avertisements 2

শিরোনামহীন মাধবী - ৮

ঋদ্ধ মাধবী আমার

মো: আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ০৪:৩২ পিএম, ১৯ এপ্রিল,সোমবার,২০২১ | আপডেট: ০১:০৩ এএম, ১৭ মে,সোমবার,২০২১

Text

আজ কোন প্রেম- বিরহের পংতিমালা দিয়ে তোমাকে লিখতে মন চাইছে না । ইট কাঠ পাথর আর কংক্রিটের এই শহরে ডাক্তারের সাহচার্য্যে তুমি নিষ্ঠুরতম হ্বদয়হীনার উপমা এখন । এক সময় মনে হতো, এই শহরের বাতাসে তোমার নি:শ্বাসের গন্ধ আছে , তাই এই শহর আমার চির চেনা , চির আপন শহর । এখন এই শহর করোনা, নিষ্ঠুরাতা , ডাক্তার-দালাল আর রাজনৈতিক নিপীড়নের  শহর হয়ে গেছে , এ শহর আমার অচেনা লাগছে , এ শহর আমার নয় !


মাধবী , আজ মনটা বড়ই চন্চল, অস্থির ! আজ বাংলা ১৪২৮ সালের পহেলা বৈশাখ, আজ রমজানের প্রথমদিন !  অথচ কি ম্যাড় মেড়ে , বর্ণহীন, গন্ধহীন এই শহরে আমরা স্থবির, অচল , অসাঢ় অবস্থায় ঘরে ঘরে বন্দি । টিভি পর্দায় চোখ রাখতেই দেখলাম ১৩ এপ্রিল ৯৬ জন মানুষ করোনায় মারা গেছে । বিকেল হতে না হতেই দুটি মৃত্যু সংবাদে টিভি- সোস্যাল মিডিয়ায় মানুষের বিষাদ ফুটে উঠেছে । একজন বাংলা একাডেমির সভাপতি জনাব শামসুজ্জামান, অন্যজন সুপ্রিম কোর্টের নব নির্বাচিত সভাপতি জনাব আব্দুল মতিন খসরু । প্রথমজনকে ব্যাক্তিগতভাবে চিনতাম না , দ্বিতীয়জনকে চিনতাম । ব্যাক্তি মতিন খসরু সাহেব সজ্জন , সৎ মানুষ ছিলেন । বাংলাদেশের আইন মন্ত্রি ছিলেন, বিতর্ক কম ছিল তাঁকে নিয়ে । ২০০৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থাকে বিতর্কিত করতে আওয়ামীলীগ যখন অন্যায্য আন্দোলন করছিল, তখন আমার পরিচিত এক সাংবাদিক বন্ধু তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “ খসরু ভাই, সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান স্যারের একটি খারাপ দিক বলেন ।”  তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “ কে এম হাসান সম্পর্কে খারাপ কথা বললে আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন না ।”  সাথে সাথে সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিলো, “ তাহলে এইটা পত্রিকায় ছেপে দেই ?” তখন জনাব মতিন খসরু সাহেবের উত্তর ছিলো, “ তাহলে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মাফ করবেন না ।”  
  রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও ব্যাক্তিগত আলাপচারিতায় গনতন্ত্রহীন সংস্কৃতির জন্য একটা দু:খবোধ ছিলো । বিচারপ্রার্থীদের পক্ষে মামলা করতে যেয়ে অন্যায় অবিচারের প্রতি তাঁর ভিতরের মনুষ্যত্ববোধের বহি:প্রকাশ ঘটতো ! তিনি আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক ছিলেন, গুনী মানুষদের সন্মান করতেন । কর্মস্থলের সহকর্মীদের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধাবোধ ছিলো । আমাদের প্রয়াত সিনিয়র ব্যারিষ্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের প্রতি প্রগাঢ়  ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধ ছিলো তাঁর ! জনাব মতিন খসরুর মৃত্যুতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবিরা একজন অভিভাবককে হারালো ! 
    জানো মাধবী, গতকাল বিএনপি নেত্রী এডভোকেট নিপুন রায় চৌধুরীকে যাত্রাবাড়ী থানার একটি মিথ্যা মামলায় চারদিনের রিমান্ডে নেওয়ার খবরে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেছি । মানুষ যখন করোনার ভয়াবহতায় আতংকগ্রস্থ, তখন এদেশের পুলিশের কিছু সদস্য বিরোধীদল দমনের   নীলনক্সা বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে । আর আমাদের সর্বোচ্চ আদালত রিমান্ড সংক্রান্ত যে গাইডলাইন দিয়েছেন সেটা উপেক্ষা করে নিন্ম আদালত রিমান্ড মন্জুর করে চলেছে ! কি বিচিত্র এ দেশ সেলুকাস !  নিপুন রায়ের রিমান্ডের সংবাদ পাওয়ার পর সুভাষ মুখাপাধ্যায় অনূদিত রোজেনবার্গ দম্পতির পত্রগুচ্ছের কিছু অংশের কথা মনে পড়ছে । সেখানে এক চিঠিতে জুলিয়াস তাঁর পাশের সেলে বন্দী স্ত্রী এথেলকে লিখেছিলেন , 
      “ নতুন উৎপীড়কের দল এক হাতে      আমাদের নিয়মতান্ত্রিক রক্ষাকবচগুলো অকেজো করে দিচ্ছে, অন্য হাতে কেড়ে নিতে চাইছে জনসাধারণের জীবন ও সমস্ত রকম স্বাধীনতা।” 
 মাধবী, আজ তোমাকে রোজেনবার্গ দম্পতির মামলার কাহিনী শুনাই ? তাঁরা কিন্তু ডাক্তার কিংবা কর্পোরেট দম্পতি ছিলো না, তাঁরা ছিলো নিউইয়র্ক শহরের প্রতিবাদী মানুষ !
১৯৫০ সাল,আইজেনহাওয়ার তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নকে গোপন আণবিক তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে গ্রেপ্তার করা হয় নিউ ইয়র্কের রোজেনবার্গ দম্পতি- জুলিয়াস ও এথেলকে। তাদের দুই শিশু সন্তান ছিলো মাইকেল ও রবার্ট। রোজেনবার্গ পরিবার বার বার নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি করেছে। মামলা চলাকালে বিশ্বের অগণিত মানুষ রোজেনবার্গ পরিবারের পক্ষে আন্দোলনে নেমেছিলেন। এমনকি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনসহ বহু বিজ্ঞানী, ফরাসি দার্শনিক জ্য পল সার্ত্রে, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি আরিয়ো ও ছাব্বিশটি পর্যায়ের তিন হাজার পাদ্রীসহ বিশ্বের নানাপ্রান্তের অসংখ্য ব্যক্তি ও সংগঠন রোজেনবার্গ পরিবারের জন্য সুষ্ঠু বিচার ও প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলো। তবে তৎকালীন মার্কিন সরকার ও তাদের অধিকাংশ গণমাধ্যম রোজেনবার্গ পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায়, যার সত্য-মিথ্যা নিয়ে রোজেনবার্গ দম্পতি চিঠিগুলোতে উল্লেখ করেছে। তাঁদের দাবী অনুযায়ী তাঁরা নির্দোষ ছিলেন । ১৯৫৩ সালের ১৯ জুন ইলেক্ট্রিক চেয়ারে শক দিয়ে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় ।মামলা শুরু থেকে আজ অবধি এই দম্পতির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। মৃত্যুর আগে রোজেনবার্গ দম্পতির ব্যক্তিগত চিঠিগুলোতে  তাঁদের বাঁচার ইচ্ছা, নিজেদের নির্দোষ দাবি করা, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা, সন্তানদের জন্য উদ্বেগ, দাম্পত্য জীবনের সুখ-দুঃখ, মিলিত হবার আকুতি, আমেরিকার ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে,পারমাণবিক অস্ত্র ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজেদের মত, মৃত্যুর আগে আপোষ করার প্রস্তাব প্রত্যাখানের গর্ব- এসবই লেখা হয়েছে। 
ব্যক্তি জীবনে এই দম্পতি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। আমেরিকার কাছে তখন ‘বামপন্থী’ মানেই একটা আতঙ্কের বিষয়  যা ‘ম্যাকার্থিজম’ , হাওয়ার্ড ফাস্টের উপন্যাস- ‘Story of Lola Gregg’ ও ‘Silas Timberman’ ‘The Passion of Sacco and Vanzetti” পড়লে ওই সময়কার অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবে  । 
 মাধবী, জুলিয়াস মৃত্যুর আগের দিন , ১৮ জুন ১৯৫৩, তাঁদের আইনজীবি ম্যানিকে লিখেছিলো, 
   “পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য, সোনার ফসল আর গোলাপের দিন আনার জন্য অনায়াসে মাথা উঁচু করে সাহসে, নিজেদের শক্তিতে, লক্ষ্য স্থির রেখে, অকম্পিত বিশ্বাসে, জল্লাদের চোখে চোখ রেখে আমরা দাঁড়াচ্ছি।”
   বাংলাদেশ আজ এমন এক অধ্যায়ের মধ্যদিয়ে পার হচ্ছে, যেখানে রোজেনবার্গ দম্পতির শেষ ইচ্ছা শক্তি অগনিত নিপুন রায়দের সাহস যোগাবে !
 সবশেষে কবি হেলাল হাফিজের এই লাইনগুলো দিয়ে শেষ করি মাধবী ? 
        “আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?
এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে!”

লেখকঃ রাজনৈতিক কর্মী

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2