Main Menu

মানুষে মানুষে পার্থক্য

রাশেদুল ইসলাম: কাজটি আমার নিজের । একটি বিষয়ের জন্য আবেদন করি আমি । আবেদনের পর পরই  করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। অফিসের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় । এই জুন মাসে  সীমিত আকারে অফিসের কাজকর্ম শুরু হলে আমি সেই অফিসে যোগাযোগ করি  । অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান,  আমার দেওয়া সব কাগজপত্রের  ফটোকপি পাওয়া গেছে ।  এগুলোর মূলকপি না হলে কাজ হবে না ।  আমি গাছ থেকে পড়ি । আমি নিজেই আমার মূল কাগজপত্র জমা  দিয়েছি । ফটোকপি থাকার কথা নয় । অবশ্য এসব কথা বলে  লাভ নেই । দুই দিনের মধ্যে মূল কাগজ জমা না দিলে কাজটা হবে না । 
মূল কাগজের একটি অংশ এজি অফিসের । আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথা বলি । তিনি সেখানে সদ্য যোগদান করেছেন । আমি যে সময়ে আবেদন করি,  তখন তিনি বর্তমান পদে ছিলেন না । তাই, তাঁর পক্ষে আগের তারিখের স্বাক্ষর দেওয়া সম্ভব নয় । তবে  আমার জরুরী প্রয়োজন বিবেচনায়  তিনি একটা ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান । সত্যিই সেই অফিসার একদিনের মধ্যে তাঁর আগের অফিসারের  স্বাক্ষর যোগাড় করে দেন । আমার যে অফিসে কাজ ছিল সেই অফিসের   ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মূলকাগজপত্রের ভিত্তিতে  যথানিয়মে আমার কাজটি করে অফিস আদেশ  ইমেলে পাঠিয়ে দিয়েছেন । আমার আর কোথাও  যাওয়া লাগেনি । আমি নিজেও এই জটিল সমস্যা এত দ্রুত এমন ভাবে নিস্পত্তি হবে -  আশা করিনি । 
অনেকেই  বলতে পারেন  আমার পদমর্যাদার  কারণেই এই   কাজটি এত দ্রুত এমন ভাবে করে নেওয়া  সম্ভব হয়েছে ।   তবে, আমি নিজে এই কথার  সাথে পুরোপুরি একমত নই । কারন,যারা আমার কাগজপত্রের ফটোকপি রেখেছেন, তারাও কিন্তু আমার পদমর্যাদা ও  অবস্থান ভালমত জেনেই তা করেছেন । আমি মনে করি,  আমার ভাগ্য এখানে একটা বড় ভুমিকা পালন করেছে । আমার সৌভাগ্য হয়েছে এমন দুইজন মানুষের সন্ধান পাওয়া, যারা অন্য মানুষকে সাহায্য করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকেন । এখানে দুই শ্রেণীর মানুষ লক্ষণীয় । এক শ্রেণির মানুষ অন্য মানুষকে ঝামেলায় ফেলে মজা লুটতে চান । আর এক  শ্রেণির মানুষ  অন্য মানুষের ঝামেলা  মেটাতে  চান । 
১৯৮৯ সালের কথা। আমরা ৪ জন কর্মকর্তা একটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করি ।  ৪ জনই   প্রথম শ্রেণির গেজেটেড  কর্মকর্তা । তখন অফিসে কম্পিউটার বা  ফটোকপিয়ার  মেশিন ছিল না ।  যে কোন সনদপত্র বা মার্কশিট হুবহু টাইপ মেশিনে টাইপ করা হত । এ ধরণের  হুবহু টাইপ করা সনদপত্র বা মার্কশিট প্রথম শ্রেণির গেজেটেড  কর্মকর্তা দ্বারা সত্যায়ন করা  অত্যাবশ্যক ছিল । কারণ, সত্যায়ন করা না হলে  কারো  ভর্তি বা চাকুরীর কোন আবেদনপত্র গ্রহন করা হত না  । তাই, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে  আবেদনকারীর ছবি, সনদপত্র বা মার্কশিট সত্যায়ন করার জন্য অনেকে আসতেন । সত্যায়ন করা কোন দাপ্তরিক কাজ নয় । তাই, অনেকেই এটা করতে চাইতেন না । আমাদের ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই সত্যায়ন না করার পক্ষে ছিলেন । একজনের বক্তব্য খুবই পরিস্কার । তিনি ছাত্রজীবনে অনেক গেজেটেড কর্মকর্তার দারে দারে ঘুরেছেন । কেউ সত্যায়ন করতে চান নি । এ বিষয়ে তিনি নিজে  কারো সাহায্য পান নি; এ কারণে অন্য কাউকে কোন সাহায্য তিনি  করবেন না ।  আর একজনের বক্তব্য ছিল, সত্যায়ন করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ । তাঁর এক আত্মীয় একটা সত্যায়ন করে বিপদে পড়েন । সে ঘটনারও বর্ণনা দেন তিনি । তিনি জানান,   তাঁর আত্মীয় যার ছবি সত্যায়ন করেন, তিনি প্রকৃত পক্ষে একটা মামলার আসামী ছিলেন । তিনি (সেই আসামী) ছবির পিছনে নিজের নাম না লিখে,  অন্য একজনের  নাম লিখে সত্যায়ন করান । পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে গেলে, তিনি সেই  সত্যায়িত ছবি দিয়ে দাবী করেন যে, তিনি সেই আসামী নন । অনেক পরে বিষয়টি ধরা পড়ে । তখন সত্যায়নকারি কর্মকর্তার ডাক পড়ে । সামরিক শাসনের আমলে সেই অপরাধে তাঁর আত্মীয়কে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় । এই কারণে তিনি (২য় জন) নিজে  কারো ছবি বা কোন কিছু সত্যায়ন করতে চান না ।  ৩য় অফিসারের বক্তব্যও পরিস্কার । তিনি জানান কোন কিছু করা বা না করা নির্ভর করে তাঁর নিজের ইচ্ছের উপর । তিনি দেখবেন,  এ কাজে তাঁর নিজের কোন লাভ আছে কিনা । যদি তাঁর নিজের কোন লাভ না থাকে,  তাহলে সে কাজ তিনি করবেন না । এ বিষয়ে আমার  যুক্তি ছিল আমি নিজে  যে কারণে কষ্ট পেয়েছি, সেই একই কারণে অন্য কেউ  যেন কষ্ট না পায় । ছাত্রজীবনে সত্যিই সত্যায়ন করা নিয়ে আমার নিজের অনেক ভোগান্তি হয়েছে । এ কারণে আমি চাইনি  সত্যায়ন করা নিয়ে আর  কারো ভোগান্তি  হোক । আর বিপদে পড়ার জন্য কোন কারণ লাগে না । অধিকাংশ মানুষ বিপদে পড়ে কারণ ছাড়াই । যেমন,  একজন পা পিছলে পড়ে কোমর ভেঙ্গে যেতে পারে   । রাস্তায় দুপক্ষের মারামারির মধ্যে পড়ে মাথায় ইটের আঘাত পেতে পারে  । ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে  সর্বস্বান্ত হতে পারে  -  এসবের কি কারণ থাকতে পারে ? তাই, সেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে  অঘোষিত ভাবে সব সত্যায়ন করার দায়িত্ব পড়ে  আমার উপর  ।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার একজন রুমমেট ছিলেন । তিনি তাঁর বাবাকে নিয়ে দুঃখ করতেন । তাঁর বাবা সরকারি  অফিসে চাকুরি করলেও  ঘুষ খেতেন না । তাই  তাঁদের  পরিবার  অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে আছে । এ কারণে, তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ চাকুরি জীবনের শুরুর দিন থেকে ঘুষ খাওয়া । দুর্ভাগ্যবশত  তিনি তাঁর বাবার মত  কোন সরকারি চাকুরি পান নি । বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন তিনি । কৌতূহলবসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেখানেও তিনি সব সময় তাঁর ছাত্রজীবনের সেই  লক্ষ পূরণে  সচেষ্ট থেকেছেন ।  
এখানে এসব  উদাহরণ উল্লেখ করার কারণ এটা বোঝাতে চাওয়া যে, অধিকাংশ মানুষ কাজ করে তাঁর পূর্ব ধারনা থেকে । তিনি কোন বিষয়ে কি কাজ করবেন,  তারও একটি পূর্ব ধারণা থাকে । এই পূর্ব ধারণার বাইরে কেউ যেতে চান না । তাঁর পূর্ব ধারণা ঠিক কি-না বা পূর্ব  ধারণা ঠিক না হলে,  সঠিক করনীয় বিষয় কি হতে পারে – এসব নিয়ে  কেউ ভাবতে চান না । আর প্রত্যেকের ব্যক্তিগত এই  অনমনীয়  পূর্ব ধারণার কারণেই   একজন মানুষের সাথে অন্য মানুষের আকাশ পাতাল  পার্থক্য হয়ে যায় । 
এখন প্রশ্ন,  মানুষের পূর্ব ধারণার উৎস কি  ? কোথা থেকে মানুষের পূর্ব  ধারণা জন্মে ?  
আমি আমার নিজের কথাই বলি । আমি আগেও কয়েকটি লেখায় উল্লেখ করেছি যে,  আমার মা আমার মৌলিক কয়েকটি গুণের উৎস ।  ছেলেবেলায়  আমি কিভাবে যেন চাইনিজ দার্শনিক কনফুসিয়াসের  ভক্ত হয়ে পড়ি । তাঁর একটা  বিখ্যাত উক্তি,’তুমি নিজের   জন্য যা পছন্দ করো না;  অন্যের জন্য তা করো না’ । কথাটা আমার মনে গেঁথে যায় । আমি নিজের হাসি- কান্না – দুঃখের অনুভূতি  দিয়ে অন্যের  হাসি- কান্না- দুঃখ অনুভব করার  চেষ্টা করি । আমার স্ত্রীর বড় দুঃখ আমি নিজে যখন মাছ বা মাংসের টুকরা নিই, তখন সবচেয়ে ছোট টুকরাটি নিই । আমি যে  ছোট টুকরাটি পছন্দ করি তা  কিন্তু নয়; আমি নিজের জন্য ছোট টুকরোটি পছন্দ করিনে বলেই আমি  সেটা নিয়ে থাকি  । এটা আমার ছেলেবেলার সেই  কনফুসিয়াসের শিক্ষা থেকে নেওয়া ।  অথচ, মজার ব্যাপার আমি বড় হয়ে জেনেছি,  এটা বোখারি শরিফের একটা হাদিস । ’তুমি নিজের  জন্য যা পছন্দ করো না, অন্যের জন্য তা করো না’ । আমি নিজেও অন্যদের সাথে ছোটকালে মক্তবে আলিফ, বা, তা, ছা পড়েছি; কিন্তু সেখানে বোখারি শরিফের মৌলিক এই হাদিসের শিক্ষা আমাকে দেওয়া হয়নি । 
   আমি আবার সেই জেলা প্রশাসনের গল্পে ফিরে যাই। আমরা ৪জন নতুন কর্মকর্তা। সার্কিট হাউজে থাকি । সার্কিট হাউজের বাবুর্চি আমাদের খাবার পরিবেশন করেন ।  প্রথম রাতের খাওয়া । লোভনীয় রুই মাছের ঝোল । মাছের  মাথাটা বেশ দর্শনীয় । আমাদের একজন টুপ করে মাছের মাথাটি নিজের পাতে নিয়ে মুচকি হাসি দেন । তিনি যা বলেন তার সারকথা এই যে, তিনি খুব আদরে বড় হয়েছেন । বাড়িতে সব সময় মাছের মাথা খেতে অভ্যস্ত । তাই তিনি এখানেও  মাছের মাথাটি নিবেন । আমরা যেন কিছু মনে না করি । তিনি একটি সুশিক্ষিত উচ্চবংশের সন্তান । তাঁর পরিবার থেকেও কনফুসিয়াস বা  বোখারি শরিফের  ঐ হাদিসের শিক্ষা তাঁকে  দেওয়া হয়নি । আবার মক্তবেও এই শিক্ষা দেওয়া হয় না । আমাদের হুজুরগণ আরবী ভাষা শেখাতে আগ্রহী হলেও,  ধর্মের মৌলিক বিধান শেখাতে তেমন আগ্রহী নন মনে হয় । ফলে, একজন মানুষের পূর্ব ধারণা ধর্ম বা আদর্শ ভিত্তিক হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয় না । একটি পরিবারের পাওয়া না পাওয়া, বা  ব্যক্তি মানুষের  পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব থেকেই আমাদের সমাজে  মানুষের পূর্ব ধারণার জন্ম হয় – যা মানুষে মানুষে ব্যাপক পার্থক্যের কারণ ঘটায় ।  
তবে  মানুষের পূর্ব ধারণা স্থায়ী কোন বিষয় নয় । যে কেউ নিজের শিক্ষাদীক্ষা এবং  সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে খুব সহজেই পূর্ব ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন । নিজের স্বার্থপরতা কাটিয়ে মানব কল্যাণে কাজ করতে পারেন । এটা শুধু যে একজন ব্যক্তি পারেন তা নয়; গোটা একটি প্রতিষ্ঠানও তা  করতে পারেন । আর একটি প্রতিষ্ঠান যে পারেন,  তার বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশ পুলিশ । করোনা প্রাদুর্ভাবের এই মহাসংকটকালে বাংলাদেশ পুলিশ তার পূর্ব ধারণার খোলনলচে  একেবারে বদলে ফেলেছেন । এখন শতাব্দীর একটি বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠানের  নাম বাংলাদেশ পুলিশ । এই করোনা সংকটকালে ফ্রন্ট লাইনে কাজ করছেন পুলিশ । তাঁরা যতবেশী করোনায়  আক্রান্ত হচ্ছেন;  তত বেশী  মানবসেবার ব্রত নিয়ে মাঠে কাজ করছেন তাঁরা ।  এটি রীতিমত বিস্ময়কর ! এখানে হেমিলনের বাঁশিওয়ালার  মত ভূমিকা রাখছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে  ।
আমি বলছিলাম ব্যক্তি পূর্ব ধারণার কথা । আপনি আমি কিন্তু খুব সহজেই এই দুর্বলতা কাটিয়ে  উঠতে পারি । আমরা পারি আমাদের স্বার্থপরতার গণ্ডি পার হয়ে,  একটু মানবিক হতে  । পারি গণমানুষের এই দুঃসময়ে কোন না কোনভাবে  কাজে লাগতে ।
সকল প্রকার করোনা যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা । 
মোহাম্মদপুর,  ঢাকা, ২৭ জুন, ২০২০ ।  


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT