সাবেক কাউন্সিলর বাপ্পির পরিকল্পনায় হাদিকে হত্যা, অভিযোগপত্রে ফয়সালসহ আসামি ১৭
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৭ জানুয়ারী,
বুধবার,২০২৬ | আপডেট: ০৪:৩২ পিএম, ৮ জানুয়ারী,বৃহস্পতিবার,২০২৬
সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির ‘পরিকল্পনাতেই’ হাদিকে হত্যা করা হয়।
মঙ্গলবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “পতিত (আওয়ামী লীগ) সরকারের বিরুদ্ধে হাদি সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র মঙ্গলবার আদালতে দেওয়া হয়েছে। যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার আছেন।
তারা হলেন- ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ী মুফতি মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের সহযোগী মো. কবির, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম, কাউন্সিল বাপ্পির বোন জামাই আমিনুল ইসলাম রাজু এবং সিপুর ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (ফয়সাল করিম মাসুদ নন)।
আর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদ ছাড়াও মোটরসাইকেল চালক আলমগীর, ভারতে পাচারের সহায়তাকারী ফিলিপ, ফয়সলের বোন জেসমিন এবং তার স্বামী মুফতি মাহমুদ পলাতক বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গেল ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন।
চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।
গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়।
এদিকে ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাকে সহায়তাকারী মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ।
তারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার জোর গুঞ্জন শোনা গেলেও পুলিশ শুরুতে কিছু বলছিল না।
পরে ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ফয়সাল ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন।
তার আগে ১৭ ডিসেম্বর র্যাব জানায়, হাদিকে যে অস্ত্র থেকে গুলি করা হয়েছিল, নরসিংদীর তরুয়ার বিল থেকে সেটি উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তের পাওয়া তথ্যের বরাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি বিভিন্ন সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বিগত সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, ইলেক্ট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য রেখে আসছিলেন। যার ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
“ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ফয়সাল করিম এবং তার প্রধান সহযোগী মো. আলমগীর হোসেনকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সার্বিক সহায়তাকারী এবং তদন্তে প্রাপ্ত তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৬ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ কর্তৃক মনোনীত সাবেক কাউন্সিলর।”
গ্রেপ্তার আসামিদের ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ, উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঘটনার সঙ্গে আসামিদের সম্পৃক্ততার ‘প্রমাণ পাওয়ার’ কথা বলেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, “যে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে সেই অস্ত্র হাদি হত্যঅকাণ্ডে ব্যবহার হয়েছে বলে ফরেনকি প্রতিবেদনে এবং তদন্তে পাওয়া গেছে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফয়সালের ভিডিও বার্তা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলা বলেন, ওই ভিডিও বার্তা পরীক্ষা করে সত্যতা পেয়েছেন তারা।
“তবে একজন অপরাধী অনেক কথাই বলেন, এগুলো আমরা ধর্তব্যে ধরি না। আমরা তদন্তে তার এবং যাদের নামে চার্জশিট দিয়েছি, তাদের সংশ্লিতা পেয়েছি।”
ফয়সাল দুবাই আছে–এমন দাবির বিষয়ে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের কাছে তথ্য আছে ফয়সাল ভারতে গেছে।”
এ ঘটনায় জড়িত কয়েজন ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে এর আগে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছিল। পরে ভারতীয় পুলিশ তা অস্বীকার করে।
সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের কাছে তথ্য আছে, সেখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।”
ভারতে যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ‘আইনি প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে হবে’ বলে মন্তব্য করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।





