Main Menu

পাপুলের পাপে দেশ-বিদেশে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বাংলাদেশ!

মানবপাচার ও অর্থপাচারের অভিযোগে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল কুয়েতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। পাপলকাণ্ডে কুয়েতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইমেজ সংকটে পড়েছেন। তারা চরমভাবে মনক্ষুণ্নও হয়েছেন। মহান সংসদের একজন সদস্য হয়েও পাপুলের নানা পাপকর্মে দেশে এবং বহির্বিশ্বে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ভাবমূর্তি। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও চর্চা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতিবিরোধী ‘শুদ্ধি অভিযান’ ও জিরো টলারেন্স নীতির সামনে সাংসদ পাপুলের এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষেই দেশের দুর্নীতির চালচিত্র ও চরিত্রকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কিনা- সেটি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সর্বোপরি পাপুলকাণ্ড নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষক মহল।

গত ৬ জুন কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা মুশরেফ আবাসিক এলাকা থেকে পাপুলকে গ্রেফতার করে। তবে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম পাপুলকে গ্রেফতারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানে না বলে দাবি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের।

মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে আটক বাংলাদেশের স্বতন্ত্র এই এমপির বিষয়ে সংসদকে কুয়েত সরকার বা সংশ্লিষ্ট কেউই অফিসিয়ালি কোনও তথ্য দেয়নি বলে জানা গেছে।

দেশের আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের কোনও সংসদ গ্রেফতার হলে গ্রেফতারকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারকে জানানোর বিধান রয়েছে।

এদিকে বিদেশের মাটিতে একজন সংসদ সদস্যের আটকের ঘটনা দেশের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। অবশ্য এই সংসদ সদস্যের আটকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

কুয়েতে গ্রেফতার সাংসদ পাপুলের বিষয়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গণমাধমকে বলেন, ‘ওই সংসদ সদস্যের গ্রেফতারের বিষয়ে অফিসিয়ালি আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনও খবর নেই। আমরা গণমাধ্যম থেকে যতদূর যা জেনেনি। অফিসিয়ালি কোনও তথ্য আমাদের কাছে আসেনি।’

স্পিকার বলেন, ‘কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যের গ্রেফতার বা আটকের কোনও খবর বা সংবাদ কোথাও থেকে দেওয়া হয়নি। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই আমাদের জানাবেন।’ এখানে কর্তৃপক্ষ বলতে কুয়েত সরকার হওয়ার কথা বলেও স্পিকার মনে করেন।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭২ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, কোনও সংসদ সদস্য গ্রেফতার বা সাজাপ্রাপ্ত হলে স্পিকারকে জানাতে হবে। বলা হয়েছে, কোনও এমপি ফৌজদারি অভিযোগে বা অপরাধে গ্রেফতার হলে কিংবা কোনও আদালত কর্তৃক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে বা কোনও নির্বাহী আদেশে আটক হলে গ্রেফতারকারী বা দণ্ডদানকারী বা আটককারী কর্তৃপক্ষ বা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষ তৃতীয় তফসিলে প্রদত্ত যথাযথ ফরমে গ্রেফতার, দণ্ড বা আটকের কারণ বর্ণনা করে ঘটনা সম্পর্কে স্পিকারকে জানাবেন।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে কুয়েতের আল কাবাস সংবাদপত্র বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যকে মানবপাচারের অভিযোগে খোঁজা হচ্ছে এমন একটি সংবাদ ছাপায়। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উল্লেখ করা হয় প্রকাশিত সংবাদে। ওই সংসদ সদস্যের কুয়েতি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে চাকরি দেওয়ার জন্য কুয়েতে নিয়ে আসে এবং এই প্রক্রিয়ায় লেনদেন হয় শত কোটি টাকার ওপরে।

কুয়েতের ইংরেজি দৈনিক আরব টাইমস এর খবরে বলা হয়, অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যেতে কুয়েতের অন্তত ৭ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ঘুষ দেন পাপুল। তাদের মধ্যে ৩ জন কুয়েত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিভাগের প্রধান আর কয়েকজন অবসরে গেছেন।

অর্থ ও মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুলের মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির হিসাব জব্দ হচ্ছে। তার এই কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৭ কোটি ৮৮ লাখ ৮৩ টাকা) রয়েছে বলে আরব টাইমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

যেভাবে পাপুলের উত্থান:

কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল ওরফে কাজী পাপুল মূলত আলোচনায় আসেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে। অর্থের বিনিময়ে মহাজোট প্রার্থীকে বসিয়ে দিয়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কাজী শহীদ ইসলাম পাপলু ১৯৬৩ সালের ২৮ মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ও মাতার নাম তহুরুন নেছা। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। পাপলু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকার মিরপুরে তার বড় ভাইয়ের বাসায় এসে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি পড়াশোনার জন্য সাইপ্রাস চলে যান। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে কুয়েত গিয়ে একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। এরপর কিছুদিন একজন ভারতীয় পার্টনার নিয়ে কয়েকজন লোককে নিয়ে ক্লিনিংয়ের ব্যবসা শুরু করে।

পাপুলের চাচাতো ভাই মঞ্জু রায়পুর উপজেলা কমিটির বিএনপির সভাপতি। কুয়েতে গিয়ে সেলিনা নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখানে সেলিনাকে বিয়ে করে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। সেলিনা ইসলাম ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা এনে ৮ কোটি টাকার বন্ড দেখিয়ে সিআইপি হন।

জানা যায়, ২০১৬ সালের শেষের দিকে কুয়েত প্রবাসী কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। ওই সময়ে তিনি রায়পুর পৌর শহরের আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহের হাত ধরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সভায় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করাসহ মানবসেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক অনুদান দেয়া শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে সর্বমহলে দানবীর ও ধনকুবের হিসেবে পরিচিতি করাতে সক্ষম হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইলেও পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। এই আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া জাতীয় পার্টির তৎকালীন সাংসদ নোমান হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান। তখন অভিযোগ ওঠে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নোমান।

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে জয়লাভ করেন পাপুল। বিএনপি ঠেকাতে পাপুলকে তখন বাধ্য হয়ে সমর্থন দিয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এর কিছুদিন পর তার সহধর্মিণী সেলিনা ইসলাম স্বতন্ত্র কোটায় সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৯ ও ২০২০ সালে পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েতে মানবপাচার ও হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। অন্তত ২০ হাজার বাংলাদেশিকে কুয়েতে পাঠিয়ে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয় করেছেন বলে কুয়েতের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়। কুয়েতের সংবাদমাধ্যম আল-কাবাসের প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন বাসিন্দার সঙ্গে আর্থিক অংশীদারিত্ব গড়ে কুয়েতে আয় করা বেশির ভাগ অর্থ পাপুল আমেরিকায় পাচার করেছেন বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়। যদিও পাপুল এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

এদিকে বিদেশে অর্থ, মানবপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে পাপুলের নিজের, তার স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব অ্যাকাউন্টের লেনদেন গত ২২ জুন স্থগিত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিআইএফইউ) প্রধান বরাবর ওইদিনই একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

দুদক কর্মকর্তা জানান, এমপি পাপুল, তার স্ত্রী রংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিনের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করতে অনুরোধ করেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন।

আরও জানা গেছে, দেশের স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত দিগন্ত টিভি, নয়া দিগন্ত এবং দিগন্ত মিডিয়ায় পরিচালকের পদও বাগিয়ে নিয়েছেন তিন কোটি টাকার বিনিময়ে। অবশ্য এই টাকা তিনি তার ব্যাংক হিসাব থেকে দেননি। তথ্য প্রমাণ না রাখতে নিজের শ্যালিকার হিসাব মাধ্যমে লেনদেন করেছেন।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT