avertisements 2

ছোট গাড়ির ভাড়ায় বড় নৈরাজ্য!

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৬ ডিসেম্বর,সোমবার,২০২১ | আপডেট: ১০:৫২ এএম, ২৪ জানুয়ারী,সোমবার,২০২২

Text

ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার বাস ভাড়া বাড়ালেও গণপরিবহণ শ্রমিকরা তার চেয়েও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি আদায় করছেন। এ নিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের সঙ্গে বাস শ্রমিকদের বাগ্‌বিতন্ডা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। অথচ সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া কয়েক দফা বাড়ানোর পরও তারা মিটার অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি আদায় করেও নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাচ্ছে। লোকবল সংকট ও আইনি জটিলতাসহ নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিসহ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশাসন সিএনজি চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। 

সিএনজি অটোরিকশা মানেই মিটার অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করা যাবে না, দরকষাকষি করেই ভাড়া ঠিক করতে হবে- এ বিষয়টি নগরবাসী যেন একরকম মেনেই নিয়েছেন। তবে অটোরিকশায় যাদের নিয়মিত যাতায়াত নেই, তারা কালেভদ্রে এ যানে চড়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন। মিটার অনুযায়ী একশ' টাকা ভাড়া হলেও চুক্তিতে দুইশ' টাকা দিতে গিয়ে অনেকে মেজাজ হারিয়ে ফেলছেন। ছোট গাড়ির ভাড়ায় এ বড় নৈরাজ্য চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বছরের পর বছর ধরে কীভাবে চোখ বুজে রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে বিআরটিএ ও ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, যাত্রীদের অসচেতনতা এবং প্রতিবাদ করার অনীহার কারণে অটোরিকশা চালকরা মিটারে না গিয়ে ইচ্ছে অনুযায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ পাচ্ছে। 

শর্ত ভেঙে তারা মিটারে যাত্রী বহন না করলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। এদিকে শুধু অটোরিকশা নয়, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়িগুলোও এখন গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে। অ্যাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধন করে রাস্তায় যাত্রী পরিবহণ করা প্রাইভেট কারগুলো এখন শর্ত ভঙ্গ করে ভাড়া নৈরাজ্য চালাচ্ছে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপিস্নকেশন ব্যবহার না করে তারা যাত্রীদের সঙ্গে চুক্তিতে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়ে গত ২৮ অক্টোবর বিআরটিএ বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও তা কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। 

ভুক্তভোগীরা জানান, অ্যাপে ১৫০ টাকা ভাড়া আসলেও সেখানে ৩শ' থেকে সাড়ে ৩শ' টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে ট্রাফিক ও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ছোট গাড়ির ভাড়ায় বড় নৈরাজ্যের নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে যে সংখ্যক বৈধ সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে, তার চেয়ে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা বেশি। 

ব্যক্তি মালিকানায় এসব অবৈধ গাড়ি পরিচালিত হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরাই। মাসিক মোটা অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে ট্রাফিক পুলিশও এ অবৈধ যানবাহন পরিচালনার সুযোগ করে দিচ্ছে। \হএ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত রয়েছে। ঢাকায় ১৫ হাজার ২ \হবৈধ সিএনজি অটোরিকশার সঙ্গে আরও প্রায় ২০ হাজার অবৈধ অটোরিকশা চলছে। যা নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয়েছে। 

ওইসব অবৈধ অটোরিকশায় মিটার নেই। এসব অটোরিকশার ব্যাপারে তারা কোনো আপত্তি তুলবে না- এ শর্তে তাদের বৈধ অটোরিকশা মিটার অনুযায়ী ভাড়া নেওয়ার শর্ত শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। অবৈধ অটোরিকশা তুলে দেওয়া হলে তারা মিটার অনুযায়ী ভাড়া নেওয়ার শর্ত কার্যকর করবে বলে জানান ওই মালিক সমিতির নেতা। বৈধ অটোরিকশার চালকরা জানান, অবৈধ অটোরিকশার আধিক্যের কারণে তাদের যাত্রী অনেক কমে গেছে। এ কারণে তারা মিটার অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অবৈধ অটোরিকশা তুলে দেওয়া হলে তাদের যাত্রী বাড়বে। 

এ সময় মিটারে ভাড়া নিলেও তাদের পুষিয়ে যাবে। অবৈধ অটোরিকশা মিটার ছাড়া চলতে পারলে তারা কেন মিটারে চলবে- প্রশ্ন তোলেন তারা। এদিকে অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকার দাবি জানালেও রাজধানীসহ সারাদেশে সিএনজিচালিত 'প্রাইভেট অটোরিকশার' নামে কয়েকশ' কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে তাদের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা কেউ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অথচ স্রেফ প্রাইভেট অটোরিকশা নামে রুট পারমিট ছাড়া ভাড়ায় গাড়ি চালানোর কারণে সরকার অন্তত ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব উপার্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

অথচ ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ এবং একশ্রেণির মালিকের যোগসাজশে এ অবৈধ ব্যবসার বিস্তৃতির বিষয়টি অনেকদিন আগে থেকেই 'ওপেন সিক্রেট'। প্রাইভেট অটোরিকশার মালিকদের একটি বড় অংশ পুলিশ বিভাগের সদস্য বলে খোদ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন। অবৈধ ব্যবসাকে বৈধতা দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের মাসে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো জানায়, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ভাড়ায় চালিত একটি সিএনজি অটোরিকশার রুট পারমিট পেতে খরচ হয় সাড়ে চার লাখ টাকা। অথচ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন খরচ মাত্র এক লাখ টাকা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের অন্তত সাড়ে ৫ হাজার প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। 

এ হিসেবে অন্তত ১৯২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, বিআরটিএ ৬ সহস্রাধিক প্রাইভেট সিএনজি অটোরিকশার অনুমতি দিয়েছে। যার মাত্র ১০ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীনভাবে চলছে। বাকি ৯০ শতাংশ রাস্তায় ভাড়ায় খাটছে। অবৈধ অটোরিকশার মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্দিষ্ট এক জোনে পুলিশি হয়রানি ছাড়া প্রাইভেট অটোরিকশা চালাতে এলাকার পুলিশ বক্সে গিয়ে অনুমোদিত ট্রাফিক অফিসারের কাছে নিজের নাম এবং গাড়ির নম্বর তালিকাভুক্ত করাতে হয়। এজন্য ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হয় মাসে ৫০০ টাকা। আর রাজধানীর ১২ জোনে গাড়ি চালাতে মাসিক খরচ ছয় হাজার টাকা। তালিকাভুক্ত এসব অটোরিকশা থানা পুলিশ কিংবা ট্রাফিক পুলিশ আটকায় না। 

বরং এসব গাড়ি নিয়ে কোনো যাত্রী কিংবা সচেতন কোনো নাগরিক কোনো কথা বলার চেষ্টা করলে উল্টো তারা তাদের রক্ষা করেন। এদিকে পুলিশের বেশকিছু সদস্য পুরনো প্রাইভেট অটোরিকশা কিনে ছাই রং পাল্টে সবুজ করে নিয়ে তা ভাড়ায় চালাচ্ছেন বলেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, কনস্টেবল থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা কারো কারো ২/৩টি থেকে ১০/১২টি এ ধরনের অটোরিকশা রয়েছে। এছাড়া বিআরটিএর বেশকিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও বিপুল সংখ্যক প্রাইভেট অটোরিকশা ভাড়ায় চালাচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণকারীরা নিজেরাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তারা অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়টি জেনেও নিষ্ক্রিয় থাকছে। 

এদের মধ্যে অনেকের অবৈধ অটোরিকশা থাকায় তারা দুইভাবে লাভবান হচ্ছে। অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, মিটারে ভাড়া নেওয়ার শর্তে সিএনজি অটোরিকশার মালিক-চালকরা ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু তা মানার ক্ষেত্রে তারা 'থোড়াই কেয়ার' করছে। বাস মালিক-শ্রমিকদের মতো অটোরিকশার মালিক-চালকরা জনগণকে জিম্মি করে রেখেছে। সরকার এ ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রম্নতি দিলেও তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মিটার উপেক্ষা করে ৯৬ শতাংশ অটোরিকশা চালক চুক্তিতে গলাকাটা ভাড়া আদায় করছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2