নিকোলাস মাদুরোর পরিণতি কী সাদ্দাম-নরিয়েগার মতোই হচ্ছে?
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ৪ জানুয়ারী,রবিবার,২০২৬ | আপডেট: ০৮:৫৫ পিএম, ২৫ জানুয়ারী,রবিবার,২০২৬
নিকোলাস মাদুরো, সাদ্দাম হোসেন ও ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ছবি: সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ শনিবার রাতে দেশটির সেনাঘাঁটি, বিমানবন্দর, তেল খনিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হয়। পরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মাদুরোর আগে পানামার সাবেক সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক হন। নিকোলাস মাদুরোর পরিণতি কি তাদের মতোই হচ্ছে?
কী হয়েছিল ম্যানুয়েল নরিয়েগার
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পানামায় ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। দেশটির সামরিক একনায়ক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অভিযান শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন নরিয়েগার বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক চর্চা, দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আনে। পানামায় আক্রমণের আগে ১৯৮৮ সালে মায়ামিতে নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে আনে যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর বিরুদ্ধেও ঠিক এমন একটি অভিযোগ এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৯৮৫ সালে পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস আরডিটো বারলেটাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন নরিয়েগা। এর চার বছর পর অর্থাৎ, ১৯৮৯ সালে নির্বাচন বাতিল করেন নরিয়েগা। পরে তিনি দেশে মার্কিনবিরোধী মনোভাবকে সমর্থন করেন।
১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এটি ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচডব্লিউ বুশ এই অভিযানের জন্য বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেন। মাদক পাচারের অভিযোগে নোরিগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যদিয়ে পানামার মানুষের ভাগ্যের উন্নতি করার প্রতিশ্রুত দিয়েছিলেন জর্জ এইচডব্লিউ বুশ। কিন্তু শেষপর্যন্ত এর কিছুই হয়নি।
জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগা যখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় অংশ নিতে অস্বীকার করেন, তখন ওয়াশিংটন তাকে 'অবাঞ্ছিত ব্যক্তি' ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তার বিচার হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত মায়ামির একটি কারাগারে রাখা হয় নরিয়েগাকে। পরে তাকে আরেকটি বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এক বছর পর ফ্রান্স তাকে ফেরত পাঠায়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারে নরিয়েগা মারা যান।
সাদ্দাম হোসেনের পরিণতি যা হয়
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগদাদের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইরাকে হামলা করে। দীর্ঘ নয় মাস পর ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী হন। সাদ্দামের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো- গণবিধ্বংসী অস্ত্র, আল-কায়েদাকে আশ্রয় ও সহায়তা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের শর্ত লঙ্ঘন।
১৯৮০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ৯/১১ টুইন টাওয়ারে হামলায় অভিযুক্ত আল কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন।
যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরাকে গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র পায়নি। সাদ্দামকে তার নিজ শহর তিকরিতের কাছে গর্তে লুকানো অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আটক করে। পরে ইরাকি আদালতে সাদ্দাম হোসেনের বিচার হয়। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেসের যা হয়
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনাটি প্রমাণ করে, তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যা বলছিল, তা ছিল এক ধরনের ভণ্ডামি। আল জাজিরা বলছে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন এজেন্ট ও হন্ডুরাস বাহিনীর অভিযানে টেগুসিগাল্পার বাড়ি থেকে হার্নান্দেজকে আটক করা হয়। এর কয়েকদিন আগে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তাকে দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। একই বছরের জুনে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কয়েকদিন পর হন্ডুরাসের শীর্ষ কৌঁসুলি হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয়।
মাদুরোর কী হবে
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ শনিবার দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কথা জানায় দেশটির সরকার। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলায় বড় আকারের হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ- তিনি মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদুরোকে ‘পদচ্যুত নেতা’ উল্লেখ করে সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেছেন, ‘নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিসট্রিক্টে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়েছে।’
মাদুরোকে আটক করে কারা
সিবিএসকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স আটক করেছে। ডেল্টা ফোর্স মার্কিন সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসদমন ইউনিট। পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করা হয়েছে। তাকে আটকে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনাদের প্রতিরক্ষায় বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
ট্রাম্পের চক্ষুশূল নিকোলাস মাদুরো
বামপন্থি নেতা হুগো শ্যাভেজের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন নিকোলাস মাদুরো। একসময় তিনি বাস চালাতেন, ছিলেন শ্রমিক নেতা। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন। পরে ভেনেজুয়েলার বামপন্থি রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার (পিএসভিইউ) প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেন।
একপর্যায়ে মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেন যুক্তরাষ্ট্রের। বন্ধু হওয়ার পরিবর্তে শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে দুই দেশ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চক্ষুশূল হয়ে উঠেন নিকোলাস মাদুরো।
প্রেসিডেন্ট মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচক এবং বারবার অভিযোগ করে আসছেন, ওয়াশিংটন তার সরকারকে অস্থিতিশীল করতে অভ্যুত্থানচেষ্টা, অর্থনৈতিক নাশকতা ও নিষেধাজ্ঞার পেছনে রয়েছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলো মাদুরোর বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
২০১৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মাদুরো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে- পরের বছর অর্থাৎ, ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার আইন পরিষদ সংবিধান পরিবর্তন করে এবং মাদুরো ক্ষমতা দখল করেন। ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৫০টির বেশি দেশ নিকোলাস মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মানতে নারাজ।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা কারাগারে মারা গেছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। হন্ডুরাসের জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে ক্ষমা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা কোনদিকে যায়- এখন সেটাই দেখার।
আরও পড়ুন
এই বিভাগের আরো খবর
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যোগ দিচ্ছেন গণহত্যা চালানো যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু!
ট্রাম্পের অবস্থান বদলে প্রতারিত বোধ করছেন ইরানের বিক্ষোভকারীরা
ট্রাম্পের হুমকি উপেক্ষা করে ইরানে বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি
বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি না দিতে ইরানকে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি





