Main Menu

করোনাযুদ্ধে বৃটেন এবং তার জনতার অবাধ্য আচরন

মোঃ শফিকুল আলম: বোরিস জনসনের তর্জন-গর্জন বৃটেনে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা লুকোতে পারছেনা। প্যানডেমিকের শুরুতে বুঝে ওঠার পূর্বেই অনেক আক্রান্ত হয়েছে বা মৃত্যুবরন করেছে তার সত্যতা ছাপিয়ে এখন মৃত্যু বা আক্রান্তের সংখ্যা বরং বেশি। হিটলারের বিমান বাহিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোম্বিং করে ৮ মাসে ৪৩,০০০ সাধারন বৃটিশ নাগরিক হত্যা করেছিলো। অথচ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত করোনাক্রান্ত হয়ে অফিসিয়াললি ৪৩,২৩০ জন বৃটিশ নাগরিক ৬ মাসে মৃত্যুবরন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা হবে ৬৫,০০০।

হাজার হাজার প্রতি সপ্তাহে এখনও টেস্ট-পজিটিভ হচ্ছে এবং প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন মৃত্যুবরন করছে। পার কেপিটা হিসেবে বৃটেনে আক্রান্তের এবং মৃতের সংখ্যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের থেকে বেশি।

কেয়ার হোমসগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। যদিও সরকারের ঘোষনা ছিলো এইজড্ কেয়ার হোমসএ একটি প্রতিরক্ষাবুহ গড়ে তোলা হবে যেহেতু বয়স্ক লোকেরা করোনাভাইরাসের কাছে সবচাইতে ভালনারেবল। কিছু কিছু পরিসংখ্যানে দেখা যায় কেয়ার হোমসগুলোতে মার্চ থেকে ১৪% মানুষ মৃত্যুবরন করেছে। স্বাভাবিকভাবে এই সময়ে মৃতের সংখ্যা ৬% এর নীচে থাকার কথা।

বৃটেনের করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এই ব্যর্থতা ব্যাপক। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন বর্তমান মন্ত্রীপরিষদ এবং সিভিল ব্যুরোক্র্যাটদের এই ব্যর্থতার কারনে অপরিহার্য্যভাবে পার্লামেন্টারি এনকোয়ারি ফেইস করতে হতে পারে। প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রীপরিষদ কি প্রাথমিক ভুল সংশোধন করতে সক্ষম না হয়ে শুধু ধারাবাহিকভাবে ভুলই করে যাচ্ছেন?

সংক্রমনের হার জুন মাসের প্রথমার্ধে অবশ্য কমে এসেছে। মে মাসের প্রথমার্ধে সংক্রমনের সংখ্যা ছিলো ৭০,০০০ যা’ জুনের প্রথমার্ধে নেমে আসে ২২,০০ এ। প্রতিদিন ২%-৪% হারে সংক্রমন কমছে। চার সপ্তাহ পূর্বে ইংল্যান্ডের প্রতি ৪০০ জন টেস্ট করলে অন্তত ১ জন পজিটিভ পাওয়া যেতো। কিন্তু জুনের প্রথমার্ধে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী’র ভাষ্যানুযায়ী প্রতি ১,৭০০ জনে একজন পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে।

টোরী ব্যাকবেন্চার এমপিগন অবশ্য সোস্যাল ডিসট্যান্সিং বিধিনিষেধ শিথিল করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চাপ প্রয়োগ করছেন। এমপিদের ধারনা এবং ভয় যদি অর্থনীতি পুরোমাত্রায় চালু না করা যায় তবে বৃটেন অনুমিত অর্থনৈতিক মন্দার থেকে অধিকতর ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দায় পতিত হবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারকে এই মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যদি এখন তারা ব্যবসায়-বানিজ্য শুরু করতে না পারে তবে তারা আদৌ শুরু করবেনা।

