার্কারির বা পারদের বিষাক্ত কণা ত্বকের লোমকূপ দিয়ে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং কিডনিকে স্থায়ীভাবে বিকল বা অবশ করে দিতে পারে।
মেলানিন ও কৃত্রিম ফর্সা হওয়ার অবৈজ্ঞানিক ভিত্তি
‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজি’-র চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ত্বকের রং কেমন হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া ‘মেলানিন’ নামক রঞ্জক উপাদানের ওপর।
রোদ ও ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি বা ‘ইউভি রে’ থেকে ত্বককে রক্ষা করে ক্যানসার হওয়া থেকে বাঁচানোই মেলানিনের প্রধান কাজ।
ফর্সাকারী ক্রিমগুলো জোর করে এই প্রাকৃতিক মেলানিন উৎপাদন ‘ব্লক’ বা বন্ধ করে দেয়। ফলে ত্বকের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যায়। যে কারণে ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৪ গুণ।
প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে ত্বক উজ্জ্বল করার ৩টি নিয়ম
ত্বককে জোর করে কৃত্রিমভাবে সাদা করার চেষ্টা না করে, ত্বকের কালো দাগ বা ‘হাইপারপিগমেন্টেইশন’ দূর করে এর আসল সুস্থতা ও উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা গবেষকেরা ৩টি বিজ্ঞানসম্মত ঘরোয়া উপাদানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছেন।
টমেটো ও ল্যাকটিক অ্যাসিডের লাইকোপেন: চিকিৎসা বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এসথেটিক ডার্মাটোলজি’-তে প্রকাশিত, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগবিদ্যা বিভাগের করা গবেষণায় দেখা গেছে, টমেটোতে থাকা উচ্চমাত্রার ‘লাইকোপেন’ এবং টক দইয়ের ‘ল্যাকটিক অ্যাসিড’ প্রাকৃতিকভাবে ত্বকের মৃত কোষ দূর করে। আর কমায় কালো ছোপ ছোপ দাগ।
সপ্তাহে দুদিন টমেটোর রস ও টক দইয়ের প্যাক মুখে ১০ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলা উপকারী।
কাঁচা হলুদ ও চন্দনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট: প্রাচীন এশীয় এই ভেষজ উপাদানের কার্যকারিতা আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাইটোপ্যাথোলজি রিসার্চ’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন-এর করা ‘কারকিউমিন ইনহিবিটস মেলানোজেনেসিস ইন হিউম্যান মেলানোসাইটস’ গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, হলুদে থাকা কারকিউমিন সরাসরি ত্বকের ‘টাইরোসিনেজ’ নামক এনজাইমের কার্যকারিতাকে বন্ধ করে দেয়। এই এনজাইমটিই মূলত ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন বা কালো দাগ তৈরি করার জন্য দায়ী। হাইড্রোকুইনোন কেমিক্যালের চেয়েও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া এটি প্রাকৃতিকভাবে পিগমেন্টেশন বা মেছতার দাগ কমাতে কার্যকর।
সুইজারল্যান্ডের চিকিৎসা সাময়িকী ‘এমডিপিআই’তে প্রকাশিত, ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অ্যান্ড অ্যান্টি-এজিং পটেনশিয়াল অব ইন্ডিয়ান চন্দন অয়েল’ গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, চন্দনে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদানগুলো ক্ষতিকর ‘ফ্রি-র্যাডিক্যাল’ এবং সূর্যের কড়া বেগুনি রশ্মি ও শহরের দূষণ থেকে ত্বককে রক্ষা করতে ভিটামিন ‘ই’-এর চেয়েও সুরক্ষা প্রদান করে।
এটি ত্বকের কোলাজেন ধ্বংসকারী এনজাইমকে থামিয়ে দিয়ে অকাল বার্ধক্য বা চামড়া কুঁচকে যাওয়া রোধ করতে পারে।
এছাড়া ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ রিসার্চ ইন আয়ুর্ভেদা অ্যান্ড ফার্মেসি’-এ প্রকাশিত, ‘ক্লিনিক্যাল ইভালুয়েশন অব দ্য স্কিন ব্রাইটেনিং এফিকেসি অ্যান্ড সেফটি অব আয়ুর্বেদিক ফর্মুলেশন’ গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কাঁচা হলুদ এবং চন্দনকে একসঙ্গে ত্বকে ব্যবহার করা হয়, তখন হলুদের কারকিউমিন এবং চন্দনের শান্তিদায়ক উপাদানগুলো একসঙ্গে ত্বকের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এক ধাক্কায় কমিয়ে দেয়।
এই যৌথ শক্তি কৃত্রিম ফর্সা হওয়ার ক্রিমের মতো কোনো র্যাশ বা অ্যালার্জি তৈরি না করে প্রাকৃতিক উপায়ে ত্বককে দাগহীন ও উজ্জ্বল করে তোলে।
অ্যালোভেরা ও আলফা হাইড্রোক্সি অ্যাসিড: ‘ক্লিনিক্যাল, কসমেটিক অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনাল ডার্মাটোলজি’ সাময়িকী-তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, লেবুর রস বা কমলার খোসার গুঁড়োতে থাকা প্রাকৃতিক আলফা হাইড্রোক্সি অ্যাসিড (এএইচএ) ত্বকের কোনো ক্ষতি ছাড়াই মরা কোষ দূর করে নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে।
পাশাপাশি, ‘জার্নাল অব ডার্মাটোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট’ -এ প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণাপত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, অ্যালোভেরার প্রাকৃতিক জেলে থাকা ‘অ্যালোসিন’ নামক উপাদান সরাসরি মেলানিন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে।
এই দুই উপাদানের মেলবন্ধন ক্ষতিকর কেমিক্যালের চেয়েও নিরাপদে ত্বকের আর্দ্রতা ও কোলাজেন উৎপাদন সচল রেখে সুস্থ উজ্জ্বলতা প্রদান করে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জাস্টিন হেকস্টল বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, “সুস্থ ত্বকই হল সুন্দর ত্বক। কোনো অলৌকিক বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে হঠাৎ করে ফর্সাকারী ক্রিম মুখে মাখা বন্ধ করা উচিত। এর পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান ও নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা এবং পুষ্টিকর শাকসবজি ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়াই উজ্জ্বল ও দাগহীন ত্বক ধরে রাখার একমাত্র বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ উপায়।”
সৌজনে বিডি নিউজ ২৪. কম





