avertisements 2

সরকারের দ্বিপাক্ষিক সফরেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলেনি

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৪ জানুয়ারী,রবিবার,২০২৬ | আপডেট: ০১:৪৭ পিএম, ৫ জানুয়ারী,সোমবার,২০২৬

Text

ছবি: সংগৃহীত।

বাংলাদেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখনো খুলেনি। দুই দেশের সরকার প্রধান পর্যায় থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দফায় দফায় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সফরের পরও শ্রমবাজারটি খোলার বিষয়ে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। আসেনি কোন সফলতা। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক ব্যার্থতার পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও ঢালাও মামলার প্রভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব মামলার কারণে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এতে মালয়েশিয়ায় নতুন করে ৫ লাখ শ্রমিক পাঠানো অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশর জন্য সৌদি আরবের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। গত বছরের ৩১ মে থেকে বাংলাদেশসহ ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু গত জানুয়ারি মাস থেকে ইন্দোনেশিয়া, নেপালসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিতে থাকে মালয়েশিয়া। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল থেকে ইতোমধ্যে ৪১ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে দেশটি। এই দুটি দেশ থেকে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক আগামী জানুয়ারি মাসে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক গেছে মাত্র ২৯০ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নেপাল ২১ হাজার ১৮৩ জন ও ইন্দোনেশিয়া ২৯ হাজার ৯০০ শ্রমিক পাঠিয়েছে। গত নভেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়া ২৫৬১ জন ও নেপাল ৫ হাজার ৭৭৩ জন শ্রমিক পাঠিয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ বাদে অপর ১৪ সোর্স কান্ট্রিগুলোর ২০২৫ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২২ জন শ্রমিক পাঠাতে নিবন্ধন করেছে। এরমধ্যে নেপাল ৬০ হাজার, ইন্দোনেশিয়া ২২ হাজার ৬৮৫, ভারত ১২ হাজার ২৭ জন, পাকিস্তান ৭ হাজার ৪২৮ জন, ফিলিপাইন ৬ হাজার ২০৪ জন, মিয়ানমার ১ হাজার ৩৬০ জন, থাইল্যান্ড ৬০৮ জন, শ্রীলঙ্কা ৩৭৭ জন ও ভিয়েতমান ৯২ জন। আর বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর নিবন্ধন হয়েছে ১ হাজার ৮৫৩ জন। 

২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত কলিং ভিসা, নিয়োগানুমতি, বিএমইইটির ছাড়পত্রসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেনি। গত বছরের ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তিনি এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল দুইবার মালয়েশিয়া সফর করেন। এছাড়াও কয়েক দফায় যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয়েছে। কিন্তু শ্রমবাজার খোলার কোন ধরনের সুফল আসেনি। গত বছরের মে মাসে আটকে পড়া শ্রমিকদের মালয়েশিয়া পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল)। সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এসব শ্রমিক পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। শুরুতে বোয়েসেলকে ২০২৪ সালে আটকা পড়া ৭ হাজার ৮৬৯ জন শ্রমিক পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত জুলাই থেকে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় মাস হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫০ জন শ্রমিক পাঠানো গেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অপর শ্রমিকদের পাঠানো সম্ভব না হলে এই শ্রমিকদেরও কপাল পুড়বে। তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হযে যাবে। 

এদিকে আটকে পড়া শ্রমিকদের বিনা খরচে পাঠানোর কথা, তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা করে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বর জারি করা সার্কুলারে শ্রমিক পাঠানোর এই খরচ নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য সরকার অনুমোদিত খরচ ধরা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯০০ টাকা। বোয়েসেল তাদের বোর্ড সভায় অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার একটি সংস্থাকে ভিসা ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশি টাকায় ৭৫ হাজার টাকা করে দিয়েছে। এই টাকা বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আলতাফ খান ও মালয়েশিয়ান নাগরিক জসওয়ান সিং নামক ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। ওই সম্পূর্ণ টাকা দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ অবৈধ প্রক্রিয়ায় বা হুন্ডির মাধ্যমে। সরকারি প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে হুন্ডির মাধ্যমে এই টাকা পরিশোধ করলো এটা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন সরকারি সংস্থা বোয়েসেল অবৈধভাবে ভিসা ট্রেডিং ও মানবপাচারে জড়িত হয়ে পড়েছে। অথচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা বা অন্যরা এবিষয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। 

    
বোয়েসেল উচ্চমাত্রায় অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করাকে অবাস্তব বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা এবং অভিযোগ, বোয়েসেল ভিসা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তারা ১ লাখ টাকা রেখেছেন ভিসা ক্রয়ের ফি বাবদ। এরপরও শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে জিটুজি প্লাস চুক্তি অনুযায়ী ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক পাঠানো হয়। এই শ্রমিক পাঠাতে অর্থ পাচারের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় সরাসরি অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার সঠিক তদন্ত না হওয়ায় এরই মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এসব ‘অপ্রমাণিত’ অভিযোগ প্রত্যাহার না করা হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না।

জনশক্তি রপ্তানি কারকদের সংগঠন বায়রার সিনিয়র সদস্য মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, আমরা যখন লোক পাঠাই তখন ভিসা ট্রেড করায় আমাদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও মানবপাচারের অভিযোগে সিআইডি এবং দুদক মামলা করেছে। এখন সরকারি সংস্থাও একই কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কারা? বোয়েসেল যে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা নিচ্ছে সেখানে এক লাখ টাকা রাখা হয়েছে ভিসা ক্রয় বাবত। তারা কোন বৈধ চ্যানেলে এসব অর্থ পাঠানোর তথ্য আমাদের জানা নেই। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সরকার প্রধান পর্যায়ের সভা করে আটকে পড়া ১৮ হাজার শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। যার কাজ নেয় বোয়েসেল। তারা শুরুতে ১৪ হাজার পরে ৭ হাজার ৮০০ নির্ধারণ করে। বেঁধে দেওয়া ছয় মাসের আর মাত্র ১৫ দিন বাকী। কিন্তু শ্রমিক গেছে মাত্র ১৯০ জন। বাকী শ্রমিক আদৌ যেতে পারবে কিনা নিশ্চিত নয়। অথচ ওইসব শ্রমিকের ডিমান্ড ভিসা সবই এনেছিল বেসরকারি এজেন্সি। তাদেরকে এসব শ্রমিক পাঠানোর দায়িত্ব দিলে অনেক আগেই এসব শ্রমিকরা চলে যেতো। এসব শ্রমিক যেতে না পারায় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সরকার ও শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স কমেছে। শিমুল আরও বলেন, সরকারি সংস্থাও এখন মানবপাচার ও অর্থ পাচারের মামলা করছে। এসব মমালার কারণে শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার মানবপাচার সূচক কমছে। 

বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব পূত্রামালয়েশিয়ার গবেষক সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের মে মাসে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যে বাজার খুলতে পারেনি। এ সুযোগ নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দখল করে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা বেশ কিছু বিধি ও শর্ত জুড়ে দেওয়ার বিষয়ে অবহিত হয়েছি। কিন্তু নতুন বাজার খোঁজা ও বিদ্যমান বাজারগুলোর সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়াসহ বিদেশে নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ না দিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফলে নতুন শ্রমবাজার খুলছে না; বরং পুরোনো যেগুলো আছে, সেগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
 

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2