বোরিস জনসন চিকন রশির ওপরে হাঁটছেন। একদিকে জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করন অপর দিকে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যেসব দেশে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেরী করেছে তারাই মূল্য দিচ্ছে। সরকারগুলোও বেকায়দায় আছে। আবার অস্ট্রেলিয়ার মতো যেসব দেশ জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে যেমন সফলভাবে করোনা নিয়ন্ত্রন করতে পেরেছে তেমন দ্রুত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু করতেও সক্ষম হয়েছে। এবং সরকার প্রধানও অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তায় রয়েছেন। গত সপ্তাহে অবশ্য বোরিস জনসন মনোস্থির করে বলেছেন বৃটেনে ৩ মাসের লকডাউন শেষ হতে চলেছে।

বোরিস জনসনের এই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে অনেকে জুয়া খেলার সাথে তুলনা করেছেন। জনগন অবশ্য বিচার করবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ক’জন মানুষকে ভাইরাস থেকে রক্ষা করে আবার অর্থনীতি কতোটা গতিশীল করে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ০৪ জুলাই থেকে হোটেল, মিউজিয়াম, চার্চ, থিম পার্ক এবং হেয়ারড্রেসার বিজনেজ যথারীতি চালু হবে। একই সাথে বৃটিশদের প্রিয় রেঁস্তোরা এবং পাব খুলে দেয়া হবে। মি: জনসন স্বাস্থ্যবিধিও শিথিল করে পারষ্পরিক ২ মিটার দুরত্ব বজায় রাখার পরিবর্তে ১ মিটার করেছেন।

৬ সপ্তাহ পূর্বে বৃটেনের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স জনগনের উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করছিলেন যে পারষ্পরিক দু’জনের ২ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ১ মিনিট অবস্থান এবং ১ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ৬ সেকেন্ড অবস্থান একই পরিমান ঝুঁকি তৈরী করে। 
কিন্তু গত সপ্তাহে মি ভ্যালেন্স এবং প্রধান মেডিকেল অফিসার ক্রিস হুইটি শর্ত সাপেক্ষে ১ মিটার দূরত্ববিধি অনুমোদন করেছেন। শর্তগুলো হচ্ছে ফেইস-মাস্ক পরিধান করা, রেঁস্তোরা, পাব এবং অফিসে নতুন সিটিং লে-আউট করা এবং ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস স্ক্রীন দিয়ে প্রটেকটিভ কাউন্টার করতে হবে। তবে তাঁরা দু’জনেই সতর্ক করে বলেছেন যদি জনগন মনে করে সংক্রমনের ভয় চলে গেছে এবং সরকারের উপদেশ অনুসরন না করে তা’হলে সংক্রমনের হার সন্দেহাতীতভাবে বেড়ে যাবে।

সিএমও মি: হুইটি বলেন, “এই যাত্রা দীর্ঘতর হতে যাচ্ছে। আমি আশ্চর্যান্বিত হবো কিন্তু আনন্দিত হতাম আমরা আগামী শীতে বা আগামী বসন্তে  যদি বর্তমান আমাদের এই পরিস্থিতি ফেইস করতে না হতো।”

বর্তমানে বৃটেনে ইনফেকশনের হার ০.৭ এবং ০.৯ কিন্তু লন্ডন, মিডল্যান্ডস এবং নর্থ ওয়েস্ট ইংল্যান্ডে এই হার ১ (রেট বলতে এক জন মানুষ কতোজনকে সংক্রমিত করতে পারে)। এই হার ১ এর নীচে রাখতে হবে।

ডাউনিং স্ট্রীট দু’টি কৌশলে এই মহামারী মোকাবেলা করার প্রত্যাশা করছে: যথাযথ বিধি অনুসরন করতে জনসাধারনের মাঝে বিশ্বাস তৈরী করা এবং টেস্ট, ট্রাক এবং আইসোলেশন অব্যাহত রাখা। দু’টি কৌশলই সব দেশে প্রথম থেকেই নেয়া হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এর বাইরে কোনো ফলদায়ক কোনো কৌশল নেই।

গত বুধবারে হাজার হাজার মানুষ সামাজিক দূরত্বের বিধি মানতে অনেকটা প্রকাশ্যে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে। সাউদার্ন ইংল্যান্ডের বার্নিমাউথ বীচে মানুষের প্লাবন বইতে দেখা গেলো। মাত্র যখন মি: জনসন জনগনকে সতর্কতার বানী শুনিয়ে অর্থনীতি রিওপেন করার ঘোষনা দিলেন আর তখনই ইংল্যান্ডের জনগনের এহেনো আচরনে বিশ্ববাসী অনেকটা অবাক হয়েছে। আবার একইভাবে তারা বীচে মানুষ দ্বারা বৃহস্পতিবারেও পরিপূর্ণ ছিলো।

