avertisements 2

স্ত্রী-সন্তানদের হারিয়ে পাগল প্রায় সোহেল!

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৩ জানুয়ারী,বৃহস্পতিবার,২০২২ | আপডেট: ০৭:৫৪ এএম, ২৪ জানুয়ারী,সোমবার,২০২২

Text

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের চরমধ্যনগর গ্রামে শোকের মাতম পড়েছে। একই পরিবারের চার সদস্য হারিয়ে পাগল প্রায় সোহেল মিয়া। স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়ে সোহেলের বিলাপ ‘আল্লাহ আমাকেও কেন তাদের সাথে নিলো না। আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখলো।’

৫ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ধর্মগঞ্জ খেয়াঘাটে ধলেশ্বরী নদীতে ভয়াবহ যাত্রীবাহী ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ট্রলারে থাকা বেশ কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠে এলেও নিখোঁজ হয় ১০ জন। নিখোঁজদের সেই তালিকায় ছিল সোহেল মিয়ার স্ত্রী জিয়াসমিন, সদ্য বিবাহিত বড় মেয়ে তাসনিম (১৬), ছেলে তামিম (৮) ও ১৩ মাসের শিশু মেয়ে তাসফিয়া।

সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সোহেল মিয়া বলেন, মা ও শিশু বোন তাসফিয়াকে নিয়ে খালার বাসায় বেড়াতে যাওয়ার বায়না ধরেছিল তাসনিম ও তামিম। সন্তানদের এমন আদুরে আবদার প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি তিনি।

ট্রলার ডুবির আগে সকালে ৪০ দিনের চিল্লার উদ্দেশ্যে স্ত্রী সন্তানদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসেন। পরে আত্মীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পাই ধলেশ্বরীতে লঞ্চের ধাক্কায় যাত্রীবাহী ট্রলার তলিয়ে গেছে। সেই ট্রলারে আমার স্ত্রী ও তিন সন্তানও ছিল।

নির্মম ওই দুর্ঘটনা একসঙ্গে কেড়ে নিয়েছে সোহেলের স্ত্রী এবং আদুরে তিন সন্তানকে। সোহেল এখন কেবলই একা। ক’দিন আগেও স্ত্রী সন্তানদের প্রাণচাঞ্চল্যতায় মুখরিত ছিল যে বাড়ির আঙিনা, সেই ভিটে মাটিতে চলছে শোকের মাতম। বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে যেন পড়েছে শোকের আস্তরণ।

সোহেল মিয়া বলেন, খালার বাড়ি থেকে দ্রুত ফিরে আসার তাগিদ দিয়ে আবদার রক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি। তার চোখের সামনে স্ত্রী ও সন্তানদের হাসিমাখা মুখগুলো ঘরে রেখে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কে জানতো, হাস্যোজ্জল এই যাত্রাই ছিন্ন করতে যাচ্ছে তিলে তিলে গড়া একটি গোছানো পরিবারের জীবন বন্ধন! কে বা জানতো, ধলেশ্বরীতেই তাদের অপেক্ষায় ছিল মৃত্যুদূত! তার স্ত্রী ও তিন সন্তান ফিরেছে ঠিক, তবে তা পচা-গলা লাশ হয়ে।

ভাগ্যের পরিহাস কি তবে এতোটাই নিষ্ঠুর? উত্তর না মেলা এমন শত প্রশ্ন আর পুরনো সুখস্মৃতিগুলোই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সোহেলের শোক বিদীর্ন হৃদয়। চোখের আঝোর ধারা শুকালেও হৃদয়ে রক্তক্ষরণে যে নহর তৈরি হয়েছে সোহেলের, তা যে শুকাবার নয়!

মঙ্গলবার বিকালে কথা হয় সোহেলের সঙ্গে। তার বাড়ি ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের চরমধ্যনগর গ্রামে। সেখানেই প্রিয় স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন। জানতে চাইলে কাঁপা কন্ঠে স্ত্রী সন্তানদের বিদায়বেলার বর্ণনা দেন সোহেল। বললেন, ‘খালার বাসা থেকে দ্রুতই ফিরে আসার কথা ছিল তাদের। তারা ফিরেছে ঠিক, তবে পচা-গলা লাশ হয়ে। কিন্তু কেন? আমার সাজানো গোছানো সংসারের এই পরিনতি কেন ? আমার স্ত্রী সন্তানদের এই পরিনতির জন্য দায়ি কে? আমি তাদের শাস্তি চাই। অন্যকিছু না।’

সোহেল বলেন, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য উদ্ধারকর্মীরা একে একে চার দিন তল্লাশি করেও কারও খোঁজ পাচ্ছিল না। স্ত্রী সন্তানদের ছবি হাতে নিয়ে তাই নদীর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছি। বুঝতেই পেরেছিলাম তারা জীবিত নেই। তাই আল্লাহর কাছে তাদের মৃত দেহগুলো খুঁজে পাওয়ার আর্তনাদ করেছি। রাতগুলো কেটেছে নির্ঘুম।

অতঃপর গত ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় প্রথমেই আমার স্ত্রী জিয়াসমিন আক্তারের লাশ পাওয়া যায়। এরপর মেয়ে তাসনিম আক্তার (১৬) এর মরদেহ পাই। পরদিন পাওয়া যায় আমার মাদ্রাসা পড়ুয়া ৮ বছর বয়সি সন্তান তামিমকে। এরপর ১১ জানুয়ারি ধলেশ্বরী নদীর ডিক্রিরচর এলাকায় পাওয়া যায় আমার ১৩ মাসের শিশুকন্যা তাসফিয়ার গলিত লাশ। তাদের সবাইকে বাড়ির পাশের গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ আমাকেও কেন তাদের সাথে নিলো না। আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখলো।’

সোহেল বলেন, ‘এক মাস তিন দিন আগে আমার বড় মেয়ে তাসনিমের বিয়ে দিয়েছিলাম। কথা ছিল কিছু দিন পরই মেয়েটাকে তার শ্বশুর বাড়ি উঠিয়ে দেব। কিন্তু মেয়ে আমার কোথায় পাড়ি জমালো! ছেলেটাকে নিয়েও অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলে আলেম হবে, সেই আসায় তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলাম। একটি দুর্ঘটনা আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিলো।’

এদিকে কথা হয় তাসনিমের স্বামী নিজামের সঙ্গে। বেদনার কালো ছাপ বেশ স্পষ্ট ফুটে আছে সদ্যবিবাহীত এই যুবকের চোখে মুখে। স্ত্রী সম্পর্কে প্রশ্নগুলোর উত্তরে ছিলেন বাকরুদ্ধ। ফ্যাল ফ্যাল করে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে যেন নীরব জবাব দিলেন নিজাম।

এদিকে মঙ্গলবার শিশু তাসফিয়াকে উদ্ধারের মাধ্যমে অভিযান সমাপ্ত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য দপ্তরের ডুবুরি দল। মৃতদের দাফন-কাফনের জন্য লাশ প্রতি ২৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে অর্থ নয়, ঘটনার জন্য দায়িদের শাস্তি কামনা করছেন নিহতের স্বজনরা।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2