আয় কমে তলানিতে, আমিরাতে কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিরা
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৬ এপ্রিল,সোমবার,২০২৬ | আপডেট: ০৬:০৯ পিএম, ৬ এপ্রিল,সোমবার,২০২৬
একদিকে মাথার ওপর ধেয়ে আসা ড্রোন ও মিসাইলের শিকার হওয়ার আতঙ্ক, অন্যদিকে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফেরার শঙ্কা—এ দুই আগুনের মাঝে দাঁড়িয়ে দিন কাটছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু তাদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং তছনছ করে দিয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসার। আবুধাবি থেকে দুবাই—প্রতিটি শহরেই এখন এমন দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার।
যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে স্কুল ও পর্যটন খাত স্থবির হয়ে পড়ায় ট্যাক্সি চালকদের আয় কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ; কাজ হারিয়েছেন হাজার হাজার ক্লিনার ও নির্মাণশ্রমিক। দৈনন্দিন খাবারের দাম ও ঘরভাড়া এখন তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমনকি না বুঝে যুদ্ধের ভিডিও করে অনেক প্রবাসী আজ জেলহাজতে, অথচ তাদের পাশে দাঁড়াতে নেই কোনো কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা। প্রাণহানি ও কর্মহীনতার এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আজ বড্ড নিঃসঙ্গ। বিদেশের মাটিতে দেশ গড়ার কারিগররা এখন শুধু বেঁচে থাকা আর দুমুঠো অন্নের নিশ্চয়তা খুঁজে ফিরছেন।
স্থবির অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ধস
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে কর্মরত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন প্রবাসীদের বর্তমান দুরবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কষ্টের সীমা নেই; বিশেষ করে স্কুল ও পর্যটন খাত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ট্যাক্সিচালকদের আয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ইরানের মিসাইল হামলার পর থেকে স্কুলগুলো অনলাইনভিত্তিক হয়ে পড়ায় এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য কর্মী এখন পুরোপুরি কাজ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং চলতি বছর এ খাতে পরিস্থিতি উন্নতির কোনো আশাই দেখছেন না তারা। নিজেদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ প্রবাসীরা, কারণ হরমুজ প্রণালি সংকটে সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম ও জ্বালানির মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি মিসাইল হামলার আশঙ্কায় রাজমিস্ত্রি বা ক্লিনারের মতো আউটডোর কর্মীদের কাজের সুযোগও প্রায় বন্ধের পথে, যা তাদের আয়ের উৎসকে পুরোপুরি অনিশ্চিত করে তুলেছে।
মিনহাজ উদ্দিন আরো বলেন, এখানকার কঠোর নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে যুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ নিয়ম না জানায় অনেক বাংলাদেশি পাবলিক এরিয়ায় ভিডিও ধারণ করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তাদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিপদে পড়া এসব প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়াতে বা তাদের আগাম সচেতন করতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো তৎপরতা বা সমন্বয় লক্ষ করা যায়নি।
তিনি বলেন, ড্রোন ও মিসাইল হামলায় বেশকিছু বাংলাদেশি হতাহত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান সমন্বয় নেই।
সব মিলিয়ে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় প্রবাসীদের আয় তলানিতে ঠেকেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামনের দিনগুলোয় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, একদিকে জীবনের ঝুঁকি আর অন্যদিকে জীবিকা হারানোর ভয়—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের প্রবাসীরা।
দুবাই প্রবাসী মোহাম্মদ জাহেদ উল্লাহ আমার দেশকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। অনেক জায়গা এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে মার্কিন স্থাপনা, ঘাঁটি কিংবা সেনানিবাস-সংলগ্ন এলাকাগুলো। যদিও জননিরাপত্তার বিষয়ে দেশগুলোর সরকার অত্যন্ত কঠোর, তবু সার্বক্ষণিক এক অজানা আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরছে। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন প্রবাসী প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। এই কঠিন সময়ে পরিবারের দুশ্চিন্তা থাকলেও সীমিত আয়ের কারণে অনেকেরই দেশে ফেরার বা ছুটিতে যাওয়ার চিন্তা করতে পারছেন না। তারপরও যাদের আয় একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের সামনে এখন দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দুবাইয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসা ভাড়া আগে থেকেই বেশি ছিল, এখন আরো বেড়েছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাবার, পরিবহন ও ডেলিভারি খরচ। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা আর সাপ্লাই চেইনের চাপের কারণে বাজারে নিত্যপণ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। কনস্ট্রাকশন, ডেলিভারি, ক্লিনিং ও রিটেইল খাতের কাজ চললেও নতুন প্রজেক্টের গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে শুরু করেছে। ফলে অনেক কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছাঁটাই কিংবা লম্বা ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সময়মতো বেতন পাওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠানোর চ্যানেলগুলো সচল থাকলেও আয় কমে যাওয়ায় দেশের জন্য পাঠানো অর্থের পরিমাণ বা ফ্লো অবশ্যই কমে যাবে, কারণ আগের মতো বাজেটেড রেমিট্যান্স পাঠানো আর সম্ভব হচ্ছে না। কোম্পানির অধীনে কর্মরতদের বাসা ভাড়া কোম্পানি বহন করছে। তবে যারা কোম্পানিবহির্ভূত বা স্বাধীনভাবে কাজ করতেন, তাদের কাজ সীমিত হয়ে আসায় এখন থাকা-খাওয়া ও জীবন বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এক অসহনীয় কষ্টের মধ্যদিয়ে দিন পার করছেন বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে থাকে। বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং বিশ্বজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দুবাই ও আবুধাবির বাজারে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য এবং সেখানে ১০-১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। এদের বড় অংশই নির্মাণকাজ, ট্যাক্সি চালানো, ডেলিভারি সার্ভিস ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে নিয়োজিত, যা বর্তমান যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৫-১৮ শতাংশই আসে আমিরাত থেকে। তাই বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই বিশাল শ্রমবাজার এখন এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধের আতঙ্ক, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও কর্মহীনতার সংকটে থাকা প্রবাসীদের রক্ষায় অতি দ্রুত সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক ও সমন্বয়মূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু প্রবাসীদের ব্যক্তিজীবনই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।
সৌজনে-আমারদেশ





