avertisements

বসতভিটায় ধস, এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষ

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০১:৪০ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর,শনিবার,২০২০ | আপডেট: ১১:২৮ এএম, ৩০ অক্টোবর,শুক্রবার,২০২০

Text

মসলা-বুট বিক্রি করে সংসার চালাতেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাউনিয়া গ্রামের ওয়াজেদ আলী গাজীর ছেলে নাহিদ হাসান। সেখানে গোলপাতা ও মাটির তিনটি ঘরে বাবা-মা, ভাই-ভাবি, বোন, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ তারা ১২ জন থাকতেন।

অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে দিন চললেও নিজেদের ভিটেমাটিতেই থাকতেন তারা।  
কিন্তু ২০ মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আম্পানে নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় সাতক্ষীরা উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে ধসে যায় নাহিদ হাসানদের বাড়ি-ঘর। তাদের ঠাঁই হয় আশ্রয়কেন্দ্রে।

তবে শুধু বাড়ি-ঘর ধসের মধ্য দিয়েই শেষ হয়নি আম্পানের তাণ্ডব। প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার প্রবল স্রোতে নদীতে বিলীন হয়ে যায় নাহিদ হাসানদের পৈত্রিক ভিটামাটিসহ আরো অনেকের ঘর-বাড়ি। সেখানে এখন স্রোতসীনি বড় খাল। বাঁধ নির্মাণের পর জোয়ার-ভাটা বন্ধ হলে তারা যে ভিটেমাটিতে ফিরে আবারও ঘর তুলবেন সেই সুযোগটুকুও নেই।

আম্পানের পর দীর্ঘ সাড়ে ৩ মাস আশ্রয়কেন্দ্রে খেয়ে না খেয়ে দিন গেছে তাদের। অবশেষে ভিটেমাটির মোহ ত্যাগ করে লোকলজ্জার কথা ভুলে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছেন নড়াইল জেলার কালিয়ায়, ছোট ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে।

ঠিক এমনিভাবেই আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালী গ্রামের বিপুদের পাকা দালানবাড়িসহ ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

...চাকরি সূত্রে বিপুদের পরিবার আশাশুনি সদরে থাকলেও সেখানে বসবাসরত তার দাদী স্বামীর বসতভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

শুধু প্রতাপনগরের নাহিদ হাসান কিংবা শ্রীউলার বিপু নয়, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য, কর্মসংস্থান ও সুপেয় পানি সংকট এবং বাস্তুচ্যুত হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলের শতশত পরিবার।

ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়ার এই স্রোত শুরু হয়েছে ২০০৯ সালে প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস আইলার পর থেকে। সে স্রোত থামেনি আজও। একে একে খালি হচ্ছে উপকূল।

শ্রীউলা ইউনিয়নের হাজরাখালী গ্রামের বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক জিএম আক্তারুজ্জামান প্রিন্স জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানার পর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। এখনো ভাঙনকবলিত বাঁধ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন দুইবার জোয়ার-ভাটার প্রবল স্রোতে ভাসছে শ্রীউলা, প্রতাপনগর ও আশাশুনি সদর ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রাম। হাজার হাজার মানুষের ঘর ভেঙে গেছে। অনেকেই বাঁশ দিয়ে ঘরে ঠেকনি দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু লোনা পানিতে নিমজ্জিত মাটির ঘর কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে? 

এছাড়া জোয়ার-ভাটার প্রবল স্রোতে বড় বড় খাল তৈরি হয়ে গেছে। এসব খাল ও নদীতে শত শত পরিবারের ভিটেমাটি বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে এখন ৩০-৪০ ফুট গভীর খাল। মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ জোয়ার-ভাটা বন্ধ হলেও তারা আর খালের মধ্যে চলে যাওয়া ভিটেমাটি ফিরে পাবেন কি না, তা কেউ জানেন না।

শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের জেলেখালী গ্রামের দিনমজুর আনোয়ার হোসেন জানান, তাদের বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাই ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে টঙ ঘর বেঁধে কোনো মতে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে আছেন।

উপকূলীয় এলাকায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থা লিডার্স এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, নানা কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার প্রধান কারণ ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলেই বেড়িবাঁধ ভেঙে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়। লোনা পানিতে ঘরবাড়ি ধসে পড়ে। খাবার পানির সংকট আরও তীব্র হয়। কাজ থাকে না। তাই বাপ দাদার ভিটের মোহ থাকলেও তা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

তিনি বলেন, উপকূলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌকানির্ভর। লবণাক্ততার কারণে এলাকায় ফসল হয় না। তাই খাদ্য সরবরাহও আমদানিনির্ভর। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ঠিকমত স্বাস্থ্যকর্মী থাকে না। চিংড়ি চাষের কারণে কৃষিখাতের শ্রমিক উৎখাত হওয়ায় কর্মসংস্থান নেই। তার উপর ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলেও বন্যা হচ্ছে। কিন্তু সেখানকার পানি মিষ্টি। আমাদের উপকূলের পানি লোনা। এখান থেকে পানি নেমে গেলেও লোনার কারণে ফসল হবে না। তাই এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাও আর স্বাভাবিক থাকছে না।

এ প্রসঙ্গে আশাশুনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী বলেন, আম্পানের পর থেকে চার মাস মানুষ পানিবন্দি। বাড়ি-ঘরের মধ্যেও জোয়ার-ভাটা খেলছে। মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই অনেকেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃতির কাছে সবাই অসহায়।  

বিষয়:

আরও পড়ুন

avertisements