এপি'র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
বাংলাদেশিদের চাকুরির প্রলোভনে রাশিয়া থেকে পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধে
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৩১ জানুয়ারী,শনিবার,২০২৬ | আপডেট: ০১:০৩ এএম, ১ ফেব্রুয়ারী,রবিবার,২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ায় সাধারণ চাকরির আশ্বাসে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের—এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক অনুসন্ধানে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা বাবুর্চির মতো বেসামরিক কাজের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের সেখানে নিয়ে গিয়ে জোর করে সামরিক চুক্তিতে সই করানো হচ্ছে এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। অনেককে মারধর, কারাবাস কিংবা হত্যার হুমকি দিয়ে বাধ্য করা হয়েছে সম্মুখসমরে যেতে।
লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাকে ও আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ ভাষায় লেখা একটি কাগজে সই করানো হয়, যা পরে সামরিক চুক্তি বলে জানা যায়। এরপর তাদের একটি সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন যুদ্ধ, চিকিৎসা সহায়তা ও ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি প্রতিবাদ করলে এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, ‘তোমার এজেন্ট তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে, আমরা তোমাকে কিনেছি’। রহমান জানান, বাংলাদেশিদের সামনে পাঠিয়ে রুশ সেনারা পেছনে থাকত এবং অনেককে গোলাবর্ষণের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ, আহত উদ্ধার ও মৃতদেহ বহনের কাজ করতে বাধ্য করা হতো।
রহমান বলেন, ‘আমরা কাজ না করলে তারা বলত কেন কাঁদছ, কেন কাজ করছ না, তারপর লাথি মারত’। সাত মাস পর পায়ে আহত হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে পালিয়ে তিনি মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে যান এবং দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
আরেক বাংলাদেশি মোহন মিয়াজি বলেন, রাশিয়ায় একটি গ্যাস কারখানায় ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে সেখানে নেওয়া হয়। পরে এক সেনা নিয়োগকারী তাকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে ড্রোন বা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কাজে থাকবেন। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী দখলকৃত শহর আভদিভকায় সামরিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে কমান্ডার তাকে জানান, তিনি ইতোমধ্যে একটি ব্যাটালিয়নে যোগদানের চুক্তিতে সই করেছেন এবং অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। মিয়াজির ভাষ্য অনুযায়ী, আদেশ অমান্য করলে তাকে হাতকড়া পরিয়ে মারধর ও নির্যাতন করা হতো এবং তাকে রসদ বহন ও মৃতদেহ উদ্ধারের কাজে পাঠানো হয়।
রহমানের ইউনিটে একবার আহত এক রুশ সেনাকে উদ্ধার করতে গেলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তারা আটকা পড়েন। চারদিকে স্থলমাইন থাকার কারণে তিনি এগোতে বা ফিরতে পারেননি। পরে আহত হয়ে হাসপাতালে গেলে সেই সুযোগে তিনি পালান।
লক্ষ্মীপুরের একাধিক পরিবার জানিয়েছে, তাদের স্বজনরা রুশ ব্যবসায়িক ভিসা, সামরিক চুক্তি ও সেনা পরিচয়পত্রের ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন তাদের জোর করে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় পুলিশে অভিযোগ করলেও তারা এখনো স্বজনদের খোঁজ পাননি।
সালমা আখতার বলেন, তার স্বামী আজগর হোসেন শেষবার ২৬ মার্চ যোগাযোগ করে জানিয়েছিলেন তাকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে ‘বিক্রি’ করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে না গেলে তাকে আটক, গুলি বা খাবার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরে আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
মোহাম্মদ সিরাজ জানান, তার ছেলে সাজ্জাদ রাশিয়ায় বাবুর্চির কাজের আশ্বাসে গিয়েছিলেন। সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করা হলে তিনি প্রতিবাদ করেন। পরিবারকে শেষ ফোনে তিনি জানান তাকে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। পরে এক বাংলাদেশির মাধ্যমে জানা যায়, ড্রোন হামলায় সাজ্জাদ নিহত হয়েছেন। এই খবর সহ্য করতে না পেরে তার মা কিছুদিন পর মারা যান।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ব্র্যাক জানায়, অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি এখনো নিখোঁজ, যারা রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটির মাইগ্রেশন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, এতে দুই থেকে তিন স্তরের দালাল চক্র জড়িত।
বাংলাদেশ পুলিশের এক তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে রাশিয়ায় একটি মানবপাচার চক্র কাজ করছে। এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকতে পারেন। পুলিশের নথিতে দেখা যায়, কেউ চকলেট কারখানায় কাজের আশ্বাসে, কেউ অন্য বেসামরিক চাকরির লোভে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
লক্ষ্মীপুরের এক ভুক্তভোগীর স্ত্রী সালমা আখতার বলেন, ‘আমি কোনো টাকা চাই না, আমি শুধু আমার সন্তানের বাবাকে ফিরে চাই’।
সূত্র: এপি





