একটি স্মৃতিচারণ মূলক আখ্যান
প্ল্যানচেট
রতন কুণ্ডু
প্রকাশ: ০৭:২৫ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারী,শনিবার,২০২১ | আপডেট: ১২:২৭ এএম, ২ জানুয়ারী,বৃহস্পতিবার,২০২৫
ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের কুল ঘেঁষে বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়| ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় এই বিশ্ববিদ্যালয়ক্যাম্পাস | এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারাই পড়াশুনা, অধ্যাপনা কিংবাচাকুরীর সুযোগ পেয়েছে তাঁরা অত্যন্ত ভাগ্যবান | ক্যাম্পাসেরমাটির সোঁদা গন্ধ, ব্রহ্মপুত্রের কুল ঘেঁষে কাশবন, ইউক্যালিপটাসবাগানের ঝিরিঝিরি হাওয়া আর নদীর কুলুকুলু শব্দে আমাদেরজীবন গাঁথা হয়েছিলো |
ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক ছিলো ত্রিমাত্রিক | ড. হাফিজ ইংল্যান্ডেরলিভারপুল থেকে সদ্য ডক্টরেট সম্পন্ন করে এসেছেন | মনসুরুলআমিন স্যার এর আগেই ইংল্যান্ড থেকে পি এইচ ডি করেফিরেছেন | হঠাৎ এক বিকেলে ফ্যাকাল্টি লবিতে দেখা
- রতন বিকেলে ফ্রি আছো ?
- হ্যা স্যার | কেনো বলুনতো ?
- ফ্রি থাকলে টিএসসি তে চলে আয় !
- বিশেষ কিছু আছে স্যার ? কিছু নিয়ে আসবো ?
- না হাফিজ এসেছে ইংল্যান্ড থেকে, আতাউর আসবে | তুইমোস্তফাকে নিয়ে ৭ টার দিকে চলে আয় |
বলা প্রয়োজন আমাদের ফ্যাকাল্টির প্রগতিশীল সদ্য শিক্ষকেরাছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো | আমি একটু আনাড়ি ও বহির্মুখীহওয়ার কারণে তাঁরা আমাকে আলাদা করে ভালো বাসতেন | মনসুরুল আমিনের মতো অনেকেই আমাকে তুই তুই করেসম্বোধন করতেন | এই সম্বোধন ছিলো অনেক স্নেহ আর অনেকভালোবাসা মাখা | যাই হোক, সেদিন বিকেলে আমি ও আমাররুমমেট অগ্রজ মাহবুব মোস্তফা ভাইকে নিয়ে মনসুরুল আমিনস্যারের টিএসসির ষ্টুডিও এপার্টমেন্টে হাজির হলাম | সেখানেইহাফিজ স্যারের সাথে প্রথম পরিচয় | উঁচু লম্বা ফর্সা সুঠাম ঝাঁকড়াচুলে সুঠাম দেহের অধিকারী এক যুবক | প্যারাসাইটোলজিবিভাগের সহযোগী অধ্যাপক | এক পর্যায়ে মনসুরুল আমিন স্যারকাছে ডাকলেন | ফিসফিসিয়ে আমার কানে কানে কিছু বললেন | আমি যথারীতি তাঁর নিত্যদিনের সহকারী বাবুলকে নিয়ে কো-অপারেটিভ মার্কেট থেকে সিঙ্গারা, ডালপুরি, ছোলাভাজি আরএক প্যাকেট ৫৫৫ সিগারেট নিয়ে ফিরে এলাম | জম্পেশ আড্ডাহয়েছিলো সেই বিকেলে | নবাগত হাফিজ স্যার সেদিন ছাত্র শিক্ষকত্রিমাত্রিক সম্পর্কের উপর একটি সংজ্ঞা আমাদের বলেছিলেন তাএখনো আমার মনে গেঁথে আছে ও আমি লালন করি | তিনিবলেছিলেনঃ
“ Teacher is a friend, a philosopher and a guide of a student” অর্থাৎ প্রকৃত শিক্ষক একজন ছাত্রের ভালো বন্ধু, দার্শনিক ও পরিচালনাকারী হবেন | স্যারের এই সংজ্ঞায় আমরাআপ্লুত হলাম ! সেই থেকেই অন্ততঃ এই তিনজন শিক্ষকের সাথেআমাদের সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুর মতোই নিবিড় |
এর পর একাডেমিক প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে স্যারদের বাসায়যেতাম | লাভ ছিলো দ্বিমাত্রিক, একঃ তাঁদের আনুকূল্য লাভ এবংদ্বিতীয়ত: ভাবীর হাতের এগ নুডলস, এগ রোল, ভাপা পিঠা সহনাম না জানা অনেক ইংলিশ খাবার | বলা প্রয়োজন আতাউরভাই ও মনসুর ভাই তখনো বিয়ে করেননি | সুতরাং একমাত্র ভাবীছিলেন টিনা ভাবী | অর্থাৎ মিসেস হাফিজ | সব ইয়ং টিচার আরআমাদের মতো ভাদাইম্যা ছাত্রদের আড্ডা ছিলো হাফিজ স্যারেরবাসায় | টিনা ভাবিও আমাদের খুব পছন্দ করতেন | নিত্য নতুনআইটেম করে খাওয়াতেন | আর সেই লোভে আমরা "শিয়ালেরসেই ভাঙা বেড়া" দেখানোর গল্পের মতো তাঁর স্টাফ কোয়ার্টারেগিয়ে ঢু মারতাম |
হাফিজ স্যারের মুখাবয়টা ছিলো মঙ্গলযেড | অর্থাৎ চাকমাদেরমতো দেখতে | একদিন আড্ডার সময় এই প্রসঙ্গ উঠতেই তিনিকিছুক্ষন যেনো কি ভাবলেন | মনে হলো স্মৃতির মণিকোঠা হাতড়েবেড়াচ্ছেন ! কিছুক্ষন পরে চোখ খুললেন |
- আচ্ছা রতন, তুমি ইএসপির কথা শুনেছো ?
- জ্বিনা স্যার | ইএসপি কি স্যার ?
- ইএসপি হলো এক্সট্রা সেনসেশনাল পার্সেপশন | অর্থাৎ যাঁদেরএটা আছে তাঁরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখতে পায় | আমারমনে হয় ইএসপি প্রবল ! আমার স্নায়ু সজাগ হলো |
- স্যার একটু বিস্তারিত বলবেন |
শোনো তাইলে | অন্যের কাছে বললে সবাই নির্ঘাত আমাকেপাগল বলবে | আমার কেনো জানি মনে হলো তুমি এই কাহিনীটাবিশ্বাস করবে | কারণ তোমরাতো পুনর্জন্মে বিশ্বাস করো ?
- আমি এ মিথ শুনেছি কিন্তু বিস্তারিত জানিনা স্যার |
- শোনো ছেলেবেলা থেকে আমি ভোররাতে যতগুলো স্বপ্ন দেখেছিতার সবগুলোই ফলে গেছে | আমি নিজেও অবাক হয়েছি ! আমিআমার পূর্বজন্ম দেখতে পেয়েছি | একবার নয়, একাধিকবার | আমি সম্মোহিত হলাম | গুটি শুটি মেরে একাগ্রমনে স্যারের গল্পশুনছি | গায়ের পশমগুলো দাঁড়িয়ে গেছে | আমার সম্পূর্ণমনোযোগ স্যারের মুখের দিকে | তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখবন্ধ করে বলে চলেছেন |
আমি পূর্বজন্মে একজন কোরিয়ান কৃষকের ঘরে | আমার বাবামায়ের পাঁচ সন্তানের মধ্যে আমি ছিলাম সবার বড়ো | আমারছেলেবেলায় পড়াশুনার পাশাপাশি বাবাকে মাঠ চাষে সাহায্যকরতাম | আমাদের বাড়ির পাশেই ছিলো ছোট্ট একটি নদী | আমাদের দুটো ডিঙি নৌকা ছিলো | একটি করে আমরা মাছধরতাম আর অন্যটি দিয়ে হাট বাজার ও কোথাও বেড়াতেযাওয়ার কাজে ব্যবহার করতাম | আমাদের বাড়িতে একটি ছোট্টবুদ্ধ মন্দির ছিলো | মা প্রতিদিন সকালে সেখানে মোমবাতিজ্বালাতো | বাবা মাঠে যাওয়ার আগে সেখানে প্রার্থনা করতো | প্রার্থনার শেষ কথা ছিলো | নির্বাণ | আমার অন্য দু ভাই ও স্কুলেপড়তো | বোন দুটো ছোটো ছিলো | আমি ছিলাম হাড় জিরজিরে | আমার নাকি ক্ষয়রোগ হয়েছে | আমি নাকি বেশিদিন বাঁচবোনা | তাই আম্মা ঈশ্বর বুদ্ধের কাছে আমার রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনাকরতেন | এর মধ্যে দরজায় কলিং বেলের শব্দে স্যারের গল্প বন্ধহয়ে যায় | ভাবীকে উদ্দেশ্য করে বললেন - দেখতো টিনা কেএসেছে ! ভাবি দরোজা খুলতেই আতাউর ভাই আর মনসুরুলআমিন স্যার হাতে দুটো ঠোঙ্গা নিয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে | হাফিজ স্যারের মুখ উজ্জ্বল হয় | ও তোমরা এসে গেছো ! আমিওদের সাথে গল্প করছিলাম | আমি বলে উঠলাম
- স্যার আমরা তাইলে আজ উঠি ! স্যার বললেন
- না তোমরা থাকতে পারো | আজ একটা ইন্টারেষ্টিং ইভেন্টেরপরিকল্পনা আছে | আমি আর মানসুর আজ প্ল্যান্সেটে বসবো | তোমরাও থাকতে পারো | কিন্তু কোনো কথা বলতে পারবেনা | পিনড্রপ সাইলেন্ট ! পারবে ? আমরা বোকার মতো স্যারের মুখের দিকেতাকিয়ে আছি |
- স্যার, প্ল্যানচেট কি ? হাফিজ স্যার বললেন
- প্ল্যানচেট হলো একটি পবিত্র বোর্ড | ওই বোর্ডে মৃত যে কোনোব্যক্তির আত্মাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় | অনেক আত্মা আসতেচায়না তখন অন্য আত্মাকে ডাকতে হয় | তাকে প্রশ্ন জিজ্ঞেসকরলে উত্তর দেয় | ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলোনা বলে প্রাক্টিক্যালিদেখার অদম্য ইচ্ছেটা চেপে রাখতে পারলাম না | এর মধ্যে টিনাভাবি এসে বললো
- তোমাদের চা দেই ? হাফিজ স্যার বললেন
- না এখন না | প্ল্যানচেট সেশন শেষ হলে চা খাবো |
আমাদের সবাইকে পাশের রুমে নিয়ে গেলেন স্যার | রুমেরমাঝখানে একটি টেবিল আর তাকে ঘিরে ৬ টি চেয়ার | হাফিজস্যার আর মানসুর স্যার মুখোমুখি বসলেন | আমরা অন্য চেয়ারগুলোতে বসলাম | হাফিজ স্যার একটি বাক্স থেকে লুডু খেলারবোর্ডের মতো একটি বোর্ড বের করলেন | বোর্ডের উপরিভাগেইংরেজিতে লিখা "welcome”, নিন্মভাগে-“Good bye”, ডানপ্রান্তে -"Yes” আর বামপ্রান্তে "No” এর সাথে চক্রাকারেসাজানো আছে A থেকে Z ও 1 থেকে 9 ও 0 পর্যন্ত | আছে একটিহালকা সাদা রঙের বোতলের ছিপির মতো একটা কর্ক যা সহজেইওই বোর্ডের উপর চলাফেরা করতে পারে | দুজনের অনামিকাআঙ্গুল দিয়ে ওই ছিপি যা বোর্ডের কেন্দ্রে স্থাপন করে মুখোমুখি বসেদু প্রান্তে আলতো করে স্পর্শ করতে হবে | হাফিজ স্যার রুমের বাতিনিভিয়ে দিলে এক ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় | তারপর তিনিএকটি মোমবাতি জ্বালালেন | আবছা আলো আধারিতে দুজনমুখোমুখি বসলেন | আমি আর মোস্তফা ভাই নীরব দর্শক | আতাউর ভাই ভাবীর হাতের চা আর মার্কেট থেকে কেনা সিঙ্গারাখাচ্ছে ড্রয়িং রুমে বসে | পুরো প্রক্রিয়াটি ইংরেজিতে | পাঠকদেরবোঝার সুবিধার জন্য আমি অনুবাদ করে দিচ্ছি |
দুই স্যার প্ল্যানচেটএ বসার আগে শলা পরামর্শ করছেন কার কারআত্মাকে আবাহন করবেন | ঠিক হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মাগান্ধী, শেখ মুজিব, মার্গারেট থ্যাচার, আব্রাহাম লিঙ্কনের এঁদেরআত্মাকে আবাহন করবেন | প্রক্রিয়া শুরু হলো | দুজন দুপাশথেকে কর্কের দুপ্রান্ত আলতো করে স্পর্শ করে চোখ বন্ধ করেএকাগ্ৰভাবে ডাকছেন
- হে রবি ঠাকুরের শুদ্ধ আত্মা আমরা আপনাকে প্ল্যানচেট বক্সেআসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি | এই প্রক্রিয়া কয়েক মিনিট চলার পরেকর্ক নড়ে উঠলো | আমার শরীরও কাটা দিয়ে উঠলো | কর্ক ধীরেধীরে Welcome বাটনের দিকে চলতে শুরু করলো | সেখানে স্পর্শকরার পর আবার কর্ক কেন্দ্রের কাছে চলে এলো | হাফিজ স্যার প্রশ্নকরলেন
- হে শুদ্ধ আত্মা, আপনি কি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজিআছেন ?
এরপর কর্কটি No লিখা বাটনের দিকে চলতে শুরু করলো | স্যারদের চোখে মুখে হতাশা দেখতে পেলাম | এরপর কর্কটি Good bye বাটনের দিকে চালিয়ে তাঁর আত্মাকে বিদায় জানানো হলো | এরপর তাঁরা মহাত্মা গান্ধীর আত্মাকে আবাহন করলেন | একইপ্রক্রিয়ায় তাকে ওয়েলকাম করে প্ল্যানচেট বক্সে নিয়ে আসলেন | তিনি উত্তর দিতে রাজি হলে স্যার তাঁকে নানান রকম প্রশ্ন করেন ওসম্ভাব্য উত্তর জিজ্ঞেস করলে আত্মা Yes অথবা No জবাব দিতো | সময় সংক্রান্ত প্রশ্ন হলে কর্কটি 1 থেকে ০ দিকে গিয়ে একটিসংখ্যমান নির্দেশ করতো | স্যারেরা অনেক প্রশ্ন করেছিলেন তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর বলছি | হাফিজ স্যার প্রশ্নকরেছিলেন
- এরশাদ সাহেব কত বছর ক্ষমতায় থাকবেন ? উত্তর ছিলো ৭বৎসর |
- মনসুরুল আমিনের বিয়ে কত বৎসরে ? উত্তর ছিলো
No|
আমরা মুচ্কি হাসলাম | স্যার আবার প্রশ্ন করলেন
- ব্রিটেনে এরপর করা ক্ষমতায় আসবে লেবার না লিবারেল ? লিবারেল বলার পরে -Yes হলো
- ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে কে জয়ী হবে ?
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড - No
লিভারপুল - No
রেন্জার্স - Yes
- মনসুরুল আমিন তার টেনিস ব্যাট কোথায় হারিয়েছে ?
কো-অপেরাটিভ মার্কেট - No
ডিপার্টমেন্ট - No
টয়লেট - Yes
আরো অনেক প্রশ্ন তাঁরা করেছিলেন | সবটা মনেও নেই | উত্তরেরসত্যতাগুলোও যাচাই করিনি কোনোদিন | তবে পরে জেনেছিএরশাদ সাহেব প্রায় দু টার্ম ক্ষমতায় ছিলেন | মনসুরুল আমিনস্যার চির কুমার ছিলেন | আজ প্রবাসে বসে আমার এই প্রিয়তিনজন শিক্ষক তথা প্রিয় তিন বন্ধুর কথা মনে আসছে | তাঁরানিকটজন সবাইকে ছেড়ে, সব কাজ অসমাপ্ত রেখে জীবনের মধ্যদুপুরেই ওপারে পারি জমালেন | যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন | আমিও হয়তো একদিন প্ল্যানচেট এ আপনাদের আত্মাকে আলাদাআলাদা ভাবে নিয়ে আসবো | আপনাদের প্রত্যেককে একই প্রশ্নকরবো:
- আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন ? আপনিকি আমাকেআগের মতোই স্নেহ করেন ? আপনার কি কষ্ট হয়না ? তারপরউত্তরগুলো মিলিয়ে বিদায় নেবো |
স্থানঃ প্রিন্স অফ ওয়েলস হাসপাতাল, আইসলাসন ওয়ার্ড, সিডনি
তারিখঃ ২১ সে ফেব্রুয়ারী ২০২১