avertisements 2

বিমানবন্দরের সাইনবোর্ডে বাংলার অবহেলা আমাদের আত্মসম্মানের প্রশ্ন

বাংলাভাষা কি নিজ দেশেই দ্বিতীয় সারিতে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৮ ফেব্রুয়ারী, বুধবার,২০২৬ | আপডেট: ০৭:১২ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারী, বুধবার,২০২৬

Text

এনাম হক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এটি শুধু সংবিধানের কোনো ধারা নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও নয়। বাংলা আমাদের শিকড়, আমাদের পরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব। এই ভাষায় মা প্রথম ডাক দেন, এই ভাষায় আমরা স্বপ্ন দেখি, এই ভাষার জন্যই এ দেশের মানুষ বুক পেতে দিয়েছিল গুলির সামনে। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জাতি আছে, যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। আমরা সেই গর্বিত জাতি। তাই বাংলার মর্যাদা নিয়ে সামান্য অবহেলাও মানুষের মনে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধে যায়।

কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ কিংবা বহির্গমন করলেই সেই অবহেলা চোখে পড়ে। বিমানবন্দর একটি দেশের দরজা। এখানেই বিদেশিরা প্রথম বাংলাদেশকে দেখে, এখান দিয়েই দীর্ঘদিন পর প্রবাসীরা ফিরে আসে নিজের মাটিতে। অথচ সেই দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়, বাংলাকে যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে রাখা হয়েছে।

বড় বড় অক্ষরে ইংরেজি লেখা, তার নিচে ছোট করে বাংলার অনুবাদ। “Foreign Passport”, “Arrival”, "Departure "“Transit”, “Gate” — প্রতিটি সাইনবোর্ডে একই দৃশ্য। যেন বাংলা কোনো প্রধান ভাষা নয়, কেবল একটি আনুষঙ্গিক বিষয়। দায়সারা ভাবে জায়গা দেওয়া হয়েছে, সম্মান দিয়ে নয়।

এই দৃশ্য অনেকের কাছে কেবল নকশাগত ত্রুটি নয়, এটি একটি গভীর মানসিক আঘাত। প্রশ্ন ওঠে, যে ভাষার জন্য আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, যে ভাষার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই, সেই ভাষাই কেন নিজের দেশেই নিচে থাকবে? এই প্রশ্ন যুক্তির নয়, এটি আত্মসম্মানের প্রশ্ন।

এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। বিদেশিরা এসে দেখে, আমাদের দেশে আমাদের ভাষাই নিচে। এটা শুধু সাইনবোর্ডের বিষয় নয়, এটা আমাদের মানসিকতার প্রতিফলন। বিষয়টি আসলে দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা কি সত্যিই নিজেদের ভাষাকে সম্মান করি, নাকি বছরে একদিন আবেগ দেখিয়ে বাকি সময় ভুলে যাই? রাষ্ট্রীয় স্থাপনায়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের জায়গায় যদি বাংলাকে নিচে রাখা হয়, তাহলে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে আমরা কীভাবে সম্মান জানাচ্ছি?

 বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানে বাংলাই হবে প্রধান ভাষা। বোর্ড, নোটিশ, দাপ্তরিক কাগজপত্র, সাইনবোর্ড—সব ক্ষেত্রেই বাংলা আগে, ইংরেজি পরে। আইন আছে, ইতিহাস আছে, আবেগ আছে। তারপরও কেন বাংলাকে দ্বিতীয় স্থানে রাখা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর  প্রশাসনের কাছে জানতে চাই।

বিমানবন্দর এমন একটি জায়গা, যেখানে দেশের মর্যাদা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একজন বিদেশি প্রথমবার বাংলাদেশে এসে যে লেখা দেখে, যে ভাষা দেখে, সেই দিয়েই আমাদের মূল্যবোধ বিচার করে। সেখানে যদি দেখা যায়, নিজের ভাষাকেই আমরা ছোট করে রেখেছি, তাহলে আমরা নিজেরাই কি আমাদের ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছি না?

বাঙালির ইতিহাস মানেই ভাষার ইতিহাস। ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা সকালগুলোর কথা মনে হলে আজও বুক ভরে ওঠে। তরুণেরা বুক পেতে বলেছিল—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।”
সেই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষার এমন অবহেলা নিঃসন্দেহে অসম্মানের শামিল। আমরা উন্নয়ন, প্রযুক্তি আর বিশ্বায়নের কথা বলি, কিন্তু নিজের ভাষাকে যদি প্রাপ্য আসনে না বসাই, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ?

আজ স্কুলের শিশুদের শেখানো হয়, বাংলা আমাদের গর্বের ভাষা। কিন্তু যখন তারা বিমানবন্দরে গিয়ে দেখে বাংলাই নিচে, তখন তাদের মনে কী বার্তা যায়? তারা কি শিখবে, নিজের ভাষার মূল্য কম? আবার একজন প্রবাসী বহু বছর পর দেশে ফিরে এসে বিমানের দরজা দিয়ে নামতেই যদি নিজের ভাষার অবহেলা দেখে, তার বুকের ভেতরটা কীভাবে হালকা থাকবে?

আমি বিশ্বের অনেক দেশে ঘুরেছি। কিন্তু নিজ দেশে এসে মাতৃভাষাকে এভাবে দ্বিতীয় সারিতে কোথাও দেখিনি। আমরা বাংলা ভাষাকে বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দিতে নানা কার্যক্রম চালাই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষা দিবস মনুমেন্ট করা হয়েছে , সিডনির কয়েকটি কাউন্সিলে রয়েছে একুশে কর্নার , বিভিন্ন অঞলে  পরিচালনা করা হচ্ছেবাংলা স্কুল।  কিন্তু নিজ দেশের সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখি না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

এই অবস্থা পরিবর্তন করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সাইনবোর্ড বদলানো যায়, নকশা পরিবর্তন করা যায়, নির্দেশ জারি করা যায়। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা আর সচেতন সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বাংলাকে উপরে, ইংরেজিকে নিচে রাখতে হবে স্পষ্টভাবে। বড়, পরিষ্কার ও সহজপাঠ্য বাংলা লেখা থাকতে হবে, যাতে চোখে পড়লেই বোঝা যায়—এ দেশের প্রধান ভাষা কোনটি।

বাংলা শুধু যোগাযোগের ভাষা নয়, এটি আমাদের আত্মসম্মানের ভাষা। যে জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে, সেই জাতির মুখে যেন আবার দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়—
“আমি বাংলায় কথা বলি, আমি বাংলায় গান গাই,”
কোনো সংকোচ ছাড়াই, কোনো লজ্জা ছাড়াই।

এখনই সময় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার। বিমানবন্দরের সব সাইনবোর্ড সংশোধন করতে হবে, রাষ্ট্রভাষাকে দিতে হবে প্রথম সারির সম্মান। এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি হবে আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মমর্যাদার প্রকাশ।   ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও অগ্রাধিকার দিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। দেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই আন্তর্জাতিক স্থাপনাটি যেন বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মসম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যেই সব সাইনবোর্ড, নির্দেশনা ও তথ্যফলকে বাংলাকে প্রধান ভাষা হিসেবে রাখার দাবি উঠেছে। নতুন টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাভাষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি বাস্তব ও দৃশ্যমান সম্মান জানানো হবে।    ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁদের ত্যাগের প্রতি সত্যিকারের সম্মান জানাতে হলে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে বসাতেই হবে।
বাংলাই থাকবে সবার আগে—সবার চোখে, সবার হৃদয়ে, সবার বাংলাদেশে।
লেখকঃ
সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী
বিশিষ্ট কুমির বিশেষজ্ঞ,
এম এল সি মুভমেন্টের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2