avertisements 2

দিল্লির ঘোড়া প্রভাবিত করেছিল সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদকে

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২৭ জানুয়ারী,সোমবার,২০২৫ | আপডেট: ০২:১৩ পিএম, ৩ এপ্রিল,বৃহস্পতিবার,২০২৫

Text

২০০৮ সালে দিল্লি সফরকালে মইন ইউ আহমেদকে ঘোড়া হস্তান্তর করেন ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল দীপক কুমার ছবি: এএফপি

২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ছয়দিনের সফরে ভারতের নয়াদিল্লি যান বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। ওই সফরে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রটোকলও দেয়া হয়। সেই সঙ্গে উপহার হিসেবে দেয়া হয় জার্মান হ্যানোভারিয়ান জাতের ছয়টি ঘোড়া। এ সফরে মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং দেশটির সেনাপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বৈঠক হয়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা এবং মইন ইউ আহমেদের চাকরির নিশ্চয়তাসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ‘‌২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে ভারতের সেনাপ্রধান দীপক কুমার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদকে ছয়টি ঘোড়া উপহার দেন। ঘোড়াগুলোর মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় ৩৫ মিলিয়ন রুপির কিছু বেশি। বাংলাদেশের সীমান্তে যেসব ভারতবিরোধী (অ্যান্টি ইন্ডিয়ান) বিচ্ছিন্নতাবাদী রয়েছে, তাদেরকে সহযোগিতা না করার জন্য ভারতের সেনাপ্রধান সন্তুষ্ট হয়ে এসব ঘোড়া উপহার দেন।’

ভারতের দেয়া ঘোড়াগুলো ছিল জার্মান হ্যানোভারিয়ান জাতের। যার মধ্যে দুটি ঘোটক আর চারটি ঘোটকী। সফরের কয়েকদিন আগেই এ ঘোড়া উপহারের বিষয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল নারায়ণ মোহন্তি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘোড়াগুলো উপহার দেয়া হয়।’

এক-এগারোর সময়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামরিক সচিব ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করীম। মইন ইউ আহমেদের ভারত সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে নিজের চাকরি থাকবে কিনা তা নিয়ে ভয় পাচ্ছিলেন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। তাই ওই সফরে চাকরির নিশ্চয়তার বিষয়ে তিনি ভারতের সমর্থন চেয়েছিলেন। বিষয়টি দেখবেন বলে প্রণব মুখার্জি তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তো নির্বাচনই হয়নি, তার আগে তিনি কীভাবে এ কথা বললেন জানি না। এছাড়া আমাদের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য মইন ইউ আহমেদ তাদের সাহায্য চেয়েছিলেন।’

সে সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করীম আরো বলেন, ‘২০০৭-০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের বছরখানেক পরই রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাবাহিনীর থাকা উচিত কিনা এ নিয়ে আমরা ভোটাভুটি করেছিলাম। তখন সেনাবাহিনীর জেনারেলরা মইন ইউ আহমেদকে রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া জেলে থাকা দুই নেত্রীকেও (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন। সেনাপ্রধানের সমর্থনে কোনো জেনারেলই ছিলেন না তখন।’

সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ভারত সফরের কথা ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু সে সময় দেশে জরুরি অবস্থা জারি করায় তার ওই সফর বাতিল হয়ে যায়। এর ঠিক এক বছরের কিছু সময় পর দিল্লি সফরে যান মইন ইউ আহমেদ। যখন দেশের রাজনীতির সময়টা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে এক-এগারোর সময় চাকরিচ্যুত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারীর সঙ্গে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

মইন ইউ আহমেদ ভারত সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। তখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে চাকরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কার কথা প্রণব মুখোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন মইন ইউ আহমেদ। ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ারর্স’ বইয়েও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তিনি লেখেন, ‘২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মইন ইউ আহমেদ ছয়দিনের সফরে ভারতে আসেন। আমার সঙ্গে দেখা করেন। ইনফরমাল সাক্ষাতে রাজনৈতিক বন্দিদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলি। কিন্তু মইন ইউ আহমেদের আশঙ্কা ছিল, শেখ হাসিনাকে ছেড়ে দিলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হতে পারে। এটিকে আমি ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে নেয়ার পাশাপাশি এ নিশ্চয়তা দিই যে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে মইন ইউ আহমেদ চাকরিচ্যুত হবেন না।’

মইন ইউ আহমেদের ভারত সফরে প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় বলে জানা যায়। ভারতের সেই সময়ের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল দীপক কুমার ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল হোমির সঙ্গে তার বৈঠক হয়। দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহায়তায় নতুন যুগের উদয় হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন বাংলাদেশের তৎকালীন এ সেনাপ্রধান। ভারত সফরে দেশটির নৌবাহিনীর সাবেক উপপ্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করেন মইন ইউ আহমেদ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মইন ইউ আহমেদ দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমএম পালাম রাজুর সঙ্গেও বৈঠক করেন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এর বছরখানেক পরই মইন ইউ আহমেদকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানায় নয়াদিল্লি। যেখানে সেনাপ্রধানের একমাত্র সফরসঙ্গী ছিলেন তৎকালীন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী। মইন ইউ আহমেদের এ সফরের পর বাংলাদেশের অনেক নীতি-সিদ্ধান্তই আসে ভারত থেকে, যা ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

উৎস বনিক বার্তা

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2