avertisements 2

দেশে বেড়াতে গিয়ে যেভাবে খুন হন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর,শুক্রবার,২০২৬ | আপডেট: ০২:১৩ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর,শনিবার,২০২৬

Text

২০২৪ সালের ৬ জুন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা পারভীন  তাঁর এক মেয়ে আহাদ নুরকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন। তিনি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার শোল্লা ইউনিয়নের পশ্চিম পাতিলঝাপ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম লেহাজ উদ্দিন। এর প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ২৯ জুন বাংলাদেশে আসেন তাঁর স্বামী আওলাদ। পরদিন তিনি অন্তঃসত্ত্বা রেহানা ও তাঁদের মেয়েকে নিয়ে নবাবগঞ্জের বক্সনগরের ছোট রাজাপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে যান। ৩ জুলাই রেহানা অসুস্থ হয়ে পড়লে আওলাদ তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর থেকেই রেহানার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। রেহানার বাবা লেহাজ উদ্দিনের দাবি, আওলাদ কখনো তাঁদের বলেছেন রেহানা অন্য একজনের সঙ্গে চলে গেছেন, আবার কখনো বলেছেন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেছেন। পরে পরিবারের সঙ্গে আর দেখা না করে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।

স্বাভাবিক মৃত্যুর জাল সনদ দেওয়ার অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজ নিতে শুরু করে। এ সময় ঢাকায় অবস্থিত অস্ট্রেলীয় দূতাবাস রেহানার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁর মা জানান, রেহানা নিখোঁজ। পরে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকেও জানানো হয়। এরই মধ্যে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের দেওয়া রেহানার মৃত্যু সনদ জমা দেন। ওই সনদে রেহানার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে রেহানার পরিবার আওলাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি আবারও দাবি করেন, রেহানা পালিয়ে গেছেন। এরপর পরিবার বিভিন্ন জায়গায় তাঁর সন্ধান শুরু করে।

মাটির নিচ থেকে উদ্ধার রেহানার মরদেহ

২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা আইরিন আক্তার নবাবগঞ্জ থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। মামলায় আওলাদ হোসাইন, তাঁর দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম এবং চাচা আমজাদ হোসেনকে আসামি করা হয়। পুলিশ পাপিয়া আক্তার ও আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় পাপিয়ার বাড়ির সামনের মাটির নিচ থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর অপহরণ মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।

অভিযোগপত্রে হত্যার বর্ণনা

তদন্ত শেষে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তানভীর হাসান খান আদালতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।
অভিযোগপত্রে আসামিরা হলেন রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইন, ননদ পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, আওলাদের চাচাতো ভাই কবির হোসেন এবং চাচা আমজাদ হোসেন।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ জুলাই অসুস্থ রেহানাকে আশুলিয়ায় পাপিয়ার বাড়িতে নিয়ে যান আওলাদ। পরদিন রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওই রাতে কবির হোসেন ও আমজাদ হোসেন রেহানার হাত-পা চেপে ধরেন এবং আওলাদ তাঁর পেটের ওপর উঠে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
পরে মরদেহ পাপিয়ার বাড়ির সামনে একটি সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল। পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি হত্যার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে তদন্তে উঠে এসেছে। রেহানা ও আওলাদ অস্ট্রেলিয়ায় থাকলেও তাঁদের মধ্যে আলাদা থাকার বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। এর আগে রেহানা অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন বলেও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। মামলার আসামি পাপিয়া, কবির ও আমজাদ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পর অস্ট্রেলিয়ায় গ্রেপ্তার

রেহানা হত্যায় আওলাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ পুলিশ। বাংলাদেশের আবেদনের পর আওলাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়।
এরপর অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ তাঁকে একবার গ্রেপ্তার করলেও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। বাংলাদেশ থেকে মামলার বিভিন্ন তথ্য ও নথি সংগ্রহ করে অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যায়।
সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় এবার বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পাঠানোর অভিযোগ

অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুইন্সল্যান্ডের রেডব্যাঙ্ক প্লেইনসের এক বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিহত নারীর পূর্বপরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিপুল অর্থ পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এফপির কমান্ডার স্টিফেন জে বলেন, ওই ব্যক্তি দুই বছর ধরে একাধিক কিস্তিতে ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি অর্থ বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ওই অর্থের কিছু অংশ বাংলাদেশ পুলিশকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকার করেছেন। তবে এসব অর্থ কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে বা বাংলাদেশে চলমান তদন্তে এর মাধ্যমে কোনো প্রভাব পড়েছে, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফেন জে বলেন, রেহানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছে।
আওলাদ বর্তমানে ব্রিসবেনে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাঁকে ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশে রেহানা হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার দোহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শামীম হোসেন।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2