Main Menu

হোয়াইট কলার ক্রাইম বাড়ছে

নেই কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন। কার্যসাধন করতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকারও দরকার নেই। দরকার হয় না কোনো রক্তারক্তিরও। অপরাধী তার অপরাধযজ্ঞও চালায় নীরবে-নিভৃতে।

আর এই অপরাধের নাম হোয়াইট কলার ক্রাইম বা ভদ্রলোকের অপরাধ। এর সাথে সমাজের প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত, মার্জিত, শিক্ষিত, ক্ষমতাবান, উঁচু পদমর্যাদার ব্যক্তিরাই জড়িত থাকেন। শুধুই অর্থনৈতিক লাভের আশায় পরিকল্পিতভাবে অপরাধটি সংগঠিত হয়।

এতে প্রমাণাদি সহজেই গায়েব করা যায়। অর্থাৎ অপরাধীর কোনো চিহ্নই থাকে না। ফলে তাকে আইনের আওতায় আনাও দুরূহ। ফলশ্রুতিতে সমপ্রতি এ ধরনের অপরাধ প্রতিটি অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর হোয়াইট কলার ক্রাইমের মাধ্যমে অনেক ব্যক্তি বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছেন।

তবে এই টাকা বেশির ভাগই বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। আর সরকারি খাতেই সবচেয়ে বেশি হোয়াইট কলার ক্রাইম হয়ে থাকে। অপরাধীরা মূলত ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নামে-বেনামে সরকারি প্রকল্প বরাদ্দ, বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট, অর্থপাচার, নিরাপত্তা ও পণ্য জালিয়াতি, দলিল জালিয়াতি, ব্যাংক জালিয়াতি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, বিমা জালিয়াতি এবং স্বাস্থ্যসেবার জালিয়াতি ইত্যাদি।

এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যে ভেজাল মেশানো, পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি এবং ট্রেডমার্ক জালিয়াতি করে থাকে। কিন্তু দেশের পেক্ষাপটে এসব অপরাধকে গতানুগতিক অপরাধের পর্যায়ভুক্ত করে সাধারণ আইনে  বিচার করা হয়।

তবে আইনের পরিভাষায় এ অপরাধকে বলা হয় ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’ বা ‘ভদ্রলোকের অপরাধ’। আর এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বলা হয় হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল বা ভদ্রবেশী অপরাধী।

অপরাধ জঘন্য হলেও এর নেই কোনো আইনগত সংজ্ঞা। পেনাল কোড, সংবিধান ও আইনের কোনো শাখাতেই নির্দিষ্ট করে এই অপরাধের বর্ণনা ও সাজার উল্লেখ নেই। যার ফলে দেশের প্রতিটি সেক্টরে এ ধরনের অপরাধ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অপরাধ হিসেবে বিচার করায় আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।

ফলে দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রতিকার না থাকায় প্রতিনিয়তই ঘটছে এসব অপরাধ। বাড়ছে অপরাধীর সংখ্যা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র। বেপরোয়া হচ্ছে অপরাধীরা। হলমার্ক, বাংলাদেশ ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জি কে শামীম, যুবলীগ নেতা সম্রাট, পাপিয়া, এনু-রুপম, রিজেন্ট হাসপাতালে সাহেদ ও জেকেজির সাবরিনাও হোয়াইট কলার অপরাধীর সংজ্ঞায় পড়েন।

এছাড়াও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও ক্ষমতার বলে অনেকেই অপরাধের সাথে জড়িত হচ্ছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা হোয়াইট কলার ক্রাইম সংগঠন করেন তারা যে অপরাধী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই পৃথক আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এই অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুন্যাল গঠনের মাধ্যমে তাদের কঠোর শাস্তি প্রদান করার ব্যবস্থা করলে এ ধরনের অপরাধ দূর করা সম্ভব।

তা না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তেই থাকবে। গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সবাইকে হোয়াইট কলার অপরাধের দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে জানাতে হবে যেনো তারা প্রতিটি অবস্থানেই এই অপরাধকে প্রতিরোধ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে পারলে কমবে হোয়াইট কলার অপরাধ। কোনো ব্যক্তি দুর্নীতির সাথে জড়িত হলে, দ্রুত তদন্ত করে তার সকল অর্থ-সম্পত্তি ক্রোক করা হোক। এছাড়াও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

কালো টাকা যাতে দেশের বাইরে পাচার হতে না পারে সেজন্য এসব টাকা দেশীয় কল-কারখানা প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বেকারত্ব সমস্যারও কিছুটা সমাধান হয়।


বিশ্লেষকরা বলেছেন, সাধারণ অপরাধ এবং হোয়াইট কলার ক্রাইমের মধ্যে মৌলিক বা গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। যা আছে তা নগণ্য এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে। হোয়াইট কলার ক্রাইমকে যদি অপরাধের পর্যায়ে আনা হয়, তাহলে সাধারণ অপরাধের মতো হোয়াইট কলার ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধেও শাস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব।

তাই পৃথক আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এসব অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করার ব্যবস্থা করলে এ ধরনের অপরাধ দূর করা সম্ভব। আর তখনই কেবলমাত্র একটি সুখী-সুন্দর, শান্তিময় ও দুর্নীতমুক্ত দেশ গঠন করা সম্ভব— যে দেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি।

জানা যায়, ১৯৩৯ সালে সর্বপ্রথম হোয়াইট কলার ক্রিমিনালদের আসল অপরাধী এবং অপরাধকে দণ্ডবিধি আইনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন। করপোরেট অপরাধের প্রকৃতি উন্মোচন করেন প্রখ্যাত মার্কিন অপরাধ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাদারল্যান্ড।

তিনি আমেরিকার ৭০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে (কর্পোরেশনে) এ ধরনের জনস্বার্থ পরিপন্থী কর্মকাণ্ড উদঘাটন করেন। ‘হোয়াইট কলার অপরাধ’ তত্ত্বের উদ্ভাবকও তিনি। সাদারল্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে হোয়াইট কলার অপরাধ ধারণার একটি রূপরেখা প্রণয়নের প্রয়াস পান।

যেসব অপরাধ হোয়াইট কলার ক্রাইমের আওতায় পড়বে তা হলো—
ঘুষ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট, অর্থপাচার, নিরাপত্তা ও পণ্য জালিয়াতি, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, দলিল জালিয়াতি, ব্যাংক জালিয়াতি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, বিমা জালিয়াতি এবং স্বাস্থ্যসেবার জালিয়াতি ইত্যাদি। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যে ভেজাল মেশানো, পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি এবং ট্রেডমার্ক জালিয়াতি।

স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনায় অসদুপায় অবলম্বন, ট্রাস্ট ফান্ডের আত্মসাৎ এবং করপোরেট বা কর্পোরেশনের ব্যবসা ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয়, সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রীয় বেতার-টিভিসহ সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহে বিজ্ঞাপনে মিথ্যার আশ্রয়, ভুল তথ্য পরিবেশন এবং কন্ট্রাক্ট পাওয়ার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষপ্রদানকে হোয়াইট কলার অপরাধ ধরা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দুদক আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বলেন, আলোচিত মামলার অপরাধীদের দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা না গেলে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হবে। আর অপরাধীরাও তাদের অপরাধ জগতের বিস্তার ঘটাবে। অপরাধ ও অপরাধীর বিষয়ে জনগণকে সজাগ করে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাশীল করতে আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে হোয়াইট কলার অপরাধীরা। এসব অপরাধীদের বিচার হচ্ছে না বলেই অন্যরাও সাহস পাচ্ছে। হোয়াইট কলার অপরাধ যেহেতু বেড়েই চলেছে তাই এটার একটা আইনি রূপ দেয়া জরুরি, তা না হলে এই অপরাধ বাড়তেই থাকবে নির্মূল করা যাবে না।
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT