avertisements 2

কানাডায় এস আলমের ভাই কীভাবে মাফিয়াদের টার্গেট

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৪ এপ্রিল,মঙ্গলবার,২০২৬ | আপডেট: ১২:১৮ এএম, ১৫ এপ্রিল, বুধবার,২০২৬

Text

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে কানাডার বিলাসবহুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ছোট ভাই আবদুস সামাদ লাবু। এত সম্পদ গড়েও শান্তিতে নেই তিনি। গেল বছরের মে মাসে মাফিয়াদের টার্গেটে পরিণত হন লাবু। ওই মাসেই তার মন্ট্রিয়ালের বাড়িতে একাধিকবার হানা দেয় মাফিয়ারা। হুমকি দিয়ে চাঁদা না পেয়ে লাবুর বাড়িতে হামলাও চালায় তারা। এ সময় লাবুর বাড়ির সামনে থাকা একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং বাড়িটি লক্ষ্য করে গুলিও করা হয়।

এসব ঘটনার পর কানাডার মন্ট্রিয়াল পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন লাবু, জানান জীবন শঙ্কার কথা। এরপর ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে মন্ট্রিয়াল পুলিশ। সেই তদন্তের এক বছর পর এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পুরো ঘটনা নিয়ে মন্ট্রিয়ালের ফরাসি ভাষার পত্রিকা ‘লা প্রেস’ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি ফের সামনে আসে। আর সেই সূত্র ধরে ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছে এশিয়া পোস্ট।

ঘটনার সূত্রপাত
 ২০২৫ সালের ২৬ মে আব্দুস সামাদ লাবুর বাসায় হানা দেয় একদল দুর্বৃত্ত। পরবর্তী সময়ে জানা যায় তারা মাফিয়া দলের সদস্য। যে বাড়িটিতে এই ঘটনা, ছয় বেডরুম ও তিন গ্যারেজের বিলাসবহুল সেই বাড়িটির অবস্থান কুইবেক প্রদেশের অভিজাত এলাকা বিকনসফিল্ডের ৮ অ্যাভিনিউ ক্যারিয়ার্সে।

ওই বাসায় গিয়ে মাফিয়া দলের সদস্যরা লাবু ও তার পরিবারকে তৃতীয় কোনো একটি পক্ষের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু লাবু ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, কারও কাছে তাদের কোনো ঋণ নেই। এরপরও অর্থ পরিশোধের জন্য তাদের হুমকি ও হয়রানি শুরু করে মাফিয়ারা। একপর্যায়ে তারা আব্দুস সামাদ লাবুর বাসার সামনে পার্ক করা একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়িটি লক্ষ্য করে গুলিও করে।

এ নিয়ে মন্ট্রিয়াল পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন লাবু, জানান জীবন শঙ্কার কথা। এরপর ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে মন্ট্রিয়াল পুলিশ। সেই তদন্তের এক বছর পর এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। আর এরপরই জানা যায়, এরা কোনো সাধারণ চাঁদাবাজ নয় এবং ভুক্তভোগী আবদুস সামাদ লাবুও কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন।

লাবু কীভাবে মাফিয়াদের টার্গেট

বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলে আব্দুস সামাদ লাবু বেশ পরিচিত নাম। তিনি এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। বড়ভাই এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলমের মতো লাবুর বিরুদ্ধেও রয়েছে ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের অভিযোগ।

এস আলম গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তেও আব্দুস সামাদ লাবুর নাম এসেছে। দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, লাবু ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও জাল কাগজের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে সেই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন, যার একটি বড় অংশ তিনি বিনিয়োগ করেছেন কানাডায়।

কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি অবৈধ অর্থের গন্তব্য হিসেবে সমালোচিত। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাতে নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এস আলম পরিবার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচার করা অর্থে সম্পদের পাহাড় গড়েছে কানাডায়।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, কানাডায় আসার পর ২০১৪ সাল থেকে সেখানকার রিয়েল এস্টেট খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে শুরু করেন আব্দুস সামাদ লাবু। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রুনা করপোরেশন’ নামে কানাডার একটি আবাসন খাতের কোম্পানিতে অংশীদার হিসেবে আছেন লাবু ও তার দুই ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরী এবং তৌফিকুল আলম চৌধুরী।

 লাবুর ছেলে আতিকুল বিয়ে করেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মেয়ে জেবা জামানকে। সাইফুজ্জান চৌধুরীর বিরুদ্ধেও দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি বিদেশে পলাতক রয়েছেন।

অবশ্য কেবল ছেলের বিয়ের সূত্রে নয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে অন্য সূত্রেও আত্মীয়তার যোগ রয়েছে আব্দুস সামাদ লাবুর। সাইফুজ্জামানের বাবা আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একসময়ের প্রভাবশালী নেতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু সম্পর্কে লাবুর মামা। অর্থাৎ সাইফুজ্জামান চৌধুরী আব্দুস সামাদ লাবুর মামাতো ভাই।

লাবু কীভাবে মাফিয়াদের টার্গেটে পরিণত হলেন তা নিয়ে এশিয়া পোস্টের কথা হয় ‘লা প্রেসের’ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভিনসেন্ট লারুশ এবং ড্যানিয়েল রেনোর সঙ্গে। লাবুর বাড়িতে মাফিয়াদের হামলার বিষয়ে তারা এক বছর ধরে অনুসন্ধান করেছেন। তারা এশিয়া পোস্টকে জানান, মাফিয়া দলের সদস্যরা আব্দুস সামাদ লাবুকে এলোমেলোভাবে টার্গেট করেনি। অপরাধচক্রের কুখ্যাত ব্যক্তিরা যেভাবে সরাসরি বাড়িতে গিয়ে টাকা দাবি করেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ তৈরি করেছে, তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এভাবে তারা সাধারণত হঠাৎ কারও বাড়িতে যায় না। ফলে এই ঘটনাটিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন চাঁদাবাজির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই দুই সাংবাদিক কানাডায় আব্দুস সামাদ লাবুর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের বিষয়েও খোঁজখবর নিয়েছেন। তারা জানান, শুধু লংগুইল, মন্ট্রিয়াল নর্থ এবং রোজমঁ এলাকায় আবাসন ব্যবসায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে লাবুর। এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানান তারা।

বীকনসফিল্ডের যে বিলাসবহুল বাড়িতে আব্দুস সামাদ লাবুর পরিবার মাফিয়াদের হামলার শিকার হয়; সেটির মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তবে হামলার পর থেকে লাবু পরিবার এখন আর সেই বাড়িতে থাকছে না। ছয় বেডরুম, তিন গ্যারেজ এবং বিশাল আঙিনাসহ ওই বাড়িটি এখন ভাড়া দেওয়া আছে।

 

এদিকে, এ ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে সাংবাদিক ভিনসেন্ট এবং রেনো তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি গোপন সূত্র থেকে জানতে পেরেছেন, আব্দুস সামাদ লাবুর বাড়িতে গিয়ে টাকা দাবি করার সময় মাফিয়ারা বাংলাদেশেও ফোন করেছিল। তবে কার ফোনে কী কারণে সেই কল করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু তারা জানতে পারেননি।

কানাডার স্থানীয় সূত্র বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের গত কয়েক বছরে কানাডায় বিলাসবহুল সম্পদ অর্জনের খবর আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে। তবে অন্য কারও এভাবে মাফিয়াদের খপ্পরে পড়ার খবর পাওয়া যায়নি। একদিকে বাংলাদেশ সরকার পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে একই অর্থে নজর দিয়েছে মন্ট্রিয়ালের মাফিয়ারা।

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements 2