avertisements 2

যেভাবে কুমিল্লায় হত্যার শিকার হন স্কুলছাত্রী তাজমিন, তদন্তে রহস্য উদঘাটন 

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১০ অক্টোবর,শনিবার,২০২৬ | আপডেট: ০৩:৫৫ পিএম, ১০ অক্টোবর,শনিবার,২০২৬

Text

ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে আরও একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। 

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, “এ হত্যাকাণ্ডের মোটিভের বিষয়ে আমরা অনেকটা নিশ্চিত। আটক অটোরিকশাচালক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অন্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”

যেভাবে নিখোঁজ হয় তাজমিন

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। এরপর তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে পুলিশ জানতে পারে, সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল।

৭ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় তাজমিন। রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একা নামতে দেখা যায়। পরে হোটেলের আশপাশের ক্যামেরার ফুটেজে মোবাইল ফোন হাতে ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় তাকে। এরপর সে কোথায় গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো ফুটেজ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। 

বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ঘটনার আগের রাতে বাবার মোবাইল ফোনে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল তাজমিন। তবে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পাননি। পরদিন সকালে লোকেশন পরীক্ষা করতে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তিনি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম পরে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। 

ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের কাছেই পাওয়া যায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানিটি ব্যাগ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখতে পান সাংবাদিকেরা। এলোমেলো হয়ে থাকা ধানগাছ দেখে সেখানে আলামত পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ধারণা, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে তাজমিন পালানোর চেষ্টা করেছিল।

কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং অটোরিকশাটি জব্দ করে। মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান তিনি।

ঘটনাস্থলে পাওয়া অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। এরপর সুমনকে শনাক্ত করে তার সন্ধানে অভিযান শুরু হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তাজমিনের হাতে থাকা আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। 

পুলিশের দাবি, তাজমিনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তিগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ ঘটনায় আরও একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শুক্রবার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। 

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। চাকরির সুবাদে পরিবারের সদস্যরা কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার যশোরে গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাজমিনকে দাফন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
 

avertisements 2