Main Menu

সময়ের ঠিকুজি

জালাল উদ্দিন আহমেদ: ইদানীং সময়টা ভাল যাচ্ছে না আমাদের। চারিদিকে কেমন যেন ঘোট পাকিয়ে যাচ্ছে সব। রাজনীতির অসন্তোষ সাধারন মনুষকে রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। শাসন নীতির দলকানা অসহিষ্ণুতায় আজ জনপদে আহাজারীর প্রচ্ছন্ন আভাস। ব্যবসায় নীতির রাজনৈতিক সিন্ডিকেট আজ মানব জীবনকে তার প্রত্যহ জীবনাচারে অসহায় গিনিপিগ বানিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবসায়ী আচরনের প্রদুর্ভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। সর্বোপরি সমাজ নীতিতে মাসলম্যান দাদাগিরির নিরঙ্কুশ আধিপত্য আজ সমাজ তথা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ঘুনে ধরা উইপোকার ঢিপিতে পরিণত করেছে। 
রাজনীতির কাইজ্যা ফ্যাসাদ সেই জন্মলগ্ন থেকেই শুরু। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট বাংলাদেশ যখন তার আপন অস্তিত্বে মহান নেতার নেতৃত্বে হাঁটি হাঁটি পা পা করে পথ চলা শুরু করেছে ঠিক তখনই রাষ্ট্র ব্যবস্থার আদল পরিবর্তনের ডাক দিয়ে তাঁরই নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগঠনের একটি অংশ প্রকাশ্য বিরোধিতায় সামিল হয়। এবং সেই বিরোধিতা সামলাতে গিয়ে সে সময় যে সামাজিক বিপর্যয় হয়েছিল তার কমবেশী ভুক্তভোগী আমরা সবাই। রাজনীতির এই মেরুকরনের অসন্তোষ সামাল দিতে গিয়ে অনেক অপ্রিয় সিদ্ধান্তও সে সময় বঙ্গবন্ধুকে নিতে হয়েছিল। তবে রাজনীতির কতিপয় উচ্ছিষ্ট পাকিস্থানী প্রেতাত্মার কষা ছকে পা দিয়ে আমাদেরই সন্তানেরা তাদের মহান নেতাকে স্বপরিবারে হত্যা করলো। দেশে শাসন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার আগে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়া জাতির সামনে ত্রাতা হয়ে এলেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হলেও সময়ের আবর্তে তিনি রাজনীতিতে পাকিস্থানী খোলস পরে নিজের পথ চলা শুরু করলেন। তিনিও এক সময় উচ্চাভিলাষীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হলেন। রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির এহেন কুজ্ঝুটিকার পথ পরিক্রমায় এক ধান্ধাবাজ জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের আবির্ভাব ঘটে। রাষ্ট্র ক্ষমতা জবর দখলের পর রাজনীতির খায়েসে তিনিও মাঠে নেমে পড়েন। ধর্মতত্বের আলখেল্লা গায়ে দিয়ে তিনি দেশের মানুষের সামনে আরাম আয়েস ও বিত্ত বৈভবের বীজ রোপন করলেন। পাকিস্থানী মদতে ও মধ্যপ্রচ্যের ধনকুবের দেশগুলির অঢেল সাহায্যে বাংলাদেশের মানুষ তখন এক নতুন স্বপ্নে নিজেদেরকে সাজাতে ব্যস্ত। কিন্তু সচেতন বাঙালী যখন বুঝতে পারলো এ উজ্বলতা সাময়িক এবং দেশের বুনিয়াদ সৃষ্টিতে এটা কখনোই সহায়ক হবে না। ঠিক তখনই পিতার কন্যা ও মুক্তিযোদ্ধা জেনারেলের বিধবা জায়া রাজপথে নেমে এই ধান্ধাবাজ জেনারেলকে গদিচ্যুত করলো। কিন্তু ততদিনে বাংলার রাজনীতির উঠানে “নারায়ে তক্বীর”এর শ্লোগানধারীরা বেশ শক্তভাবেই নিজেদের ভিত স্থাপন করে ফেলেছে। পাশাপাশি বাংলার রাজনীতির ধারাকে দ্বিধা বিভক্ত করে তা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিতও করে ফেলেছে। ফলে যা হওয়ার ঠিক তাই হলো। দেশের রাজনীতির কাঠামো দুটি সুষ্পষ্ট মেরুতে অবস্থান নিল। 
আমাদের প্রাত্যহিক জীবন ধারাকে অতিষ্ট করে রেখেছে এই দুটি পক্ষ। ভাল কে ভাল এবং মন্দকে মন্দ বলার সাহস আমরা হারিয়ে ফেলছি। দুরাচারী দুঃশাসনের আবর্তে পড়ে রাজনীতির ক্ষমতাধরদের শত অপকর্মের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আজ আমজনতার নাই বললেই চলে। যে রাজনীতি মানুষকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার ও অপকর্মের বিরুদ্ধে যুথবদ্ধ হয়ে তার প্রতিকারে সোচ্চার হওয়ার মন্ত্র শিখিয়েছে;সেই রাজনীতি আজ সমাজে বিভক্তি রেখা টেনে নিজেদের চেয়ার তথা ক্ষমতাকে পোক্ত করার মচ্ছবে হোলি খেলায় মেতেছে। রাজনীতির শিষ্টাচার আজ পুলিশি তান্ডব ও মাসলম্যান দাদাদের হাতের পুতুল হয়ে সমাজে এক ভীতিকর অবস্থার জন্ম দিয়েছে। 
প্রতিক্ষনে এক অজানা আশংকাকে জিইয়ে রেখে আমাদের এই পথচলা। আমরা আজ দিশেহারা পথভ্রষ্ট পথিক হয়ে অজানা গন্তব্যের দিকে ধাবমান। কেনইবা বলছি তাও জানি না। কেইবা আমাকে এই বলার প্রেরনা দিচ্ছে! হাঁ, একজন তো আছেন। যার অঙ্গুলি নির্দেশে আমরা পৃথিবীর শক্তিধর সামরিক বাহিনীকে তোয়াক্কা করিনি। নিজেদের জান,মান,ধন কোরবানী দিয়ে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা বাঙালীরা বার বার হোঁচট খাচ্ছি আবার পর মুহূর্তেই উঠে দাঁড়াচ্ছি। এই দাঁড়ানোর স্ফুরনটা এসেছে আমার পুর্ব পুরুষের মাথা উঁচু করে চলার সেই রক্ত প্রবাহ থেকে। আমরা নেতাজীকে পেয়েছি। দেখেছি মওলানা ভাসানীকে। আমরা পেয়েছি সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধুর মত এক দৃঢচেতা অকুতোভয় মহা নায়ককে। পেয়েছি দিশেহারা বাঙালীর সলতেই আগুন জ্বালানো জিয়াউর রহমানের মত এক অকুতোভয় সৈনিককে। সময়ের ডাকে বাঙালী সময়েই জেগেছে। আমরা তো তিতুমীর সুর্যসেন ক্ষুদিরামদের রক্তের পরম্পরা। আমরা সেই নুর হোসেন জেহাদদের ভুলি কেমন করে! আজকের মিশ্রিত এই মেকী উঠানে সত্যিই এই নুর হোসেন জেহাদ কিংবা ডাঃ মিলনদের খুব প্রয়োজন। প্রয়োজন মোঃ হানিফ, আহসান মাষ্টারের মত দেশপ্রেমিক মানুষজনের। 
বজ্রকন্ঠের তর্জনী উঁচানো সেই মহা নায়কের উত্তর সুরীরা আজ খড়কুটো কুড়ানো টোকাইয়ের মত তাঁর অস্তিত্বের আঁতুড় ঘরকে উইপোকার ঢিপি বানিয়েছে। আর অবশিষ্টেরা উচ্ছিষ্টের খোঁজে আবোল তাবোল বকে বেড়াচ্ছে। সত্যিকার অর্থে বাঙালী কি আজ বাঙালীত্বে আছে? ছোটবেলায় ২২ পরিবারের কথা শুনেছিলাম। এখন তো শুনতে হচ্ছে ২২’শ পরিবারের কথা। তাহলে উন্নতি যে একটা হয়েছে তা বলা যেতেই পারে! একটা সময় ছিল যখন এক’শ বা পাঁচ’শ কোটি টাকা সাহায্যের আশায় বিদেশীদের দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে বেড়াতাম আমরা। আর এখন তো হাজার হাজার কোটি টাকা আমার পকেট থেকে বেরিয়ে গেলেও অশীতিপর রাবিশ মার্কাওয়ালা অভিভাবকের মুখে “ওসব সামান্য টাকা” শুনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। একমুখী দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ফলে প্রতিদিন প্রিয়তম বন্ধুর সীমান্তরক্ষীর গুলিতে দু-একজন করে বাঙালী নিহত হলেও আমরা টু শব্দটি পর্যন্ত করতে পারিনা।  
 ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির একমাত্র প্রদীপ আওয়ামী লীগের আঁতুড় ঘরে আজ রাজনীতির উচ্ছিষ্টরা ঢুকে বঙ্গবন্ধুর সাজানো বাগানকে তছনছ করে দিচ্ছে। আম জনতা অসহায়ের মত তাদের লালিত স্বপ্নের মহানায়কের ঘরের চালে শকুনের আনাগোনায় শংকিত হয়ে আজ দিশেহারা। আমরা হাঁটছি কোন্ পথে? কোন্ অজানা আশংকায় প্রতিনিয়ত প্রমাদ গুনতে হচ্ছে আজ বাঙালীকে? 
ঝড় উঠলে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাঙালী তার উঠানে দাঁড়িয়ে আযানের ধ্বনি দিয়ে বা শাঁখ বাজিয়ে পরিপাশকে সৃষ্টিকর্তার সহয়তা পাবার প্রেরনায় জাগ্রত করে। আমরা সেই আযান বা শঙ্খ ধ্বনি শোনার অপেক্ষায় রইলাম যেমনটি শুনেছিলাম একাত্তরের ৭ই মার্চে এক মহানয়কের মুখ থেকে কিংবা তাঁরই নির্দেশনায় ২৭ মার্চে এক অখ্যাত সৈনিকের ঘোষনাপাঠে।   


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT