avertisements

সিডনী হিল্টনঃ নিভৃতবাসের দিনগুলি - ৪

ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ০৮:৩০ পিএম, ৮ সেপ্টেম্বর,মঙ্গলবার,২০২০ | আপডেট: ০৮:৫৮ পিএম, ২৮ সেপ্টেম্বর,সোমবার,২০২০

Text

দেশ-বিদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বন্ধু ও কাছের মানুষ থেকে প্রচুর টেলিফোন পাচ্ছি। কেউ সময় বেধে প্রতিদিন খবর নিচ্ছে, কেউ যখন-তখন যতক্ষণ ইচ্ছে কথা বলারও লাইসেন্স দিচ্ছে। সিডনীর এক বন্ধু নিয়মিত ইনবক্সে কৌতুক পাঠাচ্ছে, কেউ আবার নেটফ্লিক্সে পছন্দের মুভি ও কোরিয়ান সিরিয়ালের তালিকা দিচ্ছে। পড়ার বই ও পছন্দের খাবার পাঠাবে কিনা সে কথাও বলছে অনেকে। এই কয়টা দিনে কবিতা, নতুন গান লিখারও ফরমাইস পাচ্ছি। 


সিডনীর এক বন্ধুর অফিস যাতায়তের পথেই পড়ে সিডনী হিল্টন। অফিস যাওয়ার সময় বন্ধুটি চলমান গাড়ী থেকে প্রায় প্রতিদিনই খোঁজ নিচ্ছে, কেমন আছি। সবার একটিই কামনা - আমার নিভৃতবাসের দিনগুলো আলোকিত হোক, দারুণভাবে কাটুক। আমাকে নিয়ে সবার উৎকন্ঠা ও অকুন্ঠ ভালোবাসা কোয়ারিন্টিনের ধূসর দিনগুলোর গায়ে কাশফুলের শুভ্রতা মেখে দিচ্ছে। 


সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা, এই তিন বেলা আমার কক্ষের দরজার ওপাশে খাবার রাখা হয়। সকাল বেলা নিঃশব্দে দিয়ে গেলেও দুপর এবং রাতের খাবার দেয়ার পর দরজায় টোকা দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়, খাবার এসেছে, খেয়ে নাও। কখনো টোকার শব্দ শুনে ভুল করে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেই। দেখি কোথাও কেউ নেই। কাউকে না পেয়ে বিব্রত হই। করিডোরে বসে থাকা নিরাপত্তা কর্মীর সাথে দৃষ্টি বিনিময় হয়। নিরাপত্তা কর্মীর মুখে সূক্ষ হাসির রেশ দেখতে পাই। তবে দরজায় প্রতিদিন এই চারটি টোকার আওয়াজ শুনে মনে হয়ে আমি একা নই, যেন ওদেরই একজন। 


এছাড়া প্রতিদিন নার্স সেন্টার থেকে আসে একটি টেলিফোন। ওরা শুনতে চায়, কভিডের কোনো লক্ষণ দেখা দিয়েছে কিনা। অথচ কখনোই জানতে চায়না, কোয়ারিন্টিনের চার দেয়ালের মধ্যে কেমন আছে মানুষগুলো, কেমন করে কাটছে তাদের দিন।  


এক বন্ধু সেদিন কৌতুকের ছলে বললো, “হিল্টনে কি আর থাক হবে? মজা করে নাও”।  পাঁচ দিনের মাথায় পাঁচ তারকা হোটেলে থাকার মজা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি।  হোটেলের দেয়া খাবারে এরই মধ্যে নিদারুণ অরুচী ধরে গেছে । মেন্যুতে বৈচিত্রের যদিও শেষ নেই, তবুও খাবারের দিকে তাকালেই মোচড় দিয়ে উদরের সবকিছু যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভেবেছিলাম, কোয়ারিন্টন থেকে বের হয়ে তবেই খাবো বাড়ীর রান্না। তা আর হলো কই? জরুরী বার্তা পাঠালাম স্ত্রীর কাছে। খাবার চাই। অবশেষে ৭ম দিনে ফিরিয়ে দিলাম হিল্টনের খাবার। বাড়ী থেকে পাঠানো বিরিয়ানী, মাছ, সাদা ভাত, টামাটোর চাটনি, মরিচ ভর্তা খেলাম আয়েস করে।  
পাঁচ তারকা হোটেলের কক্ষ যে কারাগারের জরাজীর্ণ প্রকোষ্ঠের চেয়েও জৌলুসহীন হতে পারে, পাঁচ কিংবা অগনন তারকা খচিত তুলতুলে পালঙ্কে শুয়েও যে অন্তহীন নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় - হিল্টনের নিভৃতবাসে না আসলে আমার কখনো জানা হতনা। সত্যিই, করোনা অনেক কিছুই শেখাচ্ছে আমাদের।

(চলবে)

-লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন হতে সংগৃহীত

বিষয়: সিডনী
avertisements