স্থানীয় কাউন্সিল লীডার ভিকি স্লাড বলেন, “আমরা বীচের দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়েছি। দায়িত্বহীন আচরন এবং কর্মকান্ডে আমরা ব্যথিত হয়েছি। নাগরিকদের দায়িত্বহীন আচরনে সকলের জীবনকে নিরাপদ রাখতে কাউন্সিলকে হিমশিম খেতে হয়েছে।।”

ইউগভ পরিচালিত মতামত জরিপে দেখা যায় বৃটেনের জনগনের বিশ্বাস  লকডাউন খুব দ্রুত শিথিল করা হয়েছে। একই জরীপে আরও দেখা যায় মাত্র ২১% মানুষ বৃটেনে মাস্ক পরিধান করে যখন ফ্রান্সে ৭৯% এবং জার্মানে  ৬৪%।
অপর সমস্যা হচ্ছে ট্রাকিং এবং ট্রেসিং। মি: জনসন মে মাসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ০১ জুনের মধ্যে বৃটেনের ট্রেসিং সিস্টেম হবে ওয়ার্ল্ড-বিটিং। অথচ টেকনিকাল ডিফিকাল্টিজের জন্য সরকার এই ট্রেসিং এ্যাপ তৈরী করার প্রকল্প পরিত্যাক্ত রেখেছে। এই সিস্টেম ডেভলপ করা শীতের আগে সম্ভব নয় যখন বিশেষজ্ঞগন দ্বিতীয় ওয়েভের আশংকা করছেন।

এই সময়ের মধ্যে তারা মেন্যুয়াল সিস্টেমে কাজ করছে। কারও টেস্ট রেজাল্ট করোনা পজিটিভ হলে অনলাইনে তার নিজের ডিটেইলস এবং সম্প্রতি যাদের সাথে কনটাক্টে ছিলো তাদের ডিটেইলস দিতে হয় এবং পরবর্তীতে সেই ডিটেইলস ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস টেলিফোনে চেক করে থাকে এবং তাদেরকে ১৪ দিন সেল্ফ আইসোলেশনে থাকার অনুরোধ জানায়। দ্রুততা এখানে একটি ফ্যাক্টর। ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্রিস্টোফি ফ্রেইজারের মতে কন্টাক্ট ট্রেসিং এ কোনো মতেই ৪৮ ঘন্টার অধিক সময় নেয়া যাবেনা। ২ দিনের বেশি দেরী হওয়ার অর্থ হচ্ছে কর্তৃপক্ষ তৃতীয় কন্টাক্ট হারাবেন। বৃটেনে কিছু ক্ষেত্রে এখনও টেস্ট রেজাল্ট পেতেই ৪৮ ঘন্টা লেগে যায়। সুতরাং কন্টাক্ট ট্রেসিং এ্যাপ অপরিহার্য।

১৭ জুন ইংল্যান্ডে ৬,৯২৩ জনের ৭০% এর টেস্ট পজিটিভ এসেছে এবং তাদের সাথে যারা ক্লোজ কন্টাক্টে এসেছে তাদের তথ্য চাওয়া হয়। প্রায় ৩০,২৮৬ জনকে চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের মধ্যে ৮১.৭% লোককে  সেল্ফ আইসোলেট করতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশের বিশ্বাস সংক্রমিত অনেক বৃটিশ জনগনকে এখনও টেস্টের আওতায় আনায়ন করা যাচ্ছেনা বিধায় তাদের তথ্য সিস্টেমে আসছেনা।

একদিকে এখনও পর্যন্ত ট্রেসিং এ্যাপ ডেভলপড্ হয়নি যখন বৃটিশরা স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে সমুদ্র বীচে হাজার হাজার একত্রিত হচ্ছে। বৃটিশদের কাছ থেকে বিশ্ববাসী এই ধরনের দৃশ্য অবলোকন করতে অভ্যস্ত নয়।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT