Main Menu

করোনায় ধর্মচর্চা

রাশেদুল ইসলাম: 
(তিন) 
 আমরা  প্রায় সকলেই   গৃহবন্দি এখন  । তবে  এই বন্দি থাকাটা  একটা যুদ্ধ- কৌশল মাত্র । করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কৌশল  ।  আমাদের অনেকেই  আছেন ‘কাজপাগল’ মানুষ । তাঁদের জন্য ঘরে বসে থাকাটা বেশ কষ্টের । কিন্তু,  বিভিন্ন হাসপাতাল এবং  স্বাস্থ্যকেন্দ্রে  যে সকল  চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী  কাজ করছেন,   মাঠ পর্যায়ে যারা জীবনবাজি রেখে কাজ করছেন;  তাঁদের  তুলনায় আমাদের  এই বন্দীজীবন অনেক  কম কষ্টের এবং  মোটেও ঝুঁকিপূর্ণ নয় । নিয়ম মেনে ঘরে বসে থাকাটাই এখন আমদের দায়িত্ব ।  এ ধরণের  মহামারীতে করণীয় বিষয়ে সহী হাদিসেও একই বিধান রয়েছে । হাদিসেও এভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কথা বলা হয়েছে । ফলে, এ সময়  নিয়ম মেনে ঘরে বসে  থেকে   ‘ সবর’ করা   এক ধরণের ইবাদত ।  তবে,  বন্দী থাকলেও আমরা  পরস্পর বিচ্ছিন্ন  নই । ডিজিটাল সুবিধার কারণে  আমরা শুধু  নিজেদের নয়,  গোটা পৃথিবীর সব  খবর এই ঘরে বসে পাচ্ছি ।  এ যেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি  স্বপ্ন পূরণের দৃশ্য  !  বিদ্রোহী কবি  কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘সংকল্প’ কবিতায়   যে সকল সংকল্প ব্যক্ত করেন, তার একটা অংশ নিচে দেওয়া হলঃ   
‘পাতাল ফেড়ে  নামব নীচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্ব- জগত দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে ।  
আমাদের পাতাল জয় করা সময়ের ব্যাপার মাত্র । বঙ্গবন্ধু  স্যাটেলাইট ১ ইতোমধ্যে মহাশূন্যে স্থান করে নিয়েছে । আর ঘরে বসে হাতের মুঠোয় মোবাইল সেট রেখে,    বিশ্বজগত  দেখতে দেখতে এখন আমাদের সময়  কাটছে । নজরুল ইসলাম  নিজে তাঁর স্বপ্ন পূরণ দেখে যেতে পারেননি; কিন্তু, আমরা তার সাক্ষী । 
আমরা এখন  ঘরে বসে বিশ্বজগত  দেখতে পাচ্ছি ।  এটা অনেক বড় রহমতের ব্যাপার  ।   আমরা যেন  এই সুযোগের অপব্যবহার না করি-  সেদিকটাও  আমাদের মাথায় রাখা দরকার  । আমরা জানি,  যিনি  কাজ করেন,  তার ভুল হয় । আর যিনি কাজ করেন না, তার কোন ভুল হয় না । বুঝতে হবে আমরা যারা গৃহবন্দি  আছি এবং  কোন কাজ করছিনে – আমাদের  কোন ভুল হবার সুযোগ নেই  । কিন্তু, যারা এই মহাদুর্যোগে সশরীরে  কোন না কোন কাজ করছেন;  আমরা যেন অহেতুক তাঁদের কাজের ভুল না ধরি ।  তাঁদের কাজের এমন  কোন মন্তব্য না করি,   যেন তাঁরা কষ্ট পান বা  তাঁদের  মনবল ভেঙ্গে যায় । পারলে তাঁদের কাজের প্রশংসা করি । না পারলে  চুপ থাকি । বিশেষ কোন অসংগতি লক্ষ্য করলে,   এমন গঠনমূলকভাবে বলি,  যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত  সংস্থা তা  প্রয়োজনে সংশোধন করার সুযোগ পান ।  আমরা কোন ভাবেই  যেন গুজব সৃষ্টি না করি; বা কোন ধরণের গুজবকে উৎসাহ না দিই । এটাও আমাদের সবার  ধর্মীয় এবং নৈতিক  দায়িত্বের মধ্যে পড়ে । 
একথাও  সত্য যে,  ঘরে বসে থাকতে   থাকতে  জীবনটা কেমন  যেন করোনাময় হয়ে যাচ্ছে ।  সারাদিন ঘুরেফিরে একই  চিন্তা । করোনার চিন্তা । এ ধরণের চিন্তা   অনেক সময় সুস্থ মানুষকেও অসুস্থ করে দেয় । কোন বিষয়ে   নিজের যখন  কিছু করার  না থাকে, সে বিষয়ের কোন নিয়ন্ত্রণ যদি নিজের হাতে না  থাকে;   তখন তা নিয়ে শুধু শুধু চিন্তা করা, এক ধরণের ‘অর্থহীন চিন্তা’ ।  এ ধরণের অর্থহীন চিন্তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল করে  । আয়ু ক্ষয় করে । তাই, এই করোনাময়  দিনগুলোতে  নিজেকে অর্থহীন চিন্তা থেকে দূরে রাখা এবং অন্যকে সৃজনশীল কোন চিন্তার দিকে নিয়ে যাওয়া – আমার  এ লেখার উদ্দেশ্য । আর  ধর্মচর্চা করার   এ ধরণের  সুযোগ পাওয়া  অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার । সম্মানিত পাঠকের যতদিন ভালো লাগে-  এই চর্চা ততদিন  অব্যাহত   রাখা যেতে  পারে । 
ফেসবুকে আমার বেশ ক’জন  শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু আছেন। তাঁদের অনেকেই ধর্মের উপর  ভাল জ্ঞান রাখেন । আমার  লেখায় ধর্ম বিষয়ে  কোন ধরণের অসংগতি বা প্রশ্নবোধক কিছু থাকলে,   তাঁরা আমাকে জানান ।  আমি সাথে সাথেই  সেটা আমলে নিই এবং  প্রয়োজনে তা   সংশোধনের  ব্যবস্থা নিই । কিন্তু  বিষয়টা  জানাতে  বিলম্ব হোলে,  আমার কিছু করার থাকে না । তার কারণ, দেশেবিদেশে অনেক অনলাইন পত্রিকা আছে,  আমার লেখা পাওয়া মাত্রই  তা প্রকাশ করে ।  সে ক্ষেত্রে  আমার পর্যায়ে  তাৎক্ষনিক  কিছু  করার থাকে না । এ ধরণের একটা সমস্যা বলার জন্যই এত কথার অবতারণা ।
 একবার আমার একটা লেখা নিয়ে একজন পাঠক আপত্তি করেন । সেখানে আমার লেখা ছিল অনেকটা  নিম্নরুপঃ 
 ‘যে কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মানুষ বা সমাজের উপকার করতে পারেন । এই সুযোগ পৃথিবীর সব মানুষের থাকে ।  মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামী ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়ার আগে, একটু ঘাড় ফিরিয়ে  যদি তিনি তাঁর মৃতদেহটা কোন   মেডিকেল কলেজে দাণ  করার কথা বলে যান;  তাহলে তা অনেক বড় কল্যাণমূলক কাজ  হতে পারে । কারণ, মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা  একটা সদ্য মৃতদেহ পেলে, একটা  মরদেহের প্রথম অবস্থা থেকে কঙ্কাল হওয়া পর্যন্ত  অবস্থা  জানতে পারবে এবং  তা নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পাবে । পরবর্তীতে সেই নরকঙ্কাল   তাঁদের হাতেকলমে শিক্ষালাভে সহায়ক হবে ।   ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সেই আসামীর  মৃতদেহ যদি ১০০ জন মেডিকেল চিকিৎসক  তৈরিতে  সহায়ক হয়- তা হোলে এটা তাঁর জন্য অনেক বড় পুন্যের কাজ হতে পারে’ ।
 আমার শুভাকাংখী বন্ধুটি  আমার লেখা থেকে  এই উদাহরণ বাদ দেয়ার কথা  বলেন । কারণ, তিনি জানান  ইসলাম ধর্মে  মেডিকেল কলেজে দেহদান করার  বিধান নেই । 

আমি আগেই বলেছি, ধর্ম বিষয়ে আমি মোটেও  বিশেষজ্ঞ কেউ  নই ।   ইসলাম ধর্মে  মেডিকেল কলেজে দেহদান  করার  বিধান আছে কি না,   তাও   আমার জানা নেই । যদি থাকে তাহলে কথা নেই;  কিন্তু,  যদি না থাকে,   তাহলে   তা  বিবেচনা করার  বিষয়টি   সম্মানিত আলেমগন পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে   পর্যালোচনা   করবেন,   এটাই আমার প্রত্যাশা ।

  পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, 

 ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম জীব হচ্ছে সেই মূক ও বধিররা,  যারা তাদেরকে প্রদত্ত বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে না’ (সূরা আনফাল, রুকু ৩, আয়াত ২২)।


 অর্থাৎ, পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা হোল, যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে আগে  নিজেদের  বিচার- বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে । যদি তা না করা হয়, এই বিধান অনুযায়ী তা মানুষের কাজ হবে না । 

আমার মনে হয় মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে  ইসলাম ধর্মসম্মত ।  সেক্ষেত্রে  মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মানুষের শরীর কাঠামো  বা Anatomy  পড়ানো ধর্মসম্মত হওয়ার কথা ।  এনাটমি পড়াতে  যে মানবদেহ কাঠামো বা নরকঙ্কালের প্রয়োজন  হয় তা সর্বজন  স্বীকৃত ।  বর্তমানে মেডিকেল কলেজের  শিক্ষার্থীরা  নরকঙ্কাল  কোথায় পায়,  আমার জানা নেই । যদি তা অবৈধ পন্থায় সংগ্রহ করা হয়,   তা ধর্মসম্মত হওয়ার কথা নয় ।  এ প্রেক্ষিতে কেউ যদি সেচ্ছায় দেহদাণ করতে চান,   কোরআন ও হাদিসে সরাসরি এ বিষয়ে উল্লেখ না থাকলেও,বাস্তবতার নিরিখে   দেশের সম্মানিত  আলেমগণ এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে  ঐকমত্য হয়ে একটি ধর্মসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে  করতে পারেন । বিষয়টি সংশ্লিষ্ট   সকলের  বিবেচনার জন্য অনুরোধ করা হোল । 

পবিত্র কোরআনে ধর্ম বিষয়ে  চিন্তা ও গবেষণার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । কিন্তু, ইতিহাস সাক্ষী  ধর্মীয়  সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহনে আমাদের আলেমগণ অনেক পিছিয়ে আছেন ।  এই অভিযোগ অনেক পুরাতন । উদাহরণ হিসাবে  হাদিস সংকলনের ইতিহাসের কথা এখানে  উল্লেখ  করা যেতে পারে । 
 
ইসলামের প্রথম যুগে নবী করিম (সঃ)  বলেন, 

‘তোমরা আমার কথা  লিখবে না’ ।

  নবী করিম (সঃ) এঁর  এই নির্দেশনা  মতে প্রায় ১০০ বছর যাবত নবীর উপর কোন  কিছু  লিখে সংরক্ষণ করা হয়নি ।  মুহাদ্দিসগন ওস্তাদের কাছ  থেকে শুনে মুখস্থ করে ‘ইলম’  অর্জন করতেন । হিজরি ৯৯ সনে    ইসলামের পঞ্চম খলিফা হন ওমর ইবনে আব্দুল আযীয ।  তিনি  দায়িত্ব গ্রহনের  কয়েকদিনের মধ্যেই কয়েকজন প্রখ্যাত আলেম মৃত্যুবরণ করেন ।  তিনি  অনুধাবন করেন,  অবিলম্বে  হাদিস সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া না হলে  আলেমগনের মৃত্যুর সাথে সাথে  হাদিসের বিলুপ্তি ঘটবে । তিনি  তখন  তাঁর  সকল গভর্নরের প্রতি  একটি ফরমান জারি করেন । ফরমানের  অর্থ ছিল নিম্নরুপঃ
 
‘আমি শঙ্কাবোধ করছি আলিমগণের তিরোধানের মাধ্যমে ‘ইলম’ এর বিলুপ্তি ঘটছে । অতএব,  তোমরা রাসুল (সঃ) এর হাদিসের প্রতি লক্ষ্য কর,  তা জমা কর এবং  লিখে রাখ’ ।  

খলিফার এই ফরমান বলে  প্রত্যেক গভর্নর স্ব স্ব অধিক্ষেত্রের মধ্যে বসবাসরত  আলেমগণকে  ডেকে পাঠান । তিনি সকলকে  তাঁদের মুখস্থ  হাদিস লিখে জমা দেওয়ার জন্য বলেন । ওমর ইবনে আব্দুল আযীয এঁর  এই কর্মকাণ্ড তৎকালীন আলেমগণ সমর্থন করেননি । তীব্র বিরোধিতা করেন ।  তাঁরা এটাকে নবীর আদেশ অমান্য করা হচ্ছে বলে  অভিযোগ করেন  ।  খলিফা জানান,  নবী করিম (সঃ) কোরআন নাজিল হওয়া অবস্থায় তাঁর  সম্বন্ধে লিখতে নিষেধ করেন ।  কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পর সেই নির্দেশের কোন  কার্যকারিতা থাকার কথা নয় ।  

  ইসলামের ৬ টি সহি হাদিস গ্রন্থ  যেমনঃ  বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি ,  নাসায়ী  এবং ইবনে মাযাহ শরীফ –যেগুলো  নবীর জীবনদৃষ্টান্ত হিসাবে আছে;  তা  খলিফা    ওমর ইবনে আব্দুল আযীয এঁর দূরদর্শি সিদ্ধান্তের  ফল ।    খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয   এঁর যুক্তি ও সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে যথাযথ বলে প্রমাণিত হয়েছে । 

 পবিত্র কোরআনের ‘সূরা আসর’  মহান আল্লাহ ‘সময়ের শপথ’ দিয়ে শুরু করেছেন ।  এই শপথের মধ্যে  কোরআন ও  হাদিসে বর্ণিত কোন ঘটনার বর্ণনায় স্থানকালপাত্র বিবেচনার নির্দেশনা রয়েছে  বলে আমার সীমিত জ্ঞানে মনে হয়েছে ।  

 আমি ইসলামের সুযোগ্য খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয এঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । মহান আল্লাহ তাঁকে বেহেশতের সূউচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন ।

লেখাটা বোধহয় বেশী বড় হয়ে গেল ।

সকলকে শুভেচ্ছা ।  

 ঢাকা, ১ এপ্রিল, ২০২০ । 


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT