Main Menu

কবি ভাবনা


জালাল উদ্দিন আহমেদ:কবি তার কবিতার পংতিমালায় মুখোশ আবৃত মুখের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। কবি যেমন নারী, নদি, প্রেম প্রকৃতি নিয়ে সমাজে ভালবাসা ও প্রেম প্রীতির জয়গান করেন পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম ও অসংলগ্নতাকে তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরে সমাজের মুখোশ উন্মোচন করেন। সুকান্ত নজরুলের তেজী কন্ঠের উত্তরপুরুষ হয়ে জেগে উঠার সময় তো এখনই। নতুন তরি ও নতুন তীর নিয়ে গর্জে  উঠুক কবিকন্ঠ। জাতির মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে কবি মন সবসময় অগ্রনী ভুমিকায় থেকেছে। প্রাক এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন কবিদের অগ্নিদীপ্ত পংতি ও সুরের ছন্দে বাঙালী উদীপ্ত হয়েছে। সুকান্ত ও নজরুলকে সামনে রেখে আমরা এগিয়েছি। ইদানীং অমিত তেজের তেজী ঘোড়াকে কবির কবিতায় উচ্চকিত হতে দেখি না। জনসংখ্যার বিষ্ফোরন, রাজনীতির দুর্বিনীত আচরন আর অনিয়মের ডামাডোলে দেশ যখন খড়কুটো খুঁজছে তখন কবিমন কেন আজ ম্রীয়মান। নষ্টের নষ্টালজিয়ায় দেশ যখন ক্ষতবিক্ষত তখন কোন অশনি আজ কবিকে করেছে কলম বিমুখ।  
এসো আজ বস সবে শোন সাতকাহন
কবিতার কন্ঠ আজ রূদ্ধ কেন, কেন মুহ্যমান।

এই সাতকাহনের কাহিনীগুলোকে বিনি সুতোর মালায় কবিকে গাঁথতে হবে। নীরবতা ভেঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র গাঁথায় কবিকে সোচ্চার হতে হবে। সংসার-সমাজ-রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে আজ অনিয়মের ঘোরটোপ।
সংসার সমাজ আজ ছিন্নভিন্ন সন্ত্রাসের ছোবলে
সন্ত্রাসী আজ সমাজপতি মোড়ল হয়েছে সবখানে।

এই মোড়লীর বিষবাষ্প থেকে সমাজকে মুক্ত করতে প্রয়োজন কবিতার উচ্চকন্ঠের আওয়াজ যা সাধারনে নাড়া দেবে। অমিত তেজের ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে সামাজিক আন্দোলনের পথ পরিক্রমায় কবিকে এগিয়ে আসতে হবে। পক্ষ-বিপক্ষের বিষবাষ্প মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে কবি এগিয়ে আসবে প্রগতির নিরপেক্ষ ভূমিকায়। রাষ্ট্র আজ অনিয়মের আড়তে পরিণত হয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসার মন্ত্র গাইতে হবে যার সরল পথটি ফররুখ নজরুল আমাদের দেখিয়ে গেছেন।  
সংসারের বজ্র অঁটুনি আজ কোথায়! প্রাত্যহিক কর্মে শুধুই অনিয়ম। পিতা-পুত্র, মাতা-কন্যা সবখানেই শূন্যতার আবহ। সন্দেহ অবিশ্বাস আর বিবেকের প্রতারনায় প্রতিটি সংসার আজ ঘোলাজলে পূর্ণ।
 আভিজাত্যের আবাসিকে ব্রোথেলের গন্ধ
লক্ষিতা রূপিনী বেশে ভার্যা ও সুতি
পিতা-পুত্রের দ্বিচারন ভীষন আঁশুটে
সংসারের হেসেলে ভোদকার কদর। 

ব্যাক্তিনামায় কি পাওয়া যায়! অনিয়ম দ্বিচারন শঠতা – এটাই যেন আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। এই সত্যের প্রলেপ আজ প্রলাপে পরিণত হয়েছে। 
অফিসের কর্তা ব্যাবসায়ীজন
দ্বিচারন সবখানে এক নিঃশ্বাসে
তসলিমার দ্বিখন্ডিত ক এর আদলে 
বড়বাবু মেজবাবু বিগ বসও
স্মার্ট প্রেমিক,সহকর্মীর সাহচর্যে
যেন প্রাণোচ্ছল পুরুষ।
ঢের রাতে বাড়ি ফেরা কর্তা
ব্যস্ততার অজুহাত নাকেমুখে
অথচ কাচ্চু হাইড্রোর আসরে।

এরকম অনিয়ম অস্বচ্ছ্বতা ব্যাক্তি জীবন সমাজ জীবন ও রাষ্ট্র জীবনে সার্বক্ষনিক সঙ্গী হয়ে আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। সৎভাবে সৎকথা বলার লোকের বড়ই অভাব। মিথ্যা ও অনিয়মের থিম দিয়ে সাজানো হচ্ছে এই সমাজকে। 
সেদিনের সলু, ফুটপাতের টোল তোলা সল্যা
আজ সলিম সাহেব, 
নামডাক বেশ, সমীহ করার মতই বটে।
চারতলা বাড়ী গ্যারেজে গাড়ি
ঢাকা-রংপুর রূটে ডজন খানেক বাস
আরো আছে! এই আছের মধ্যেই 
ওরা ছেয়ে আছে আমাদের মাঝে।

সমাজের নিয়ামক তো আজ ওরাই। ওদেরই দাপটে সমাজ বদ্ধতার শাশ্বত অঙ্গীকার আজ ফিকে পানসে হয়ে গেছে। মানুষের মানবিক মুল্যবোধ যেন কচুপাতার ফোঁটাজল। কবিকে লিখতে হবে এইসব অনিয়মের কথা। কিন্তু কি নিয়ে লিখবে কবি। সমাজের প্রতিটি আবেদন আজ উইপোকার ঢিপি হয়ে আমাদের সামনে বিরাজ করছে।    
রাজনীতি নিয়ে লেখা! উপাদান কোথায়
বাণিজ্যের বেসাতি বৃটিশ বেনিয়া আদলে
ফেরিওয়ালা রিক্সাওয়ালা নৌকার মাঝি
দিনমজুর কামলা ফুটপাত খেলার মাঠ 
সবখানে চলছে সেই একই আহাজারি
স্বপক্ষ-বিপক্ষ আর সন্দেহের বিষাক্ত ছোপ।

সাংসদ এমপি! যাদেরকে নিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চায় অসহায় আমজনতা মুক্ত নিঃশ্বাসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায়! দেখুন না, এরা কারা। 
এরা দুর্জয় মহীরূহ ক্ষমতার শক্ত পিলার
প্রচন্ড শক্তির মহড়ায় জটাধারী নক্ষত্র
সাংসদ এমপি – এরা নটবর
গণতন্ত্রের বটবৃক্ষ যেন।

নেতা নেত্রীর দিকে তাকালে কি দেখা যায়! একজন প্রতিবাদী কবির চোখে সেটাও ফিকে পানসে হয়ে ধরা পড়ে। তায় তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে লিখে ফেলেন।
গতায়ু পিতার খোলা নাওয়ে কন্যার আবির্ভাব
রাজনীতির মঞ্চে জনক নন্দিনী আজ দেশরত্ন
ওদিকে মহান সেনানী যিনি-শহীদও বটে
তার ঘরানায় রাজনীতির পোক্ত শিকড়
আর বিশুদ্ধ রাজনীতির আহাম্মক যারা
খাবি খায় পচা প্যাঁক পুকুরের কাতলা মাছসম। 

এসব ছন্দহীন বেসুরো কথা সুর ও ছন্দের পেরেক ঠুকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলার দায়িত্ব কবিকেই নিতে হবে। কবিকে লিখতে হবে সেইসব বিষাক্ত রাজনীতির কথা যেখানে মঞ্চ বানিয়ে জনতার নামে আড়া পেতে মাছ শিকারের ঘোলাজল তৈরী করা হয়।
প্রজাতন্ত্রের শৃংখলিত কর্মী উচ্ছৃংখল 
স্বপক্ষ বিপক্ষের বিনি সুতো গাঁথে 
শতবর্ষের চিরায়ত বিষাক্ত গরলে
জনতার কর্মচারী, মঞ্চ আয়োজনে
রাজ সিংহাসনে।

দেশ জাতি নেতা নেতৃত্ব সব যেন নাগর দোলার মত দোল খাচ্ছে। স্থায়ী শেকড় তৈরীর আবহ আজ সর্বক্ষেত্রে অনুপস্থিত। একটি ছবি নিয়ে দেখুন না! কত অসহায় এ জাতি এবং তার জাতিস্বত্ত্বার প্রাপ্তি।
পাশের বাড়ীর বাপুজি
অগ্রজদের বাবায়ে কওম
আমাদের জনক নয় কেন?
স্থায়ী বন্দোবস্ত! সেই হলো
তবে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে।

আবার স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে কতশত প্যাঁচাল, গবেষনা। রশি টানাটানি। নতুন নতুন ফর্মুলা। বাহারী চটকালো ইতিবৃত্ত এই ঘোষনা ও ঘোষনা পাঠকে নিয়ে।
ঘোষনার শুদ্ধ উচ্চারনের 
সেই মহাকাব্যিক সাতই মার্চ
হৃদয় নিংড়ানো ঘোষনা। 
জলপাইয়ের ঘোষনা!
 সেতো ঘোষনাপাঠ। 

অস্বচ্ছ্বতা সন্দেহ প্রবনতা অসহিষ্ণুতা সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্থলে খূঁটি গেঁড়ে বসেছে। পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ ও গনতান্ত্রিক ন্যুনতম সৌজন্যতাবোধ আজ উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যায়ের কোথাও খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। তাইতো গণতন্ত্র পুরুদ্ধারের নামে এদেশে কেয়ার টেকার নামের এক অস্বচ্ছ্ব জবাবদিহিহীন সরকার ব্যাবস্থার প্রবর্তন করতে হয়। 
তত্বাবধায়ক! স্রেফ কেয়ার টেকার
কার টেক কেয়ার! সরকারের!
জানিনা কোন মুসিবতের নাম
এই কেয়ার টেকার
সত্যই সেলুকাশ! 
কি বিচিত্র এই দেশ। 

এই সমস্ত অনিয়ম আর ছন্দ পতনের হাজারো উপকরন আজ এই সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে। তাইতো কবিকন্ঠ আজ স্তব্ধ। কিন্তু কেন? কোন ঘুর্ণাচলে কবি নীলকন্ঠ।কোন ঝাপটায় কবি মুহ্যমান।
কবিতায় নারী; কবির লালিত স্বপ্নের মৃন্ময়ী
নাহ! সেও আজ বিক্ষত দগ্ধ প্রতিপদে।
ক্ষুধার্থ হায়েনার এসিডে ঝলসানো মাংস
নারীর শরীরে আজ দগদগে ঘা।
সন্ত্রাস রাহাজানি ছিনতায় পরিণতি লাশ
লাগামহীন অনিয়ম নিত্য প্রতিদিন
রাজনীতির আঁচলে দুর্বৃত্ত হায়েনার শ্বাস
ওদের উন্মত্ত বিচরনে বাঙালীর 
চিরায়ত উঠান অন্তিম শয়নে। 

তবুও লিখে যেতে হবে। থেমে গেলে চলবে কেন? কবিতার অমিত হুংকার বেনিয়া রাজনীতিকে নাড়া দেবে। বিপর্যস্ত বিন্যাসকে সুবিন্যস্ত করার মানসে কবির পংতি গর্জে উঠবে। জাতীয় কবির  হুংকারে উজ্জীবিত হয়ে বাধার সমস্ত লৌহকপাট ভেঙ্গে কবি গেয়ে উঠবেন – 
“জাগো বাহে কুন্ঠে সবাই”। 

(কবিতার পংতিগুলি লেখকের“বিপর্যস্ত বিন্যাস”কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে)


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT