Main Menu

কথার চোরাবালি

রাশেদুল ইসলাম:  আমি সমাজের মানুষ । বিচ্ছিন্ন কেউ নই ।  তাই, সমাজের উল্লেখযোগ্য যে কোন  ঘটনা বা দুর্ঘটনা আমাকে স্পর্শ করে । ঘটনা কল্যাণকর হলে আনন্দে উদ্ভাসিত হই ।  দুঃখের হলে নীল রঙের বেদনা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে । কিন্তু দুঃখ বা কষ্টের না হয়ে, যখন কোন ঘটনা  অপমানের হয় !  লজ্জার হয় !  তখন কেমন লাগে আমার ? সত্যই  যখন কোন ঘটনা বা  দুর্ঘটনা  মনুষ্যত্বকে অপমান করে; সকলকে  মাথা নিচু করার অবস্থায় ফেলে দেয়, তখন আমার নিজের  অনুভূতি কেমন হয় ? গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সত্যই আমি তা বুঝতে পারিনি । কী  এক ধরণের অস্থিরতা যেন ! সেই অনুভূতি প্রকাশের ভাষা এখনও খুঁজে পাইনি আমি ।
মানুষের কথাবলার ক্ষমতা আল্লার বিশেষ  একটি নিয়ামত । মহান আল্লাহ তাঁর নিজের বাণী  পবিত্র  কোরআনে উল্লেখ করেছেন । মহানবী (সঃ) নিজের মুখে সেই বাণীগুলো বুঝিয়ে মানুষকে সহজ সরল পথে চলতে শিখিয়েছেন । কথা দিয়েই একজন মা সন্তানের প্রতি তার ভালবাসা প্রকাশ করে । একটি পাতানো বোনের  কথা রাখতে গিয়েই সম্রাট হুমায়ুনকে তাঁর রাজ্য হারাতে হয় । কথা না থাকলে মানুষের এই পৃথিবী এত সুন্দর হতনা । এমন মায়াময় হত না । অথচ,   এই মায়াবী কথার পরিণতি  যে কত  কদাকার হতে পারে; শতবর্ষে লালিত মানুষের প্রতি  মানুষের আস্থা যে কিভাবে নষ্ট হতে  পারে – তার বাস্তব প্রমান দেখতে সত্যই আমার মন প্রস্তুত ছিল না । 
আমার  লেখার শিরোনাম চোরাবালি । কথার চোরাবালি । চোরাবালি শুধু যে বালুরাশির মধ্যে থাকে,  তা নয় । জলাশয়েও থাকে । যেখানে চোরাবালি থাকে,  দূর থেকে সে জায়গার  সবকিছু  অনেক বেশী স্বাভাবিক মনে হয় । যেমন জায়গাটা  বালুময় হলে,   চোরাবালির জায়গা অনেক বেশী চিকচিক করে । জলাশয় হলে সেই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত ভাল দেখায় ।  কিন্তু সেখানে পা দেওয়ার সাথে সাথেই মানুষ বা যে কোন প্রাণী নিচে  তলিয়ে যেতে থাকে । কেউ যদি টেনে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে মৃত্যু অনিবার্য । তবে  কথা দিয়েও যে মানুষের জন্য চোরাবালির ফাঁদ পাতা যায়,  তার দুটি  বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছে বিগত কয়েক দিনে । এ ধরণের  কথার চোরাবালির কথা আমার ভাবনায় ছিল না । 
ভাল কথা বলা আমার নিজের একটা ব্রত । আমি টকশো করিনে । কিন্তু লিখি । ভালকথা যুক্তি দিয়ে লিখে আমি মানুষকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করতে চাই । কিন্তু কেউ যদি আমার মত একইভাবে ভাল কথা বলে মানুষের আস্থা অর্জন করে এবং সেই অর্জিত আস্থা ভাঙ্গিয়ে করোনা মহামারীর এই মহাদুর্যোগে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটিয়ে  নিজের ফায়দা লোটে ! আবার  দু’জনের একজন যদি উচ্চশিক্ষিত মহিলা হন  এবং তিনি যদি অতীব গুরুত্বপূর্ণ  দায়িত্বশীল পদে থেকে এই কাজ করেন; এবং অন্যজন যদি তাঁর কথার চোরাবালির ফাঁদে দেশের প্রায়  সকল সম্মানী মানুষকে জড়িয়ে ফেলেন !   তাহলে ?  তাহলে মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে কি করে ? 
করোনা মহামারি একটি আন্তর্জাতিক বিষয় । জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত প্রায় সকল দেশই করোনা মহামারিতে আক্রান্ত । একসময় বিটিভিতে প্রচারিত ‘আলিফ লায়লা’ যেমন গ্রামগঞ্জের প্রায় সকল মানুষ দেখতেন, করোনা মহামারির খবর মানুষ তার চেয়ে আরও বেশী আগ্রহ নিয়ে দেখেন ।  পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের মানুষই তা দেখে থাকেন । এ প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কি আমাদের দেশের জন্য মানহানিকর নয় ?  এই ঘটনা কি আমাদের সকলের মাথা নত হওয়ার মত নয় ? 
আসলে সত্যই আমি আমার লেখার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি । কোন দেশে সাধু এবং চোর যখন একই ভাষায় কথা বলে, তখন   এ দুটোর পার্থক্য হবে   কিভাবে ? মানুষ আমার কথাই বা বিশ্বাস করবে কেন ? আমি নিজেও তো একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে আছি ! 
আশার কথা এইযে,  যে কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার ভালমন্দ দুটো দিকই থাকে । যেমন চোরাবালি শুধু যে মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটায়  তা নয়; চোরাবালি আছে বলেই আমরা প্রাচীন ইতিহাস সম্মন্ধে  জানতে পারি । পৃথিবীতে এক সময় ডাইনোসর  নামক  বিশাল আকৃতির এক প্রাণী ছিল ।  এই ইতিহাস আমরা চোরাবালির কারণেই জানতে পারি । কারণ, চোরাবালিতে আটকা পড়ে যেসব প্রাণী মারা যায়, সেই মৃতদেহ কাঠামো অক্ষুন্ন থাকে । শতশত বছর অক্ষুন্ন থেকে একসময় সেই দেহকাঠামো পাথরে পরিণত হয় । এ ধরণের অক্ষুণ্ণ দেহকাঠামো পেয়েই মানুষ ডাইনোসর বিষয়ে  জানতে পারে । 
একইভাবে কথার চোরাবালির ফাঁদ নিয়ে বর্তমানে যেসব  ঘটনার জন্ম হোল, তা যত  অপমানজনকই হোক না কেন, সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে ।  কথায় বলে,  ‘ভুল করার মধ্যে কোন ভুল নেই; যদি সেই ভুল আবার না করা হয়’ ।  পবিত্র কোরআন এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে যে কোন পরিস্থিতিতে মানুষকে  হতাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে । এসব পরিস্থিতিতে মানুষকে ধৈর্য ধরে নিজের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে । আসুন আমরা তাই করি । নিজেদের সহজাত বিচারবুদ্ধি দিয়ে সাধু ও শয়তানের পার্থক্য করা শিখি । নিজেদের হতাশামুক্ত করি ।
প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব যাদের; তাঁরা এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন- এই প্রত্যাশা সকলের । 
ইতোমধ্যে  আমাদের অতিপ্রিয়জনসহ অন্যান্য যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন;  তাঁদের সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি ।  মহান আল্লাহ তাঁদের পরিবারের সকলকে এই শোক কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দিন ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন । আমিন । 
মোহাম্মদপুর, ঢাকা । ১৭ জুলাই, ২০২০  । 
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT