Main Menu

“জি” এর জোঁক 

জালাল উদ্দিন আহমেদ: গুইসাপে কামড় দিলে সহজে ছাড়ে না। শ্রুতি আছে মেঘ না ডাকা পর্যন্ত গুইসাপ তার কামড় ধরে থাকে। আবার জোঁকের বেলায় দেখা যায় হুকোর জল কিংবা লবন তার গায়ে না ছিটানো পর্যন্ত সে তার রক্ত চোষন বন্ধ করে না। কেন এমন মনে হয় ইদানিং জানি না। বিমর্ষ হই। কিন্তু ভেঙ্গে পড়ি না। বিষয়টি সর্বগ্রাসী হয়ে বাংলার প্রতিটি আঙ্গিনায় আজ কড়া নাড়ছে। তবে সতর্ক হওয়ার সময় বোধ হয় এখনো পেরিয়ে যায় নি। মনে রাখা দরকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলি যখন বিচ্ছিন্নভাবে ব্লাক স্পট হয়ে জমতে থাকে তখন ভিন্ন ভিন্ন উপলক্ষ একত্রিত হয়ে বিশাল উইপোকার ঢিপি বানিয়ে ধংসের দামামা বাজিয়ে সব শেষ করে দেয়। 


বলছি “জি” সম্পর্কীয় কথকথার গল্প। এই যে এত “জি’ এর ছড়াছড়ি বাংলার ঘরে ঘরে- হলফ করে কেউ কি বলতে পারেন, এই ধাতব আধুনিকতার কত পার্সেন্ট আমরা ধাতস্থ হতে পেরেছি। উচ্চবিত্তের ৫% এর কথা বাদই দিলাম। আসুন মধ্য বিত্তের ১৫% কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্তের ৩০%। সর্বক্ষেত্রে থ্রি-জি ফোর-জির কাড়াকাড়ি। সেক্ষেত্রে নিম্নবিত্তের হেসেলের খবরও যে সুখকর নয় তাও চোখ বুজে বলা যায়। ৫০% নিম্নবিত্তের মধ্যে রয়েছে শ্রেণী বিন্যাস। তাদের ৫% উচ্চ নিম্নবিত্ত।৩০% মধ্য নিম্নবিত্ত। আর বাকি ১৫% ছিন্নমুল নিম্নবিত্ত। এই যে এত হিসাব কষা হোল তাতে দেখা যায় সর্বক্ষেত্রে ওই “জি’ এর  সর্বগ্রাসী বিচরন ছত্রপতি শিবাজির ন্যায়। এই ছত্রপতি যেমন তার বীরত্ব ও ক্যারিশমা দিয়ে লাখো মানুষের হৃদয়ে স্পন্দন এনেছিলেন, আজকের দিনে এই “জি” এর আশীর্বাদ আমাদের প্রাত্যহিক চলনে বলনে এক অপরিহার্য আলোকবর্তিকা হয়ে অবস্থান করছে। এই “জি” না হলে জীবনই বৃথা।


“জি” সম্ভবতঃ জেনারেশনকেই বুঝাচ্ছে বোধ হয়। “ফোর জি” বা ফোর্থ জেনারেশন শেষ করে আমরা এখন “৫ জি” বা ফিফথ জেনারেশনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। তার শিলান্যাসও হয়ে গেছে। সুতরাং এই “জি” এর সাহায্য নিয়ে এখন আমাদের কচুর শাক, আলু ভর্তা, চিতোয় পিঠা, ভেন্ডি ভাজি ইত্যাদি সব রান্নাবান্না ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে হয়। কিভাবে শার্টের বোতাম লাগাবেন, চশমার ফ্রেমটা ঠিক হোল কিনা কিংবা জুতার ফিতাটা জুতার সাথে মানানসই হোল কিনা তা এই “জি”ই আপনাকে বলে দেবে। মুন্নির মা কলেজ গেটের মোড়ে লাক্ড়ির চুলা জ্বালিয়ে ভাপা ও চিতোয় পিঠার দোকান বসিয়েছে। আমরা ক্লাবে বসে মুন্নির মাকে হেয়াটস্ আ্যপে চিতোয় পিঠা ও সঙ্গে সরিষা ভর্তা ও শুটকি ভর্তার অর্ডার দিয়ে তা শাকিলকে দিয়ে আনিয়ে নেব। ওদিকে শহীদ ভাই সময় মত ক্লাবে আসতে পারেননি তাই তিনি হোয়াটস অ্যাপে অটোওয়ালা আজাদকে হাক্ডাক করছেন। শহরের টিপু সাহেব  গ্রামের চাষী ভোলার সাথে ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল দিয়ে জমির বাড়ন্ত ধান গাছের চালচিত্র দেখে নিচ্ছেন। দিনমজুর আফজাল আলির কলেজ পড়ুয়া মেয়ে তার বাবার মুনিবের মেয়ে টুম্পার কাছ থেকে ই-মেইলে ফিজিক্সের নোট ডাউনলোড করছে। ওদিকে কারওয়ান বাজারের ভ্যানচালক সবজি বিক্রেতা শ্যামবজারের ভ্যানচালক সবজি বিক্রেতার সঙ্গে প্রতিদিনের সবজির দরদাম ঠিক করে নিচ্ছে তার লুঙ্গির কোঁচে জড়িয়ে রাখা সেট থেকে। আবার মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েরা সেট হাতেই ডাটা প্যাক আর “জি” এর সমস্যা নিয়ে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছে। মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরে জন্ম নেয়া তিন বছরের শিশুটির দখলে থাকছে বাবা মায়ের স্মার্ট ফোনের সেটটি। বাবুকে খাওয়াতে গেলে শুয়াতে গেলে বা চুপ রাখতে গেলে এই জি এর আশীর্বাদ ষোল আনাই তার দখলে থাকতে হবে। বাবা বাধ্য হয়েই কমদামি নরম্যাল সেট কিনে তার নৈমত্তিক কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। এই “জি” এর উলঙ্গপনা তখন দেখি যখন মা তার বাচ্চােেক নিয়ে স্কুলে যান। বাচ্চাটি চলন্ত রিক্সায় অসহায়ের মত চুপটি করে বসে থাকে। ওদিকে স্মার্ট মা তারই পাশে বসে দিব্যি টিপাটিপি করছেন। কাজের বুয়ারা সকাল বেলায় তাদের কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছে। একহাতে চওড়া একটি মোবাইল সেট অন্য হাতে তার ব্যবহারের পান সুপারির পুটলি। দিন শুরুর এই চমৎকার দৃশ্যটি  উপভেগ্যই বটে। কর্মজীবি বাবা বাসায় ফিরছেন রাত করে। কলিংবেল টিপেই যাচ্ছেন। দরজা খোলার সময় কারো নেই। সবাই ব্যস্ত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ডিজিট্যাল জামানায়। মিনিট পাঁচেক পর মা দড়াম করে গেটটা খুলে সটান চলে গেলেন তার বেডরূমে। কারন একটা মজার রিসিপিওয়ালা ঢেড়স রান্না দেখতে ব্যস্ত তিনি। মেয়েটিও বাদ নেয়। সেও তার রূমে ইউ টিউবে মাইকেল জ্যাকসনের হান্ড্রেড কালেকশন শুনতে ও দেখতে ব্যস্ত। ওদিকে ইন্টার পড়ুয়া ছেলেটি তার রূমে বিকট শব্দে রেসলিং চালিয়ে রেখেছে। আর ছোট্ট মেয়েটি কাজের বুয়াকে নিয়ে ড্রয়িং রূমে স্টার জলসার “কলের বৌ” দেখছে মশগুল হয়ে। আমাদের ডিজিট্যাল বাংলার প্রতিটি ঘরের চালচিত্র এটি। আর যাদের ঘরে সেটের “জি” নাই তার ঘরে স্যাটেলাইট টিভির “জি” বা “স্টার” তো সহাস্য বদনে চব্বিশ ঘন্টা বাংলার আনাচে কানাচে পরকীয়া, ঝগড়া ফ্যাসাদ, যুবক যুবতীদের বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ও মদ গিলানোর এন্তেজামে সদা সোচ্চার। জুমার দিন। হুজুর নামাজের আগে বয়ান করছেন। ওদিকে শ্রোতার সারিতে নামাজ পড়তে আসা দু ্একজন  টিন এজার সেট হাতে জি নিয়ে টিপাটিপি করছে। এমন কি জুমার দু’রাকাত ফরজ শেষ হতে না হতেই দেখি ওইসব টিন এজাররা তাদের সেটটা খুলে দেখছে এই ছোট্ট সময়ের মধ্যে তার কোন ম্যাসেজ এসেছে কিনা। এ এক ব্রীড়িত আগ্নেয় লাভা।  


এই “জি” আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। মা তার বিদেশ পড়ুয়া ছেলের সাথে মুখোমুখি কথা বলেন এই জি এর বদৌলতে। করোনা প্যানডেমিকের এই দিনে বাবা তার অফিসের কাজ কর্ম সেরে নেন এই জি এর আশীর্বাদে। কিংবা সদ্য বিাবহিত যুগল দূরত্বকে তুড়ি মেরে সচিত্র মুখে মুখ রেখে রাত জেগে কথা বলেন। এই জি এর বদৌলতে আজকের যতসব ভার্চুয়াল কনফারেন্স বা টিভি টকশো আমরা অনুষ্টিত করতে পারছি। তারপরেও আমরা ষাটোর্ধ বয়ঃজ্যেষ্ঠরা! যেন মনে হয় খাবি খাচ্ছি। সব যেন এলোমেলো লাগছে এসব আমাদের কাছে। সামাজিক পরিবর্তন ও সাংসারিক এইসব এলোমেলো চালচলন আমাদের কাছে বড়ই অদ্ভুত লাগে। কোন মেজার নেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। এমনকি এ নিয়ে কোন টু শব্দ করার জোও আমাদের নেই। শুধু বিড়বিড় করি আর বিরক্ত হই। আমাদের আওয়াজটা আজ বড়ই ক্ষীণ। তবে নৈতিকতার অবক্ষয় কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে এবং নৈতিক মনোবল আজ সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু খোলা চোখে দেখা যায়। তারপরেও বলি, হতাশ হচ্ছি কিন্তু হাল ছাড়িনি। প্রযুক্তির আশীর্বাদ আস্তেধীরে গ্রাস করে আমাদেরকে জড় পদার্থ তৈরীতে এগিয়ে নিচ্ছে। আমরা এক মায়াবী যাদুর জালে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। এ থেকে উত্তরনের পথ খুঁজতে হবে। উপচে পড়া প্রযুক্তির সহয়তায় আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু রোবোটিক আচ্ছন্নে আজ আমরা যেভাবে মানবিক মূল্যবোধকে জলাঞ্জলির পর্যায়ে নামিয়ে এনেছি তা মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়।  


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT