avertisements 2

ইরান-পাকিস্তান যুদ্ধ কী আসন্ন

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৮ জানুয়ারী,বৃহস্পতিবার,২০২৪ | আপডেট: ০৮:৫৮ এএম, ২৯ ফেব্রুয়ারী,বৃহস্পতিবার,২০২৪

Text

গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জইশ আল-আদল (জইশ আল-জোলম নামেও পরিচিত যার ইংরেজি অনুবাদ ‘আর্মি অব জাস্টিস’) নামের একটি সুন্নি জঙ্গি গোষ্ঠী পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ জুড়ে বেলুচ বিদ্রোহ পরিচালনা করেছে। গোষ্ঠীটি আগে ‘জুন্দুল্লাহ’ নামে পরিচিত ছিল।

গোষ্ঠীটি বেলুচিস্তান অঞ্চল, ইরানের সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশে বিদ্রোহের পাশাপাশি ইরানের ছোট শহর রুস্কের একটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা করে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা সেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ইরানের ১২ পুলিশ সদস্য। রুস্ক শহরের ওই হামলার জন্য জইশ আল-আদল গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়েছে।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে বেলুচ জঙ্গিবাদ ও এর চারপাশে আবর্তিত জাতিগত উত্তেজনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু তাই নয়, ঘটনার পরদিন ইরানেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যেই সংগঠিত হয়েছে।

গতকাল (১৭ জানুয়ারি) প্রথমে পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব পরে তাকে বহিষ্কার ও তেহরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে ইসলামাবাদ। ইরানি সংবাদমাধ্যমের মতে, বেলুচিস্তানের দুর্গম পাহাড়ে জইশ আল-আদলের আস্তানায় হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

প্রথম হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান ও পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার উল হক কাকার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলনে দেখা করেছিলেন। একই সময় আফগানিস্তানে ইরানের বিশেষ প্রতিনিধি হাসান কাজেমো কামি পরামর্শের জন্য পাকিস্তান সফর করেন।

এ সময় আফগান সংবাদমাধ্যম কামিকে উদ্ধৃত করে বলেছিল, ‘ইসলামাবাদ ও তেহরান কাবুলের সঙ্গে আলাপচারিতার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে।’ চুক্তির আগে তেহরান ইসলামাবাদকে জইশ আল-আদলের বিরুদ্ধে হামলার কথা বলেছিল কিনা তা নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে।

পাকিস্তান ইতিমধ্যেই তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএসকেপি) ও আফগান তালেবানের সঙ্গে তার অবনতিশীল সম্পর্কের কারণে গুরুতর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি ইরানি আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে পারে। এমনটি ঘটলে সামরিকভাবে তা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে না পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

বেলুচ জঙ্গিবাদ নিয়ে ইরান, পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে ত্রিদেশীয় সম্পর্ক খুবই জটিল। আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে প্রায়শই গোপনে জইশ আল-আদলের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমর্থন ও প্রকাশ্যে নিন্দা করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই দরিদ্র ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে জটিলতা থেমে নেই। জইশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা সালাহউদ্দিন ফারুকিও এর আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি ইরানের সমর্থনের বিরোধিতা করেছেন।

জইশ জঙ্গি গোষ্ঠীর কার্যকলাপ নিয়ে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও ২০১১-১২ সালকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন থেকেই ইসলামাবাদকে দোষারোপ করে আসছে তেহরান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা জইশের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে উদ্বেগ নরম করেছে। পাশাপাশি তেহরানের অন্যান্য শত্রু যেমন ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনকি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও সমর্থন বাড়িয়েছে ইসলামাবাদ।

যদিও কিছু বিশ্লেষক পাকিস্তানে ইরানের পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যে তার চলমান কৌশলগত খেলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছেন তবে এই অনুমান কিছুটা প্রসারিত হতে পারে। বিশেষ করে চলমান গাজা যুদ্ধের আগে জইশের মতো গোষ্ঠী এবং বেলুচ জঙ্গিবাদ নিয়ে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা অথবা লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার মতো ঘটনায়।

ইরান প্রায়ই বলে, তারা বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জইশের নিরাপদ আস্তানাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এমনকি দুই দেশের সীমান্তে সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি একটি নিয়মিত ঘটনা।

ঘটনাটি স্বতন্ত্রভাবে দুই দেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয় যা ২০২১ সালে কাবুলের ক্ষমতায় তালেবানের আসায় আরও জটিল হয়েছে। জইশের মতাদর্শ অনেকটা তালেবানদের মতো হওয়ায় রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তারা একে অপরকে এড়িয়ে যেতে পারেনা। কারণ প্রথমে তারা হাজির হয় একটি ইসলামি আন্দোলন নিয়ে পরে তারা প্রতিষ্ঠিত হয় একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে।

পাকিস্তানের জন্য চলমান পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের প্রচারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যর্থ নীতিতে আরেকটি ধাক্কা। অর্থনৈতিক ধসের পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত অ্যাসেটকে তার শাসন ব্যবস্থা ও অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে মোড় নেওয়া থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ পাকিস্তান। এমন টালমাটাল পরিস্থিতি একতরফাভাবে দেশটির বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বলতে গেলে তত্ত্বাবধায়কের হাতে পরিচালিত পাগলাগারদ, সীমিত রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সামরিক বাহিনী ব্যস্ত বেসামরিকদের চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে। বিশেষ করে ইমরান খানের মতো ব্যক্তিত্বরা সামরিক বাহিনীর কম্ফোর্ট জোনের বাইরে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে যাকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে মরিয়া।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো ঘটনাকে ঘিরে উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্বেগজনক তথ্য হল পাকিস্তান প্রকৃতপক্ষে একটি পারমাণবিক শক্তি। পারমাণবিক প্রতিরোধ স্পষ্টতই এই খেলার মধ্যে ছিল না কারণ তেহরান বেলুচিস্তানে জইশ ইকোসিস্টেমকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করেছিল। প্রশ্ন আসতে পারে এখানে তাহলে তেহরানের কৌশলগত চিন্তাটা কোথায়।

পাকিস্তানের সর্বশক্তিমান সেনাপ্রধান টিটিপির হুমকি মোকাবিলার জন্য মার্কিন সহায়তার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান আজ তার পরমাণু অস্ত্রের একমাত্র যে সদ্ব্যবহার করতে পারে তা হল জঙ্গিদের হাতে অস্ত্র আসার ভয় তৈরি করা। বিখ্যাত পণ্ডিত স্টিফেন পি কোহেন যেমনটা বলেছিলেন, পাকিস্তান তার নিজের মাথায় বন্দুক দেখিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আলোচনা করে।

তবে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই সত্যটি সামনে এনেছে যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান নাটক এখনো শেষ হয়ে যায়নি এবং এটি উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। ইরানের জন্য তালেবানের সঙ্গে দৃঢ় মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমারা, বিশেষ করে মার্কিন সামরিক শক্তি যেন তার সীমানার কাছে আর কখনো ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করার দীর্ঘ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2