Main Menu

রোগাক্রান্ত পৃথিবী

জালাল উদ্দিন আহমেদ: এখন তো একটাই টপিকস। অন্যসব পাতে পড়ে না। মহা সৃষ্টির অথৈ জলে পড়ে গোটা দুনিয়া আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। একটা ছোট্ট অনুজীব যা খোলা চোখে দেখাও যায় না। অথচ তার দাপটে গোটা মানব সভ্যতা আজ খাবি খাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের উত্থান হয়েছিল গত বছরের শেষ মাসে। চীন দেশের শিল্প সমৃদ্ধ প্রদেশ উহানে তার জন্ম। আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ এবং তা সুলভে প্রাপ্য বিধায় উন্নত বিশ্বের পশ্চিমা ব্যাবসা বাণিজ্যের বেশ প্রসার লক্ষ্য করা গেছে এই উহানে। এই ভাইরাসের প্রদুর্ভাবে উহানের জনজীবনে যখন মড়কের মত অবস্থা তখন স্বাভাবিকভাবেই বিদেশী বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকার ব্যাবসায়ী ও তাদের এজেন্টরা নিজ দেশে ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত অসুখ কোভিড-১৯ নামে পরিিিচতি পেয়েছে। এটি একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ বিধায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়া পশ্চিমা মানুষজন করোনা ভাইরাসের সংক্রমন নিয়েই দেশে ফিরেছেন বলে অনুমান করা যায়। ইরান বা এশিয়া মাইনরে যে সংক্রমনটা হয়েছে তা সম্ভবতঃ সিল্ক রোড এর স্থল পথ সংশ্লিষ্টায় হতে পারে বলে আন্দাজ করা হচ্ছে। তাছাড়া দক্ষিণ পুর্ব এশিযা এবং আফ্র্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় এই সংক্রমনটা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ ও অবাধ চলাফেরার সুবাদে। আমরা ইতিপুর্বে জেনেছি যে, প্রতি এক’শ বছর পর পর এ ধরনের মহামারী পৃথিবীতে এসেছে এবং পৃথিবীর সুন্দর সুষ্ঠ পরিবেশকে তছনছ করে আবার চলে গেছে। এধরনের ভাইরাস জনিক রোগ মহামারী আকারে প্রতিটি শতকেই এই পৃথিবীতে এসেছে। সাজানো পৃথিবীর সুন্দর স্বপ্নগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে একদিন হয়তো বিদায় নিয়েছে। সতের শতকের পরের হিসাবটা বেশ বড় ছিল বিধায় সেগুলোকে আমরা মোটা দাগে চিহ্নিত করেছি। তাছাড়া এর আগের শতকে বা তারও আগে এধরনের অসুখ জনিত মহামারী যে পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তা হয়তো আমরা কমবেশী অনেকেই জানি। 
বিশ্বব্যাপী প্রতি শতাব্দীতেই এসেছে ভিন্নধর্মী এই সকল রোগজনিত মহামারী । দুনিয়ার সাজানো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাকে তছনছ করে আবার বিদায় নিয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় খ্রীষ্টপুর্ব কাল হতেই এধরনের অসুখ জনিত মহামারী জনপদে নাকাল সৃষ্টি করেছে। 
কুষ্ঠরোগকে একটা সময় মারাত্মক রোগ হিসাবে বিবেচনা করা হোত। যদিও এখন তা ভাবা হয়না। এই কুষ্ঠরোগ একসময় গোটা পশ্চিম ইউরোপকে তটস্থ করে রেখেছিল। খ্রীষ্টপুর্ব ৬০০ অব্দ হতে ১০০০ সাল পর্যন্ত এই কুষ্ঠরোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও পরবর্তীতে আফ্রিকা ও এশিয়াতেও এর সংক্রমন লক্ষ্য করা গেছে। 
মিজলস বা হাম রোগের বিষয়টি আমরা কমবেশী সবাই জানি। সাধারনতঃ ১৫ বছর পর্যন্ত শিশু কিশোররা এই রোগে আক্রান্ত হয়। হিসাব বলছে, গত দেড়’শ বছরেই এই হামজনিত রোগে গোটা দুনিয়ায় প্রায় ২০ কোটি শিশু কিশোর মারা গেছে। আর এক হিসাবে দেখা যায় একবিংশের এই ক’টা বছরেই প্রায় চার কোটি আক্রান্তের মধ্যে আট লাখ শিশু কিশোর মারা গেছে।
যক্ষ্মা  রোগকে রাজরোগ বলা হয়ে থাকে। এইযক্ষ্মা  রোগ মহামারী আকারে পৃথিবীতে তার তান্ডব দেখিয়েছে। সাধারণতঃ উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ সমূহে এর প্রদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। জানামতে এ পর্যন্ত এ রোগে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মারা গেছে।
আমরা গুটি বসন্তের কথা কমবেশী সবাই শুনেছি। তবে বিংশ শতাব্দীতে এই মহামারী প্রাদুর্ভাবে লাগাম টানা হয়েছে বলে মনে করা হয়। আঠার শতকের আগে এই রোগে শুধু ইউরোপেই প্রতিবছর ৪ লাখ করে মানুষ মারা যেত। বিংশ শতকের হিসাবে এই রোগ মহামারী আকার ধারন করে এবং এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ কোটি মানুষ মারা গেছে। 
ম্যালেরিয়া রোগ মহামারী হিসাবে দেখা গেছে ট্রপিক্যাল দেশ সমূহে। সাধারনতঃ এশিয়া আমেরিকা ও আফ্রিকান অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেছে।  কিন্তু এই রোগ মহামারীর আকার নেয় আঠার শতকে প্রথম দিকে আমেরিকাতে, যখন সেখানে গৃহযুদ্ধে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ,আমেরিকা ও আদিবাসীয় জাতিগত কারনে। এক সময় এটাকে রোমান ফিভারও বলা হোত। 
ইয়োলো ফিভার বা জন্ডিস রোগের কবলে আমরা কম বেশী সবাই ভুক্তভোগী। এটাও কিন্তু এক সময় মহামারী আকারে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়। এক সময় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সমূহেও এই জন্ডিস রোগ মহামারী আকরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সে সময় প্রচুর প্রাণহনির ঘটনা ঘটে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি মারাত্মক ভাইরাস জনিত অসুখ।  গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রাটস্ খ্রীষ্টপুর্বাব্দ ৪১২ সালেই এই মহামারী অসুখের কথা বলে গেছেন। এটা সাধারনতঃ বিশ তিরিশ বছর পরপরই ফিরে আসে। এ রোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছে। কখনো রাশিয়ান ফ্লু কখনো এশিয়াটিক ফ্লু কখনোবা স্প্যানিস ফ্লু নামে এর ব্যাপকতা দেখা যায়। আবার ইদানীংকালের এশিয়ান ফ্লু, হংকং ফ্লু কিংবা সোয়াইন ফ্লু নামে এটা পরিচিতি লাভ করেছে। তবে স্প্যানিস ফ্লু সবচেয়ে বৃহৎ আকারে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়েছিল। এটা সে সময় অর্থাৎ ঊনিশ শতকের প্রথম ভাগে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জনপদে সংক্রমিত হয়েছিল। স্প্যানিস ফ্লুর সেই আঘাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল মাত্র দু বছরে। 
কলেরার নামক অসুখটি ভারতীয় ইপমহাদেশ হতে উদ্ভুত হলেও এর প্রাদুর্ভাবে ইউরোরোপ এশিয়া মাইনর ও দক্ষিনপুর্ব এশিয়াতেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছিল বলে জানা যায়। এই পানিবাহিত রোগের সুত্রপাত হয় বাংলায়। এরপর আস্তে আস্তে তা ইউরোপ ও অন্যান্য অ লে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ আমেরিকা ও এশিয়া মিলে আঠার শতকের প্রারম্ভিক সময়ের এই মহামারীতে প্রায় ৫ কোটি বা মতান্তরে ১০ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। 
