avertisements 2

৯০ হাজার বেতনের কর্মকর্তা সুকুমারের ৫১ কোটি টাকার আমানত

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২৬ সেপ্টেম্বর,শনিবার,২০২৬ | আপডেট: ০৫:০৩ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর,রবিবার,২০২৬

Text

সুকুমার রায়। খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক। ছিলেন সরকারের তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। চাকরি শেষ হওয়ার সময় যার মাসিক বেতন ছিল সবমিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। এই বেতনের চাকরি করে গড়েছেন সম্পদের সাম্রাজ্য। চাকরিতে থেকে সেবা করার পরিবর্তে পেয়েছিলেন যেন আলাদিনের চেরাগ। এই চেরাগের বদৌলতে শুধু সোনালী ব্যাংকেই সঞ্চিত আছে ৫১ কোটি টাকা।

এছাড়া তার নিজের নামে সঞ্চয়পত্র আছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার টাকার। কিনেছেন কমপক্ষে ৩০০ শতাংশ জমি। চেরাগের ব্যবহার করে শুধু নিজের নামেই নয়, স্ত্রী-সন্তান এবং তার পিতার নামেও সম্পদ গড়েছেন সুকুমার রায়। এনপিবির একটি বিশেষ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক পদ থেকে ২০১৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পরে সুকুমার রায় পেনশন হিসেবে এককালীন প্রায় ৮০ লাখ টাকার মত পেয়েছেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তার চাকরিজীবনে সর্বমোট প্রায় ১ কোটি টাকার বেতন ভাতা পেয়েছেন। পেনশন এবং চাকরিকালীন বেতন-ভাতা হিসেবে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা আয় করতে পারেন তৃতীয় গ্রেডের একজন কর্মকর্তা বলে জানা গেছে।

অথচ সুকুমার রায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কমপক্ষে ৫১ কোটি টাকার আমানত রেখেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে এনপিবি নিউজ। এছাড়া তার সঞ্চয়পত্র রয়েছে ১ কোটি টাকারও বেশি। এদিকে তার নামে রয়েছে বোয়ালমারি উপজেলার রামদিয়া মৌজায় ২২০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ দুটি জমি। আছে ঢাকার পল্টন এলাকায় ফ্ল্যাট। ফরিদপুর সদর এলাকায় রয়েছে আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্য। এত টাকা ও জমি কীভাবে আয় করেছেন তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা নেই। সুকুমার রায়ের আয়কর নথিতেও কোনো তথ্য নেই এসব সম্পদের।

সূত্রমতে, খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক থাকাকালীন সময়ে তিনি খোলা বাজার বিক্রয় কার্যক্রম বা ওএমএস প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিলেন। এই প্রজেক্টে বিভিন্ন অনিয়ম করে তিনি অবৈধ আয় করেছেন বলে খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এনপিবিকে জানিয়েছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় সুকুমার রায়ের সঙ্গে। তার ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন করা হলে তিনি নরসিংদীতে আছেন বলে জানান। পরবর্তীতে অভিযোগের বিষয়গুলো জানতে চাইলে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ আছে। তাতে আপনাদের কী? আপনি খুঁজে দেখেন আমার আরো অনেক সম্পদ রয়েছে।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। আবারও ফোন করা হলে তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে অনুসন্ধানের সূত্র মতে, সুকুমার রায়ের স্ত্রী বনশ্রী বোস। যিনি নিজেকে গৃহিণী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এনপিবি নিউজকে। স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল একজন গৃহিণী হিসেবে নিজেকে দাবি করলেও তার নামে থাকা সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে রয়েছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার আমানত। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকেও রয়েছে তার হিসাব যার নাম্বার ০১৯০৩১৫২৭৩-৮১১। এই হিসাবটি খুলতে তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন চাকুরিজীবী হিসেবে। কিন্তু কোথায় চাকরি করেন সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

বনশ্রী বোসের নামে রয়েছে ৫৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। এরমধ্যে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র আমানত রয়েছে ৫ লাখ টাকার। এছাড়া পরিবার সঞ্চয়পত্র হিসেবে রয়েছে ৩০ লাখ টাকা। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক আমানত হিসেবে আরো রয়েছে ১০ লাখ টাকা। বনশ্রী বোসের নামে রয়েছে ফরিদপুর সদরের শ্রীঅংগন দক্ষিণ পল্লী এলাকায় বাড়ি।

