Main Menu

করোনার ভুয়া টেস্ট করে প্রতারণায় জেকেজি হেলথ কেয়ার

করোনা ভাইরাসের টেস্ট করার নামে মানুষের জীবনমরণ খেলায় মেতে উঠেছিলেন বেসরকারি নমুনা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি হেলথ কেয়ার) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরী। বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের জন্য ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পৃথক ছয়টি স্থানে ৪৪টি বুথ স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হতো। শর্ত ছিল-সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠাতে হবে; কিন্তু হেলথ কেয়ার ওভাল গ্রুপের অঙ্গসংগঠন জেকেজি সব শর্ত ভেঙে পরীক্ষা ছাড়াই করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট সরবরাহের ফাঁদ পাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। নিজস্ব কর্মীবাহিনী ছাড়াও সিন্ডিকেটে যোগ করে দালালচক্র। ফোন করলেই বাসায় গিয়ে চক্রের সদস্যরা সংগ্রহ করত করোনার নমুনা। এর বিনিময়ে নিত ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু নমুনার কোনো পরীক্ষা ছাড়াই এক দিন পরই মনগড়া ফল দিয়ে দিত। করোনা উপসর্গে ভোগা মানুষদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে জেকেজির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবরে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীবাহিনী গাঢাকা দিয়েছে।

করোনাঘিরে প্রতারণার সিন্ডিকেট গড়ে জেকেজি। একে আগলে রাখতে তৈরি করেছিল শক্তিশালী ক্যাডার বাহিনী। যেখানে যেখানে বুথ স্থাপন করে, সেখানেই তারা এই ক্যাডার বাহিনী দিয়ে কায়েম করে ত্রাসের রাজত্ব। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে নিজেদের অনৈতিক কাজ করিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জেকেজি হেলথ কেয়ার। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাড়া না দেওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যহারও করতেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও আরিফ চৌধুরী। অবশেষে শেষরক্ষা হয়নি।

ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহসহ বেশ কিছু অভিযোগে গত মঙ্গলবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন আরিফুলসহ পাঁচজন। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন-হুমায়ুন কবীর, তার স্ত্রী তানজীনা পাটোয়ারী এবং সাইদ চৌধুরী ও আলমান। তাদের মধ্যে হুমায়ুন ও তানজীনা কিছুদিন আগে জেকেজি থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরাই নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ছাড়াই ফল দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছিলেন বেশুমার টাকা। বাকি দুজন গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন জেকেজিতেই।

এদিকে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ ও টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদানসহ একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে জেকেজি হেলথ কেয়ারকে দেওয়া কোভিড-১৯ সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা সংগ্রহ, কেন্দ্র স্থাপন ও প্রশিক্ষণের সব অনুমতি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত বুধবার অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে নারায়ণগঞ্জে জেকেজির যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ। গত বুধবার থেকে শহরের নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও এমডব্লিউ স্কুলে জেকেজির নমুনা সংগ্রহের কার্যক্রম বন্ধের এই নির্দেশ দেওয়া হয়। জেকেজির সিইও গ্রেপ্তারের পরই গ্রাহকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ।

জানা গেছে, এপ্রিল মাসে কোভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষার জন্য অনুমতি পায় জেকেজি হেলথ কেয়ার। নমুনা পরীক্ষায় টেকনোলজিস্ট ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণের জন্য তাদের রাজধানীর তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের জায়গা করে দেওয়া হয়। এর পর কলেজ ক্যাম্পাসে করোনা বুথ স্থাপন ও ক্যাম্প করে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রায় ২০০ কর্মী। গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির সিইও গ্রেপ্তারের পর তিতুমীর কলেজে বুথসহ সব কিছু ফেলে গোপনে গাঢাকা দিয়েছেন তারা। কলেজটিতে মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই, ব্যবহৃত জামা-কাপড়সহ করোনা পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ ফেলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা পালিয়ে গেছেন বলে কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বনানী থানাপুলিশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছেন তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফ হোসেন। তিনি বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রায় দুইশ কর্মী অবস্থান করেছিলেন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের রাতে কলেজের কাউকে কিছু না জানিয়েই তারা পালিয়ে যায়। গত মঙ্গলবার রাত থেকে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মীরও দেখা মেলেনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের সরকারি তিতুমীর কলেজ শাখার সহসভাপতি এসএম জাকির হোসেন (রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী) জানান, করোনা পরীক্ষার নামে জেকেজি হেলথকেয়ারের কর্মীরা ছাড়াও তাদের পালিত সন্ত্রাসীরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল কলেজ ক্যাম্পাসে। রাতে ক্যাম্পাসের মধ্যেই মদ ও নারী নিয়ে আসর জমাত তারা। প্রতিবাদ করলে তাদের হামলার শিকার হয়েছেন নিরীহ নিরাপত্তাকর্মীরাসহ অনেকেই। গত সপ্তাহে জাকির হোসেন তার মার্কশিট নিতে নিজ কলেজে গেলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পড়তে হয় নানা জেরার মুখে। প্রতিবাদ করলে মারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন জেকেজির সদস্যরা।

তিতুমীর কলেজের একাধিক ভুক্তভোগী জানান, গত ১ জুন দিবাগত রাত ১টার দিকে জেকেজি হেলথ কেয়ারের এক নারীকর্মী অশালীন পোশাক পরে তার নির্ধারিত থাকার ভবন ছেড়ে তিতুমীরের কলাভবনের দিকে এক পুরুষ সহকর্মীর কাছে যাচ্ছিলেন। পথে নিরাপত্তাপ্রহরী জিজ্ঞাসা করলে কথা কাটাকাটি হয়। পরে পুরুষ সহকর্মী ভবনের নিচে নেমে এসে মেয়েটিকে ওপরে নিয়ে যান। রাত তিনটায়ও তারা নিচে নেমে না আসায় নৈশপপ্রহরী ভেতরে অবস্থানরত তিতুমীরের কর্মচারীদের সাহায্যে বিষয়টি পুলিশে জানান। এর জের ধরে পরদিন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে সিইও আরিফ সস্ত্রীক প্রায় দুইশ বহিরাগত সন্ত্রাসী লাঠিসোটা, রড, চাপাতি নিয়ে কলেজের ভেতরে প্রবেশ করে। বহিরাগত সন্ত্রাসী মহিলাদের প্রধান ফটকের মুখে দাঁড় করিয়ে ফটকের ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। জেকেজি হেলথ কেয়ারের দুই প্রধানের নির্দেশে নৃশংস মধ্যযুগীয় কায়দায় বহিরাগতরা গ্রুপে গ্রুপে কর্মচারীদের কোয়ার্টারে ঝাঁপিয়ে পড়ে অমানবিক অত্যাচার নির্যাতন, ভাঙচুর চালায়। প্রাণভয়ে লুকিয়ে থাকা কর্মচারী ও তাদের পরিজনরা বের না হলে ঘরে আগুন দেওয়ারও হুমকি দেয় তারা।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT