দেশবরেণ্য অভিনেতা আতাউর রহমান আর নেই
দেশবরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব, অভিনেতা, নাট্যকার ও মঞ্চনির্দেশক আতাউর রহমান আর নেই। সোমবার (১১ মে) দিনগত মধ্যরাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আগামী জুনে অভিনেতার ৮৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী এবং এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।
অনন্ত হিরা বলেন, “রাত ১১টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এখনো তার মরদেহ হাসপাতালেই রাখা আছে। আগামীকাল শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের জন্য শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাকে দাফন করা হবে।”
পরিবারসূত্রে জানা যায়, জোহরের নামাজ শেষে মগবাজারের ইস্পাহানি সেঞ্চুরি আর্কেডে অভিনেতার নিজ বাসভবনের সামনে খোলা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তার মরদেহ আজ (মঙ্গলবার) বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে রাখা হবে। সবশেষ তাকে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
আতাউর রহমানের মৃত্যুতে সংস্কৃতাঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে।
বাংলা নাট্যাঙ্গনের এক অবিস্মরণীয় নাম আতাউর রহমান। অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক—প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন অনন্য। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক ও নাট্যচর্চাকে তিনি শুধু সমৃদ্ধই করেননি, বরং একটি প্রজন্মকে পথও দেখিয়েছেন।
১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীর ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। শৈশব থেকেই সাহিত্য, অভিনয় ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও জীবনের প্রকৃত ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন নাটককে। ষাটের দশকে তিনি মঞ্চনাটকের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যআন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ।
স্বাধীনতা-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাঁরা কাজ করেছেন, আতাউর রহমান তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক নির্দেশনা ও নাট্যরচনায়ও সমান দক্ষতা দেখান। তাঁর নির্মাণে সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সংকট, রাজনৈতিক অভিঘাত ও মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপোড়েন উঠে এসেছে সংবেদনশীল ভাষায়।
মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃঢ় অথচ সংযত। সংলাপ উচ্চারণ, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং অভিনয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতার জন্য তিনি আলাদা মর্যাদা লাভ করেন। টেলিভিশন নাটকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ। বিটিভির স্বর্ণালি সময়ে তাঁর অভিনীত অসংখ্য নাটক দর্শকের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।
নাট্যসংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশ সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (BCITI)-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের নাট্যচর্চাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, নাট্যআন্দোলনের বিস্তার এবং সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।
সাহিত্যচর্চাতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। তাঁর লেখা নাটক, প্রবন্ধ ও রম্যরচনায় সমাজ পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা এবং ব্যঙ্গরসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ‘ষষ্ঠী তৎপুরুষ’, ‘দুই দুগুণে পাঁচ’ ও ‘মধ্যরাতের জোকস’-এর মতো গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।