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত সংক্রমিত মহামারী এসেছে তার মধ্যে প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ রোগেই বোধ হয় সবচেয়ে বেশী মানুষ মারা গেছে। বলা হয়ে থাকে এটা ঈশ্বর প্রদত্ত অসুখ যার কোন চিকিৎসা নেই। সতের শতকের প্রারম্ভে এই রোগের প্রদুর্ভাব ঘটে ইউরোপে। তবে খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ ৪০০ সালেও এই রোগের খবর পাওয়া যায়। জানা যায়, ৫০০ থেকে ৭০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এই রোগে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষ মারা যায়। তবে তের ও চোদ্দ শতক এবং সতের শতকে মড়কের মত এই রোগ  ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে সে অ লের প্রায় অর্ধেক মানুষকে মেরে ফেলেছিল এই প্লেগ বা ব্ল্যাকক ডেথ। জানা যায় এশিয়া ও ইউরোপ মিলে সেই প্লেগে ২৫ কোটি মানুষ মারা যায়। এখনকার দিনে কোভিড আক্রান্ত মৃত ব্যাক্তিকে যেমন আত্মীয় স্বজনরা অবহেলা করে, তখনকার দিনে প্লেগ রোগীকে আত্মীয় স্বজন এমনকি মা তার সন্তানটিকেও ফেলে সরে যেত। সুতরাং এই মহামারী কতখানি সামাজিক বিপর্যয়ে পৌঁছেছিল তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না।
নেপোলিয়ানের সময়কালে এবং জার্মান উত্থানের সময় একটি অসুখ ইউরোপ ও রাশিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এটা টাইপাস বা উকুন রোগ নামে পরিচিতি লাভ করে। জানা যায় ইউরোপীয় ধর্ম যুদ্ধের সময়কালে এর প্রদুর্ভাব ঘটে। পরবর্তীতে নেপোলিয়ানের বিশ্বজয়ী সৈন্যদের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সে সময় তদা অঞ্চলে  প্রায় ৪লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। রাশিয়ায় মারা গিয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ। হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেই মারা গিয়েছিল প্রায় ৭ লাখ মানুষ।
এছাড়াও টাইফয়েড, গনোরিয়া, সিলিফিস এবং এইচ আইভি নামক অসুখগুলি পৃথিবীব্যাপী যে অস্থিরতা ও বিশৃংখলার সৃষ্টি করে রেখেছে তা এই ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীকালের খবর। এসব নিয়ে গোটা আফ্রিকা মহাদেশ ও এশিয়ার কিয়দাংশ এখনো তটস্থ আছে বলে আমরা জানি।
একবিংশের বর্তমান বিশ্ব এখন বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়েছে করোনা নামক এক মারাত্মক অনুজীবের ছোবলে। এ্ থেকে সংক্রমিত রোগ কোভিড-১৯ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২০ এর প্রারম্ভে শুরু হওয়া এই মহামারীতে এপর্যন্ত ৪.৫ লাখের অধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি। এবং প্রতি নিয়ত মানুষের আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। এটা বিশ্বব্যাপী মহামারী হিসাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। এই মহামারী কতদিন চলবে তা কেউ বলতে পারে না। তাছাড়া এই অসুখের কোন ভ্যাকসিন বা ঔষুধ এখনো আবিস্কার না হওয়ায় জনপদে একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। গোটা দুনিয়া কাবু হয়ে গেছে এই করোনা নামের ভাইরাসের ছোবলে। আমরা আশা করছি শীঘ্রই এই মহামারী থেকে পৃথিবী মুক্ত হবে। করোনা আতংকে বিশ্ব আজ আইসোলেশন লকডাউন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার যাঁতাকলে বন্দি। আশা করছি বিশ্ব জনপদ এ থেকে মুক্ত হয়ে আবার জাগবে এবং তার পুর্বের কর্মচাঞ্চল্যে ফিরে আসবে। 


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT