avertisements 2

পরীমনিকে গ্রেপ্তারের পর চাকরি হারিয়েছিলেন সেনা কর্মকর্তা খায়রুল

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৪ জুলাই,বৃহস্পতিবার,২০২৪ | আপডেট: ০৪:৫৫ পিএম, ১৩ জুলাই,শনিবার,২০২৪

Text

 ২০২১ সালের আগস্ট মাসের ৪ তারিখ। টেলিভিশনে লাইভ দেখছিলেন অনেকেই। বহু সাংবাদিক সেদিন ভিড় করেছিলেন রাজধানীর বনানীর একটি বহুতল ভবনের সামনে। সেই ভবনে থাকতেন আলোচিত-সমালোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনি। তার প্রকৃত নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। ফেসবুকে সেদিন একটি লাইভও করেন এ ঢালিউড অভিনেত্রী। এর অল্প সময় পর র‍্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ খায়রুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দলের হাতে গ্রেপ্তার হন পরীমনি। আটক করা হয় আরও ৩-৪ জনকে । পরে একটি মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় র‍্যাব সদর দপ্তরে। 

সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের তৎকালীন গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, পরীমনির বাসায় ১২০টি ব্যবহৃত মদের বোতল  পাওয়া গেছে। এগুলোর সঙ্গে রাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার কথিত চলচ্চিত্র প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের সম্পৃক্ততা আছে।

এ সময় আরও জানানো হয়, পরীমনির বাসায় মিনিবার ছিল। চাহিদা মেটানোর জন্য তিনি নিজের ফ্ল্যাটে মিনিবার স্থাপন করেন। তার এ বারে নজরুল ইসলাম রাজসহ বিভিন্ন লোকজনের যাওয়া আসা ছিল। বাসায় নিয়মিত মদের পার্টি করতেন পরীমনি।

পরীমনিকে আটক করার পর প্রথম দফায় চারদিন এবং দ্বিতীয় দফায় দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ২৬ দিন কারাগারে থাকার পর ৩১ আগস্ট তিনি জামিন পান। আর অন্যদিকে কয়েক মাসের মাথায় চাকরি হারান লেফটেন্যান্ট কর্নেল খায়রুল ইসলাম।

খায়রুল ইসলাম ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত র‍্যাবে অনেক প্রভাবশালী ছিলেন। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ তাকে সরাসরি চিনতেন। এ কথা জানিয়েছিলেন সেসময় খায়রুলের এক সহকর্মী।  

খায়রুল সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাব যান ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। এক মাস পরে তিনি যোগদান করেন র‍্যাব ১২ সিরাজগঞ্জে। এরপর ২০২০ সালের নভেম্বরে র‍্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেমকে সরিয়ে গোয়েন্দা প্রধান হন। 

ওই সময় র‍্যাব থেকে জানানো হয়, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খায়রুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পরিসরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ‘চৌকস অফিসার’। তিনি সুদানে জাতিসংঘ মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। র‍্যাব তখন জানায়, খায়রুলের নেতৃত্বে র‍্যাব-১২ জঙ্গি, মাদক, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, অবৈধ অস্ত্রধারীসহ বিভিন্ন অপরাধীদের দমনে সফলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। এছাড়াও সমাজের নানা অপরাধ দমন সংক্রান্ত অভিযানে খায়রুল সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু এর ১১ মাসের মাথায় গোয়েন্দা প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে ২০২১ সালের অক্টোবরে খায়রুল ইসলামকে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়। তার স্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েলকে।

বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটের বিষয়ে খায়রুলকে চেনেন এমন আরেকজন কর্মকর্তা জানান, এরপর (পরীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা) দুর্নীতির অভিযোগ আসতে থাকে খায়রুলের বিরুদ্ধে। তাকে প্রত্যাহার করা হয় র‍্যাব থেকে। তিনিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘কোর্ট অব ইনকুয়ারি’। 

এতে খায়রুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ পাওয়ায় তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয় বলে জানান তৃতীয় এক কর্মকর্তা। 

ঠিক ওই সময়ই খায়রুল হজ পালনে সৌদি আরবে যান। ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর তার চাকরিচ্যুতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি তখন জানান, তিনি ওমরাহ পালনের জন্য মা-বাবাকে নিয়ে তিনি সেদিনই মক্কা নগরীতে পৌঁছেছেন। তিনি দোয়া প্রার্থনা করেন। এরপর কয়েক মাস পরে ২০২৩ সালে থেকে তাকে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে। তবে তার সাথে তখন আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল খায়রুল ফেসবুকে লেখেন, ‘…প্রায় ২২ বছর চাকরি শেষে সামরিক জীবনেরও সমাপ্তি এবং নতুন অধ্যায় তথা প্রবাস জীবনের শুরু। এর মাঝে বিবাহিত জীবন, বাচ্চাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠার মতো অতি উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো তো আছেই।‘

এর আগে ডিসেম্বর মাসে তিনি লেখেন, ‘আমার জীবনের খারাপ বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম ২০২৩ সন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল কিছু মানুষের আসল চরিত্র খুঁজে পাওয়া (ভালো/খারাপ দুই দিকেই)। তার পরেও বছরটি শেষ হলো, আলহামদুলিল্লাহ। ২০২৪ সনের কাছেও বেশি চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। নিজের মনের মতো করে অনেক কিছুই হবে না জানি, না পাওয়ার হিসাবগুলো সহজভাবে মেনে নিতে পারলেই খুশি থাকব।‘

চলতি সপ্তাহে বাংলা আউটলুক তার কাছে চাকরি চলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চায়। তবে তিনি বিস্তারিত জানাতে আগ্রহ দেখাননি।

খায়রুল ইসলাম বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির ৪৪তম লং কোর্সে কমিশন পান ২০০১ সালের ১৭ জুন। স্বাভাবিকভাবে তার ২০৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা। তবে তাকে প্রায় সাত বছর আগেই ফিরে যেতে হয়েছে।  

খায়রুল ২০০৮-২০০৯ সালে সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করেন। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে তিনি ২০১২ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজ করেন।

র‍্যাবে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কিছু জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আর র‍্যাবের মুখপত্র কোনো উত্তর দেননি। তবে র‍্যাবের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে কেবল বলেছে, 'তার বিষয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মাতৃ বাহিনী। ‘

এর আগে খায়রুলের বিষয় জানতে চাওয়া হয় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) কাছে।  সেখান থেকে জানানো হয়, তারা সেনাবাহিনীর কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইবে। তথ্য পাওয়া গেলে জানাবে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিষয়ে আইএসপিআরের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

সম্প্রতি গুলশান গোয়েন্দা বিভাগের এডিসির দায়িত্বে থাকার সময় ‘তদন্তের সূত্রে অভিনেত্রী পরীমনির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে’ জড়ান গোলাম সাকলায়েন। তার স্ত্রীও সরকারি কর্মকর্তা। পরীমনির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরুর পর প্রথমে সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাকে ঝিনাইদহ ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়। সম্প্রতি পরীমনি বিতর্কে সেই সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর আবেদন করা হয়েছে।
 

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2