নিজেকে গৃহিণী কিংবা কখনো চাকরিজীবী পরিচয় দেওয়া বনশ্রী বোসের সোনালী ব্যাংকের ৪টি অ্যাকাউন্টের তথ্য এনপিবি নিউজের কাছে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, হিসাব নাম্বার ২০১১০৫০৫০০০৭৪০ এর বিপরীতে ২ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) হিসেবে রয়েছে। ২০১১০৫০৫০০০৮১৩ হিসাব নাম্বারের বিপরীতে রয়েছে আরো ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার এফডিআর। ২০১১০৫০৫০০০১৯১ হিসাব নাম্বারের বিপরীতে রয়েছে ১১ কোটি টাকা এবং ২০১১০৫০৫০০০২১৭ হিসাবে আছে আরো ১০ কোটি টাকার এফডিআর। এসব এফডিআর করার সময়ে দেখানো হয়েছে বাবার বাড়ি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ এবং জমি বিক্রয়ের টাকা। কিন্তু বনশ্রী বোসের ট্যাক্স ফাইলে নেই এসব সম্পদের কোনো বিবরণ।
 
সূত্রমতে, স্বামীর আয় থেকেই মূলত তিনি এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্বামীর সাথে বর্তমানে দূরত্ব আছে বলেও অনুসন্ধানে জানা যায়। বনশ্রী বোস স্থায়ীভাবে ফরিদপুরের সদরে বসবাস করলেও তার স্বামী সুকুমার রায় থাকেন ঢাকাতেই। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সাংসারিক জীবন ব্যহত হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় বনশ্রী বোসের ব্যক্তিগত গ্রামীণফোনের নাম্বারে। এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এত টাকা জীবনেও চোখে দেখিনি। আমার এত টাকা থাকলে তো ভালো হতো।’ সোনালী ব্যাংকের স্টেটমেন্ট দেখাতে চাইলে তিনি আর কোনো কথা বলবেন না বলে ফোন কেটে দেন। এরপর কয়েকবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

সুকুমার রায়ের বড় ছেলে সৌমেন রায়। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন চাকরি করছেন ইক্সোরা সলিউশন নামের একটি কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। কোম্পানিটিতে ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করলেও তার নামে থাকা সোনালী ব্যাংকের ছাত্র অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে।

 
তথ্য মতে, সৌমেন রায়ের অ্যাকাউন্টে ৪০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে তার মা বনশ্রী বোসের আইএফআইসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে। ঠিক কি কারণে বনশ্রী বোস তাকে এ টাকা দিয়েছেন তার কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়নি। সৌমেন রায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দেশে থেকে ভারতে ব্যবসা করেন বলেও জানা গেছে। সুকুমার রায়ের পিতা শান্তিপদ রায় কৃষি কাজ করতেন বলে জানা যায়। তার নামেও ফরিদপুরের বোয়ালমারি উপজেলার রামদিয়া মৌজায় ৩৭৭ নাম্বার খতিয়ানে কিনেছেন ৭৭ শতাংশ জমি। তবে তিনি কীভাবে এ জমির মালিক হলেন তার কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়নি। টাকার সংস্থান হিসেবে ছেলে সুকুমার রায়কে দাতা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বেতন-ভাতার বাইরে কি করে এত সম্পদের মালিক হলেন তা নিয়ে খোঁদ অধিদপ্তরে রয়েছে কানাঘুষা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই তিনি অনিয়ম করে অবৈধভাবে এ টাকা আয় করেছেন। নইলে একজন কর্মকর্তার এত টাকা আয় করা কোনোভাবেই সম্ভব না। তিনি সার্ভিসে থাকাকালীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সাথে তার ভালো সম্পর্কের প্রভাব খাটাতেন। বিভিন্নভাবে লীগ বিরোধী কাউকে পেলে হয়রানি করতেন। এছাড়াও তার সঙ্গে কারো বিরোধ হলে তাকে বিএনপি-জামায়াত সাজিয়ে পানিশমেন্ট পোস্টিং করাতেন। এখনো তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষকে ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফিরবে এই ভয় দেখিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন ও হুমকি প্রদান করেন।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক খোন্দকার ফরহাদ আহমেদের সঙ্গে। তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যম হলো আমাদের অন্যতম সোর্স। কোথায় কোনো অপকর্ম বা দুর্নীতি হলে আমরা সংবাদ মাধ্যম থেকে তথ্য নেই। এরপরে সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও গ্রহণ করি। যে ব্যক্তির বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে আমরা নিঃসন্দেহে তার ব্যাপারে তদন্ত করবো। এরপরে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ই-পেপার সাবস্ক্রাইব করুন

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী-সন্তানদের এত সম্পদের তথ্য তাদের ট্যাক্স ফাইলে নেই। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী যখন ট্যাক্স ফাইলে তাদের সম্পদ দেখান না তার মানে সে সেই সম্পদ দুর্নীতি বা অন্যায় করে অর্জন করেছেন। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের সম্পদ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেলে তা খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত করতে পারি।’

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2