avertisements

করোনাজয়ীদের গল্প

এস এম মুকুল
প্রকাশ: ০৯:২৫ পিএম, ৯ অক্টোবর,শুক্রবার,২০২০ | আপডেট: ০৯:৪৮ এএম, ৩১ অক্টোবর,শনিবার,২০২০

Text

আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। জর্ব, সর্দি, কাশি, পাতলা পায়খানা, শরীর ব্যথা, স্বাদ বা গন্ধ না পাওয়া যাই হোক না কেন, ভয় এখন করোনা নিয়ে। করোনা হচ্ছে, হবেই হয়তোবা। অথবা অনেকের করোনা হয়ে সেরেও গেছে, নিজেরা টের পায়নি। করোনা নিয়ে সারা পৃথিবীতে এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। মানুষের জীবনের স্বস্তি যেন কেড়ে নিয়েছে করোনা। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে নড়বড়ে করে দিয়েছে করোনাভাইরাসের আক্রমণ।

করোনার সংক্রমণ কমছে, বাড়ছে। অনেক মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে করোনা। তবে আশঙ্কার তুলনায় সংক্রমণের হার দেশে অনেকটাই কম।

প্রত্যাশিত না হলেও মৃত্যু হারও খুব বেশি নয়। তার চেয়েও বড় কথা করোনা আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে ওঠার হারও বাংলাদেশে খুবই আশাব্যঞ্জক। শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো ধরনের বিশেষ সমস্যা ছাড়া করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা বাড়িতেই সম্ভব। বলা হচ্ছে ৮০ ভাগ করোনাক্রান্ত ব্যক্তিই বাড়িতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছেন। যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে কিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের কাহিনি নিয়েই আমাদের এই আয়োজন- ‘করোনাজয়ীদের গল্প’।

আমাদের বিশ্বাস করোনাজয়ীদের গল্প থেকে সবাই করণীয় সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। করোনাজয়ীদের অভিজ্ঞতাগুলো যদি কারো উপকারে আসে তবেই আমাদের আয়োজনটি সার্থক হবে। করোনাকে ভয় নয়, জয় করুন।

কুসুম গরম জলে গোসল করেছি নিত্যদিন : করোনার সেই ভয় প্রথম বাসা বেঁধেছিও মনে। তারপর যমদূত হয়ে এলো নিজের শরীরে ‘পজিটিভ’ নমুনার বিসংবাদ জানান দিয়েই। তখনো ততটা আতঙ্কগ্রস্তও হয়নি। মনের জোরের কারণেও হয়তোবা ঠিক ছিলাম।

অধিকন্তু সাহস জুগিয়েছে আমায় ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব প্রায় সকলেই। শুরুতেই যথারীতি নিজের ব্যবহারিক থালা-বাসন ও শয্যার বিছানাটিও করে নিয়েছিলাম আলাদা করে। যাতে করে বাসায় অন্যরা আক্রান্ত না হয়। ভয় ছিল কিছুটা হয়তোবা,  বেশি বয়স ও চলমান ডায়াবেটিস রোগের কারণেও। নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাও করেছি। ওটা যাতে শরীরটাকে আমার কোনোভাবেই রোগ প্রতিরোধে কাবুও না করে ফেলে। নিয়মিত অন্তত দিনে তিনবার আদা ও লেবুর চা পানসহ সকালে সর্বরোগের মহৌষধ কালোজিরা ও পরিমিত মধু পান করেছি।

তাছাড়া মেন্থল দিয়ে গরম জলের ভাপ নেওয়া, সকালের নরম রোদে বারান্দায় বসে কিছুক্ষণ ভিটামিন ডি আহরণ করাসহ হালকা ব্যায়ামও করেছি প্রায় প্রত্যহই। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও কুসুম গরম জলে গোসল করেছি নিত্যদিন। টিভি দেখা, গান শোনা, হাসিখুাশ থাকার চেষ্টারও কমতি ছিল না। চাকরি হারানোর ভয়ও তাড়া করেছে চলমান দুঃসময়ে। শত মানুষের চোখেমুখে দেখেছি হতাশার এক নির্বাক অনিশ্চয়তার মৌনতা। লেখালেখি করেছি ফেসবুকে। অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে করোনামুক্ত হতে পেরেছি বলে মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ শুকরিয়া। করোনা হলেও মানুষ হয়তো মারা যাবে না। তবে সচেতন থাকলে, সচেষ্ট থাকলে কম সময়ে সুস্থ হয়ে ঠো সম্ভব।

শহীদুল হক বাদল, লেখক

করোনা আমাকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখিয়েছে : অবশেষে এই ভয়ংকর রোগটি আপাতদৃষ্টিতে আমার থেকে তেমন কিছু নিতে পারেনি। সিম্পল ভোগান্তিটাও দিয়ে গেছে।

আরও একটি উপলব্ধি হলো, একটা মানুষ আদতে কতটা অসহায় এবং  একা তা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে যায় কোভিড-১৯ ভাইরাস। মে, ২০২০-এর প্রথম সপ্তাহে আমি করোনায় আক্রান্ত হই। প্রথমে বিষয়টা ধারষাপ্রসূত থাকলেও মে’র ১২/১৩ তারিখ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়েছিলাম যে আমি আমি কোভিড আক্রান্ত। মে মাসের প্রথম সপ্তাহটা আমার আন্দাজে আন্দাজে কেটে যায়। হালকা ;ুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘুম যদি কোনো রোগের লক্ষণ হয় তাহলে সেই রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে রোগীর কী দোষ সেটা হিসাব করার ফুরসত কার থাকে। দ্বিতীয় সপ্তাহে দুদিন জ্বর এসে কেটে গেল। কোনো কোনো দিন সামান্য কাশি। শুধু বদভ্যাসবশত সিগারেটে ফুঁ দিলে শ্বাসকষ্টের আলামত পেতাম, যা আবার ২০/২৫ মিনিট ব্রিদিং এক্সারসাইজ করার পর কেটে যেত। মে’র দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে রীতিমতো যুদ্ধ করে যখন করোনা পরীক্ষার ফলাফল দেখে জানলাম যে আমি করোনা আক্রান্ত তখন গিয়ে ঘরে বসলাম।

আমি প্রায়ই বলি, আমি পেটের দায়ে করোনায় আক্রান্ত। কারণ করোনা শুরুর পর থেকে আমার ঘরে বসে থাকার কোনো জো ছিল না। আমাকে দৈনিক উপার্জন করতে হয়। একদিন উপার্জন বন্ধ থাকলে আমার জীবনযাত্রা পরিবার সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলে। আমার মতো খেটে খাওয়া সাংবাদিক ও খণ্ডকালীন ব্যবসায়ীর চাইলেও নিজেকে লকডাউনের জ্বালে বেঁধে রাখতে পারেনি।

সপ্তাহখানেক ভোগার পর যে দিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম করোনার টেস্টটা করিয়েই ফেলব, সেদিন কুর্মিটোলা, বিএসএমএমইউসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে এবং  খোঁজখবর নিয়ে বুঝতে পারলাম যে করোনা পরীক্ষা সহজে হবে না। তখন আমাদের সাংবাদিককুলে প্রথম করোনা আক্রান্ত এটিএন নিউজের আশিকুর রহমান অপুর কাছ থেকে পেলাম রিজেন্টা হাসপাতালের পিআরও-এর নাম্বার। কেতাদুরস্ত সে পিআরও কয়েক ঘণ্টার মাঝে কিছু সম্মানির বিনিময়ে আমার সেম্পল বাসা থেকে কালেকশন করালেন। ফোনের পর ফোন করেও রিজেন্টা হাসপাতালের করোনা টেস্টের ফলাফল জানতে পারছিলাম না। যখন জানতে পারি ততদিনে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির তত্ত্বাবধানে করা করোনা টেস্টের ফলাফল আমার হাতে আরও তিন দিন আগের।

করোনা পরীক্ষার ফলাফল জানার আগে থেকেই চিকিৎসক বন্ধু ও সচেতন অন্য কিছু মানুষের পরামর্শ নিয়ে অ্যালোপেথিক চিকিৎসা শুরু করেছিলাম। বিএসএমএমইউ-এর চিকিৎসক নাহিদ আপা, বারডেমের সাকলাইন রাসেল, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ডাক্তার তুষারকে দিনরাত যে কোনো সময় ফোনে এবং মেসেঞ্জারে পেয়েছি। এক মুহূর্তের জন্যও তারা বিরক্ত হননি। করোনার সাথে যুদ্ধ করা এনটিভির হাসান মাহমুদ এবং এটিএন নিউজের আশিকুর রহমান অপু সারাক্ষণ আমাকে সাহস জুগিয়েছে ও পরামর্শ দিয়েছে।

করোনাকালে নানান জার্নাল, রিপোর্ট এবং বন্ধুদের আলোচনা থেকে আমার হোমিও চিকিৎসার পের একটা আস্থা তৈরি হয়। আমি আমার নিজন্ব ইউটিউব চ্যানেলে ইস্কন মন্দিরে ৩৬ জন করোনা আক্রান্তের ওপর রিপোর্ট করতে গিয়েছিলাম। সেখানে জেনেছিলাম, ৩৬ জনই করোনা মুক্তির জন্য হোমিও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেছিলেন। এটিও আমার হোমিও ভক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি চলে আমার হোমিও চিকিৎসা।

যাই হোক, সবাই একটা কথা বলেন। কোভিড নাকি যার যার শরীরের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। আমি সব সময় একটা বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। সেই বিশ্বাসের বিষয়টি সবাইকে বলে বেড়াই। আমি একাধারে গত প্রায় এক যুগ আমার শরীরের ওপর যে অনিয়ম অবহেলা খামখেয়ালিপনা করেছি তা আমার আশপাশ দেখলে আর পাই না। তবে এটাও ঠিক, এমন কিছু অভ্যাস ধরে রেখিছিলাম যা  কি না আমার আশপাশে বিরল। আমার বয়স এখন প্রায় ৪৭। গত ২০ বছর প্রায় প্রতিদিন রাতে ভিজিয়ে রেখে ভোরে ত্রিফলার (আমলকী হরতকী অর্জুন বহেরা) পানি, আদা লেবু পানি, থানকুনি পাতা, তুলসী পাতা, করলার রস, মধু, কালোজিরা, মাসরুম, দেশীয় সিজনাল ফলসহ অনেক ভেষজ ও ঔষধি লতাপাতা ছিল আমার জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী। এগুলো করোনার বিরুদ্ধে আমাকে যুদ্ধ জয়ে সহায়তা করেছে কি না আমি জানি না।

আতিকুর রহমান পূর্ণিয়া, সাংবাদিক

‘বাবা, আমার ১০ দিনের ডিউটি আছে’ : করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর পরিবার-পরিজন ছেড়ে থেকেছেন হাসপাতালে। মনে সাহস রেখে ১৮ দিনের মাথায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। তিনি বলেন, দেশের এই সংকটকালে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখন শরীরে করোনাভাইরাস আক্রমণ করে তা টের পাইনি। দায়িত্ব পালনের সময় পিপিই, চশমা, হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সব ব্যবহার করেছি। এদিকে অফিস থেকে দেওয়া হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথি ঔষধ নিয়মিত খেয়েছি। কিন্তু ঠিকই করোনায় আক্রান্ত হই। ২৫ জুন রাত ২টার দিকে শরীরে জ্বর আসে। সাথে সাথে আমি স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে যে ঘরে ছিলাম তা ত্যাগ করে আলাদা ঘরে চলে যাই। এই দিনই অসুস্থতার কথা আমার কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন।

২৭ জুন সকাল ১০টা রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিই। পরের দিন বিকেলে হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানায় আমার করোনা পজিটিভ। সংবাদ পাওয়ার পর আমি ‍কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকি। আমি কি বাসায় থাকব না কি হাসপাতালে ভর্তি হব তা জানতে চায় কর্তৃপক্ষ। এদিকে আমি স্ত্রী ও ছেলের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করার কথা কর্তৃপক্ষকে জানালে ২৯ জুন সকাল ১০টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নমুনা দিই। আমি করোনা আক্রান্ত হয়েও স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে একই সিএনজিতে রাজারবাগ যাই এবং নমুনা দিয়ে ওই সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরি। ৩০ জুন সংবাদ পাই, ওরা দুজন করোনা নেগেটিভ। সঙ্গে সঙ্গে আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

১ জুলাই আমার জ্বর, শরীর ব্যথা, গলায় ব্যথা বেশি শুরু হয়। কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা হাসপাতালে ভর্তির জন্য আমার বাসায় একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। প্রয়োজনী জিনিস নিয়ে রওনা দেওয়ার আগে ছেলেকে বলি, ‘বাবা, আমার ১০ দিনের ডিউটি আছে। আমি ১০ দিন হাসপাতালে থাকব।’ ছেলে বলে, ‘বাবা তুমি ডিউটি করলে হাসপাতালে কেন, ওইখানে তো রোগীরা থাকে?’

আমি বলি, ‘এবার আমাকে হাসপাতালে ডিউটি করতে হবে।’ জীবনে প্রথম রোগী হয়ে অ্যাম্বুলেন্স উঠি। পেছনে ফেলে যাচ্ছি স্ত্রী আর সন্তানকে। মনে ভয়ভীতি কাজ করছে। ডেমরা থেকে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার দিয়ে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগ খুব একটা সময় লাগে না। কিন্তু সময়টা বিশাল মনে হচ্ছিল। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছানো মাত্র আমাকে তেজগাঁও ইমপালস হাসপাতালে পাঠানো হয়। ইমপালস হাসপাতালে সাথে সাথে আমাকে দুপুরে খাবার দেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালে ১৪ তলায় ১৪১৩ কেবিন থাকতে দেওয়া হলো। আমাকে দেওয়া ওষুধগুলো নিয়মিত সেবন করেছি।

ওইখানে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, ইউরিন টেস্ট, এক্সরে, ইসিজি করে যেন সবার রিপোর্ট ভালো আসে। এছাড়া সকালে ফজরের নামাজের পরই গরম পানিতে লবণ দিয়ে গার্গল। এটা দিনে ৪/৫ বার চলত। পানিতে লং, এলাচ, গোলমরিচ, দারুচিনি, তেজপাতা ও আদা দিয়ে গরম করে ধোঁয়া নিতাম ৪/৫ বার। কখনো এই মসলা মিশ্রণ গরম পানি লেবু দিয়ে খেতাম। মাঝে মাঝে গ্রিন টি খেতাম। লেবু, মাল্টা, লটকন, আম, আপেল, আমলকী খেয়েছি নিয়মিত। স্বাভাবিক ভাত, মাছ ঠিম, দুধ, ডাল খেয়েছি। যখনি মনে হয়েছে কিছু না কিছু মুখে দিয়েছি। মহান আল্লাহর রহমতে হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের আন্তরিকতায় ভালো ছিলাম।

৬ জুলাই হঠাৎ করে ইমপালস হাসপাতালে থেকে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল আনা হয়। এখানেও ওই ওষুধের সঙ্গে গরম পানি চলছিল। আক্রান্ত হওয়ার ১১তম দিন থেকে আস্তে আস্তে খাবারের গন্ধ পেতে শুরু করি। ১৩ জুলাই সকালে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিই। সন্ধ্যার দিকে নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। রাতেই ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরি।

আনোয়ারুল, এএসআই,
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার সহকারী উপপরিদর্শক

আত্মবিশ্বাস থাকলে ঘরে থেকেও করোনা মুক্তি পাওয়া সম্ভব : উপসর্গ না থাকলেও গত ১১ মে উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে স্বপ্রণোদিত হয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা দেন জাহাঙ্গীর হোসেন। ১৪ মে পাওয়া রিপোর্টে জানতে পারেন তিনি করোনা পজিটিভ। কোনো হাসপাতালে যাননি তিনি। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে বাসায় আইসোলেশনে থেকে ২৩ ও ২৯ মে পরপর দুটি নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় তিনি করোনামুক্ত হয়ে পুরোপুরি সুস্থ। আত্মবিশ্বাস থাকলে ঘরে থেকেও করোনা মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, আমি একজন গণমাধ্যমকর্মী। ভাইরাসটি কীভাবে আমার শরীরে সংক্রমিত হলো তা আমি বলতে পারব না। আমার শরীরে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা দেয়নি। তবে হালকা গলা ব্যথা ছিল।

আমি সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা রেখেছি। ভয় পেলে মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি হলে ভাইরাস আমার সাথে পেরে যাবে। সেই কথা আমি আগেই জানতাম। সেজন্য আমি সব সময় মনোবল শক্ত রেখেছি। আমি গত ২৫ দিন ঘরে থেকে করোনা যুদ্ধ করেছি। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চলেছি। চিকিৎসা নিয়েছি। আমার স্ত্রী ২৪ ঘণ্টা আমার পাশে থেকে আমার সেবা করেছেন।

করোনাকালীন হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করেছি। প্রচুর গরম পানি পান করেছি। আর প্রতিদিন গরম পানির ভাপ নিয়েছি কয়েকবার। গরম পানি পান করায় গলায় সামান্য ব্যথা থাকায় কিছুটা শান্তিও পেয়েছি। মালটার জুস আর লেবুর শরবত খাওয়া হয়েছে অনেক বেশি। আদা, এলাচ, হলুদ, আর দারুচিনি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে ভাপ নিয়েছি পরে চা হিসেবে খেয়েছি। সকালের রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সকাল-বিকেল হালকা ব্যায়াম করেছি। নিয়মিত নামাজের অভ্যাস তো রয়েছেই।

করোনায় কেউ আক্রান্ত হলে আশপাশের মানুষ সেটা ভালোভাবে নেয় না। এটা ঠিক নয়। গ্রামবাসী থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, সহকর্মী সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদসহ দেশ বিদেশে অবস্থানকারী আত্মীয়স্বজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়ত খোঁজ খবর রেখে সাহস জুগিয়েছেন। ওই সময়ে যা তার মনোবল ধরে রাখতে কাজে দিয়েছে। মনোবল হারাবেন না। করোনায় আক্রান্ত হলেই মৃত্যু, বিষয়টি এমন নয়।

জাহাঙ্গীর হোসেন
মির্জাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সাংবাদিক

করোনা রোগীর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো গরম পানি পান : করোনাভাইরাস বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন নরসিংদী সদর উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সবুজ হাওলাদার। তিনি বলেছেন, করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

ফেসবুকে নিজের ওয়ালে তিনি লিখেছেন, আমি নরসিংদী সদর উপজেলায় উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছি। উপজেলার করোনা-১৯ প্রতিরোধ কমিটি এবং করোনা কুইক রেসপন্স কমিটির একজন সদস্যও আমি। এছাড়া উপজেলার ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলাম।

গত ১২ এপ্রিল আমরা কয়েকজন অফিসার করোনা টেস্টের জন্য স্যাম্পল সিভিল সার্জন অফিসে জমা দেই। আমরা যেহেতু উপজেলার বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত ছিলাম, সেহেতু ইচ্ছা করেই টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিয়েছিলাম। পরদিন আমার টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ আসে।

শুনে চমকে উঠলাম, আমার শরীরে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কোনো লক্ষণ ছিল না। কর্তৃপক্ষ বলল আমাকে হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকতে হবে। আইসোলেশন ওয়ার্ডে চলে গেলাম। করোনা পজিটিভ আসার পর আমার মধ্যে কোনো ভয়ের উদ্রেক  হয়নি। নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছি এবং ৭ম দিনে ২য় টেস্টে নেগেটিভ আসে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩য় টেস্ট করানো হয় এবং নেগেটিভ আসে।

যেসব নিয়মকানুন মেনে আমার করোনা নেগেটিভ হয়েছে : প্রতি এক ঘণ্টা পর পর গরম পানি পান করেছি। লাল চা (লবঙ্গ, আদা, দারুচিনি, গোলমরিচ) পান করেছি দিনে চার থেকে পাঁচ বার। গরম পানির স্টিম (ভাপ) দিনে তিনবার নিয়েছি। লেবু চা খেয়েছি।  কুসুম গরম পানি দিয়ে গলা খাঁকারি করেছি। যথাসম্ভব কমলা, মাল্টা, আপেল প্রভৃতি খেয়েছি। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডাল প্রভৃতি খেয়েছি। প্রতিদিন সকালে ও বিকালে কালোজিরা ও মধু খেয়েছি। সুষম খাবার খেয়েছি, যেমন সবজি, মাছ, মাংস প্রভৃতি। প্রতিদিন দুপুরে এক গ্লাস দুধ খেয়েছি।

আমার মনে হয় বাস্তব পরিস্থিতি মানুষের জানার প্রয়োজন রয়েছে। করোনা রোগীর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো গরম পানি পান, ফুটন্ত গরম পানির ভাপ নেওয়া ও চা পান করা।

সবুজ হাওলাদার
পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা

নরসিংদী সদর উপজেলা : মানসিকভাবে শক্ত থেকে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে : ‘করোনায় আক্রান্ত হলে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আবার অনেকে মৃত্যুর চিন্তা করেন। ফেসবুকে সময় দিয়ে করোনার বিষয়ে নেতিবাচক খবর পড়েন ও শোনেন। আমি ১২-১৩ দিন ফেসবুক চালাইনি। এগুলো থেকে দূরে থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শ শুনেছি। আর মানসিকভাবে শক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ।’ কথাগুলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাজয়ী শিক্ষার্থী সাবরিনা আশার (২৩)।

তার পরামর্শ, করোনা কোনো জটিল রোগ নয়, এটা শারীরিকভাবে যতটা না কাবু করতে পারে, তার চেয়ে পারিপার্শ্বিকতা মানসিকভাবে বেশি ভেঙে দিতে পারে। তাই মানসিকভাবে শক্ত থেকে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।

৭ মে ঢাকার ইব্রাহিমপুর এলাকায় বাসায় অবস্থানকালে করোনার উপসর্গ প্রথম আন্দাজ করেন। এর আগে ২ মে থেকে তার বাবার করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। ৯ মে তার বাবার করোনা শনাক্ত হয় আর তার শনাক্ত হয় ১১ মে। পরিবারের চার সদস্য একই জায়গায় থাকা সত্ত্বেও সাবরিনার বড় ভাই ও মায়ের একাধিকবার পরীক্ষা করা হলেও ফল নেগেটিভ আসে। ১১ মে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হন সাবরিনা। ২০ ও ২১ মে পরীক্ষায় তার করোনা নেগেটিভ আসায় তাকে হাসপাতাল থেকে করোনামুক্ত ঘোষণা করে বাসায় পাঠানো হয়।

সাবরিনা বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই একটু দুর্বল চিত্তের। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর খুব ভয় হয়। পরে তিনি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে শক্ত হতে থাকেন। আর নেতিবাচক চিন্তা ও খবর পড়া থেকে দূরে সরে যান। তার বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠীরা এ সময় তাকে প্রচুর সাহস জুগিয়েছেন। করোনার চিকিৎসা নিয়ে সাবরিনা বলেন, খুব সাবধানে থেকে বিশ্রাম নিতে হয়। ভিটামিন ‘সি’যুক্ত খাবার খেতে হয়। আর তার কাশি থাকায় এক ঘণ্টা পরপর গরম পানি দিয়ে গড়গড়া দিতেন। আর চিকিৎসকরা নিয়মমতো কিছু ওষুধ দিতেন আর দুবার তাকে ইনজেকশন দিয়েছেন।

সাবরিনা আশা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : এক পরিবারের চার সদস্যের করোনা জয় : শরীয়তপুরে প্রথম করোনা রোগে আক্রান্ত হন সদর উপজেলার চিতলিয়া ইউনিয়নের টুমচর গ্রামের গৃহবধূ টুম্পা মাঝি (২৪)। এরপর গত ১৩ এপ্রিল তার বাবা নরেন কীর্তনীয়া (৫০) ও মা শেফালি রানীর (৪৫) শরীরেও করোনা শনাক্ত হয়। এর এক সপ্তাহ পর টুম্পার ভাশুরের ছেলে সাড়ে ছয় বছরের আনিক মাঝির শরীরেও করোনা ধরা পড়ে। হাসপাতালের চিকিৎসা ছাড়াই এক মাস ঘরে থেকে ওই পরিবারের চার সদস্যের করোনা রোগ সেরেছে।

টুম্পা মাঝি বলেন, ‘আমাদের কোনো অসুস্থতা বোধ ছিল না। পরিবারের চার সদস্যই সুস্থ ছিলাম। নিয়মিত গরম চা, দুধ ও লেবুর শরবত খেয়েছি। কাউকে কোনো ওষুধ খেতে হয়নি। আমার দুধের শিশুটার জন্য দুশ্চিন্তা হতো। এই এক মাস করোনা নিয়েই তাকে সামলেছি। খাবার খাইয়েছি, কাছে রেখেছি। ’

যাদের হাঁপানি আছে তাদের জন্য এই ভাইরাস ঝুঁকিপূর্ণ : আক্রান্ত হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে- এমন নয়। বাসায় থেকেই দৃঢ় মনোবল, সঠিক পরিচর্যা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই করোনাকে জয় করা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকতে পারলে এ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আক্রান্ত ব্যক্তিকে একটি রুমে রাখতে হবে। দূরত্ব বজায় রেখে সেবা করতে হবে। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায় এমন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। যেমন ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, জিং ও অন্যান্য খনিজ পদার্থসমৃদ্ধ খাবার।

এর মধ্যে আমড়া, পেয়ারা, লেবু, কমলা, মাল্টা, আপেল এবং দেশি মৌসুমি ফল। আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রতিদিন একাধিক ডিম খেতে হবে। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হূদরোগ রয়েছে তাদের ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। মনে রাখতে হবে অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার ও শাকসবজি খাওয়াও প্রয়োজন। প্রচুর পরিমাণে গরম পানি খেতে হবে। গরম পানিতে গড়গড়া করা এবং গরম পানির ভাপ নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া কালোজিরা মধুর সঙ্গে খেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। রসুন, আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ ইত্যাদি করোনাভাইরাসের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা রয়েছে। কখনোই ঠান্ডা লাগানো যাবে না। ভাইরাস যদি ফুসফুসে বেশ চেপে বসে তাহলে আপনার শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়া হতে পারে। যাদের হাঁপানি আছে তাদের জন্য এই ভাইরাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যাদের হাঁপানি আছে তাদের করোনাভাইরাসের মতো জীবাণুর সংক্রমণ হলে তাদের হাঁপানির লক্ষণগুলো বেড়ে যাবে।

করোনাভাইরাস বাসা বাঁধে  ফুসফুস এবং শ্বাসতন্ত্রেই। সাধারণত করোনা অন্যান্য অঙ্গকে আক্রান্ত করে না। নিঃশ্বাসে সমস্যা হলে বা বুকে ব্যথা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যেতে পারে। সঠিক খাবার, স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার মাধ্যমে করোনা রোগী সেরে উঠতে পারেন। ভীত না হয়ে সব সময় সচেতন হয়ে নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যকে সুস্থ রাখুন।

অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার
সদ্য সাবেক উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ও বর্তমানে চর্মরোগ ও যৌনব্যাধি বিভাগের চেয়ারম্যান

এক পরিবারের ৬ জন করোনামুক্ত : আমরা দুজন স্বামী-স্ত্রী সরকারি চাকরিজীবী। সঙ্গত কারণেই সরকারের নির্দেশনা পালনে ব্রত। তারই অংশ হিসেবে জেলা পরিষদ জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করে, যাতে আমিও অংশ নিই। আমার স্ত্রীও তার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির তালিকা প্রণয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে।

সব উপকরণ পরেও সতর্কতার মধ্যে চলেও ভাইরাস যে কখন নিজেদের দেহে বাসা বেঁধেছে, তা জানা ছিল না। শরীর একটু খারাপ লাগায় ছুটি নিয়ে আসি। ১৪ মে আমার ও স্ত্রী রোজিনা হাবিবের জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা দেখা দেয়। ভাবলাম মৌসুমের ভাইরাস জ্বর। বুঝে উঠতে না উঠতেই বড় ছেলে শেখ আরিফ মহিউদ্দিন (১৫), শেখ আসিফ মহিউদ্দিন (১৩), শেখ আবিদ মহিউদ্দিন (৯) ও আমেনা বিনতে মহিউদ্দিন (৩ বছর ৩ মাস) সবারই জ্বর, সর্দি, বমি ও কজনের পেট খারাপ দেখা দেয়। সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত উল্লাহর সাথে আলাপ করি এবং তিনি হাসপাতালে যেতে বলেন।

মুহূর্তের মধ্যে সন্তানদের সবাইকে দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করার জন্য বলি। সবার গ্লাস, বাটি, প্লেট ইত্যাদি আলাদা করে দিই। ছোট ছেলে ও মেয়েটা ঘুরেফিরে আমাদের কাছে। শুধুই কান্নাকাটি করে। এক ছাদের নিচে দুটি বেড ও ড্রইংরুম মেঝে মিলিয়ে ৫টি বেডে আলাদাভাবে ৬ জনের থাকার ব্যবস্থা করি। ছোট মেয়েটাকে তার মা থেকে একটু দূরে রাখি এবং নিজেদের মনোবল শক্ত রেখে আমরা দুজনই নিজেদের ক্লান্ত দেহ নিয়ে তাদের মাথায় পানি দেই।

লেবু, দারুচিনি, এলাচ, লং, আদা, কালোজিরা, তেজপাতা মিশ্রিত জাল দেওয়া পানি তোয়ালে, গামছা মাথার ওপর দিয়ে নাক ও মুখে ভাপ নেই দিনে অন্তত ৪ বার। ওরা নিতে চাইত না, তারপরও চেষ্টা বিফলে যায়নি। কান্নাকাটি করলেও ছোট মেয়েটার মাথা ধরে বাটি মুখের সামনে দিতাম। ভাপ নেওয়া ও টক, তিতো পানি আমরা ৫ জন পান করি আর বড় ছেলের গলা হালকা ব্যথার কারণে লবণ দিয়ে ওই পানি গড়গড়া করাতাম।

আবার জমজম কূপের পানি পান করি। ছোট মেয়েটাকে হালকা গরম পানি পান করাই। নমুনার রেজাল্ট যা-ই হোক, পজিটিভ ভেবেই যথারীতি চিকিৎসা শুরু করে দিয়েছি। স্ত্রীর নাকে গন্ধ থাকার কারণে সে-ও লবণ মিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করত। পেট খারাপ থাকার কারণে ওদের দু-একজনকে গরম পানি দেইনি কয়েকদিন। তবে এসএমসির ওরস্যালাইন দেওয়া হতো। রং চা, গরুর গরম দুধ পান করেছি।

সকলের আলাদা পোশাক, বিছানাপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই তা রোদে দেওয়া হতো জীবাণু ধ্বংসের জন্য। এরই মধ্যে বাসার মেঝে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নিজেই ধুয়ে নেই। কোনো ঠান্ডা পানি নয়, কুসুম গরম করে সবাই পানি পান করি। বাসাটা যেন একটা মিনি হাসপাতাল। যে যার জায়গায় পড়ে আছে। ছোট মেয়েটা তার মায়ের সাথে, আবার আমার কোলে। এরই মধ্যে আমার জ্বর ভালো হয়ে গেছে; মনে হয়েছে সুস্থ বোধ করছি। স্ত্রী চরম অসুস্থ হয়ে পড়ে।

বাচ্চাদের কারো জ্বর কিছুটা কমলেও আবার কারো পেট খারাপ থাকে, আবার বমি করে। একটা না একটা উপসর্গ থাকেই। প্রতিটা রাতের বেশি সময় আমরা দুজনেই সজাগ ছিলাম। কপাল ধরে ওদের অবস্থা, শ্বাসপ্রশ্বাস সঞ্চালন লক্ষ করতাম। তখন আমি বিষয়গুলো কঠিনভাবে সামলাই। এরই মধ্যে শেখ আরিফ, আমেনার জ্বর ভালো হয়ে যায়। তবে কাশি ও সর্দি লেগেই আছে সকলের।

শেখ আসিফ ও শেখ আবিদের হালকা জ্বর ও পেট খারাপ, বমির বেগ ছিল। তাদের দিনের মাঝে রোদে ছাদে নিয়ে যেতাম কিছুক্ষণের জন্য। তবে জ্বর কখনো মেপে দেখিনি। কপালে হাত দিয়েই অনুমান করি। প্রতিদিন নাক দিয়ে লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে তা আটকে আবার মুখ দিয়ে দম ছেড়েছি অন্তত দশ বার। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যা পেয়েছি, তা-ই করেছি।

সিভিল সার্জন জানালেন, সরকারি সিদ্ধান্ত হলো এখন ১৪ দিন পর দ্বিতীয় নমুনা নেওয়া। ৩১ মে হয় চৌদ্দ দিন। ১ জুন দুপুরে নমুনা নেন। রুটিনমাফিক হালকা কুসুম গরম পানি খাওয়া, নিয়মিত গরম ভাপ নেওয়া, লবণ আবার ভিনেগার মিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করা, প্রচুর পানি পান করা, রং চা, গ্রিন টি পান করা, শরীরের দুর্বলতা কাটানোর জন্য ওরস্যালাইন খাওয়া, ভিটামিন সি ও ডি যুক্ত খাবার, ফল, শাক-সবজি খাওয়া, বাচ্চাদের সিভিট ট্যাবলেট খাওয়া, কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করা, জ্বরের কারণে মাথায় ঠান্ডা পানি ও গা মুছিয়ে দেওয়া ইত্যাদি রুটিনমাফিক চলছিল।

৪ জুন বিকেলে ডা. সাজেদা পলিন আপা জানান, আপনাদের সকলের রিপোর্ট এসেছে। তিনি রিপোর্টের কপি আমার মোবাইল মেসেঞ্জারে পাঠান এবং আরো এক সপ্তাহ বিশ্রামে থাকার জন্য বলেন। মনটা ভরে গেল আর মনে হলো এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বার্তা।

লেখক : প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, চাঁদপুর

avertisements