Main Menu

অনিয়ম

জালাল আহমেদ: অনিয়ম চারিদিকে। শুধু কি অনিয়ম! রাাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বন্দনায় সবখানে শুধু অনৈতিক হতাশার ছবি। যা উই পোকার ঢিপির মত গিজ গিজ ক’রে আমার পরিপাশকে অক্টোপাশের মত জাপটে ধরেছে। মানুষ ও সমাজের বেঁচে থাকার ন্যুনতম নৈতিকতা আজ ধুলোয় গড়া গড়ি খাচ্ছে। মানুষের কথা বলার জায়গাটি আজ বড়ই ক্ষীন। অন্তহীন সমস্যা যা আমরা দেখছি এই সমাজ সংসার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়- তাতে প্রকৃতির কোন হাত আছে বলে মনে হয় না। প্রকৃতির আইলা, সিডর, আম্ফান কিংবা ডেঙ্গু, কোভিড মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই আসে। তবে প্রকৃতি প্রদত্ত এসব  বালা মসিবত জনপদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে আবার চলে যায়। কিন্তু মনুষ্য সৃষ্ট এবং একপেশে ভাবে প্রয়োগ করা অনিয়ম ও অনাচারগুলো প্রতিনিয়ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ন্যায় সমাজ জীবনকে অসহায় করে রাখে তখন মানব জীবনের শাশ্বত অঙ্গীকারের জায়গাটি আর সুষ্ঠতায় বিরাজ করে না। 

কোথায় অনিয়ম নেই। আঁতুড় ঘর থেকে শুরু ক’রে কবর পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে আজ অনিয়মের নিয়মাচার। প্রসূতির সময় হয়েছে। নতুন অতিথিকে বরন করার জন্য সবাই উদগ্রীব। সময়মত প্রসূতিকে নার্সিং হোমে বা ক্লিনিকে নেয়া হ’ল। ব্যাশ! ডেট পড়ে গেল। অমুক দিন এতটার সময় প্রসূতির সিজার হবে। এটা যেন অবধারিত এক নিয়মাচার। আজকাল হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে কোন লেবার টেবিল নেই। ওই ব্যাপারটা চুকে গেছে সিজার নামক এক অলিখিত নিয়মাচারের যাঁতাকলে। লেবার টেবিল এখন অপারেশন টেবিলে পরিণত হয়েছে। এবং এই অনিয়মের নিয়মাচারে সন্তানের জন্ম হয় মায়ের নাড়িভুঁড়ির কাটাছেঁড়ায়। 

সন্তান বড় হচ্ছে। ওর পুষ্টি ও বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য। সেটাও কি শুদ্ধাচারের প্রাপ্যতায় আছে এই সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায়? ভেজাল শিশু খাদ্যের ছড়াছড়ি। দেখভাল্ করার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু যোগ্য ও সৎ লোক নেই সেখানে। সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে রাজ্যের অনিয়ম। কেউ বেঙ্গলী মিডিয়ামে কেউবা ইংলিশ ভার্সানে এবং আত্ম বিশ্বাসীরা ইংলিশ মিডিয়ামে সন্তানদের পড়িয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। আর খরচা পাতি! সেতো সোনার হরিণ মধ্য ও নিম্ন বিত্তদের জন্য। তার উপরে আবার স্বর্ণালী এ প্লাসের চমক। এ যেন ডিজিট্যালের নতুন সবক। স্বর্ণালী এ প্লাসের প্রলোভন সেই কচি বয়স থেকেই। ফলে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বুনিয়াদি শিক্ষার বারোটা বেজে গেছে। তাইতো দেখি বাবা-মা বা গৃহ শিক্ষকদের অসুদোপায় পন্থায় বাচ্চার মুখে হাসি ফোটানোর বারোয়ারী হাঁটাচলা। কৈশরের উন্মাদনায় শিশু কিশোররা যখন উড়ন্ত সূচনায় “দেখবো এবার জগতটাকে..... কেমন করে ঘুরছে মানুষ দেশ হতে দেশ দেশান্তরে”র  দিক্ষায় নিজেদের প্রস্তুতির মালা গাঁথবে ঠিক তখনই তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয় পিএসসি জেএসসি নামক গোল্ডেন এ প্লাসের এক ঝুলন্ত মুলা। গোল্ডেন এ প্লাসের সোনার হরিনের জন্য তাদেরকে তখন দোড়ানো শুরু করতে হয় বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারে যা রাত নয়’টা অব্দি চলে। সেক্ষেত্রে তাদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রগুলি সংকুচিত হয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের রাজনীতির মহারথীরা এটা তাদের বিশাল সাফল্য ধ’রে সোনার মোড়কের রিপোর্ট নিয়ে এ প্লাসের এই দুর্দশাকে গণভবনের চার দেয়ালের ভিতর ক্যামেরার ফ্লাসে ব্রেকিং নিউজের তৃপ্তিতে ঢেকুর তোলেন। ফলে অসুস্থ প্রতিযোগিতার সেইসব প্রডাক্টরা বেপরোয়া ভাব নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার রসদ খুঁজে পায়। জীবনের প্রথম সোপানের শাশ্বত ম্যাট্রিকুলেশনে ছেলে মেয়েরা ন্যুব্জদেহে বই এবং সহয়িকার ভারে তোতাপাখি হয়ে সেই প্রতিযোগিতায় নিজেদের শরীক করছে। রাজনীতির দৈউলিয়াপনায় এক’শ তে এক’শ নিয়ে ছেলেমেয়েরা কলেজে পাড়ি দিচ্ছে। সেখানেও সকাল-সন্ধ্যা একই কাসুন্দি। পড় পড় এবং পড়। গোল্ডেন এ প্লাস পেতে হবে নইলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া মুস্কিল। অবশেষে কৈশরের গন্ডি পেরিয়ে আমাদের সন্তানেরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় নামক সর্বোচ্চ ডিগ্রীর দরজায় কড়া নাড়ে তখন তারা হোঁচট খেয়ে মুখ থুব্ড়ে পড়ে।  তবে চিন্তা নেই। টাকা থাকলে সব কিছুর সমাধান আছে। ঠিক যেন খাজা বাবার স্বপ্নে পাওয়া তাবিজের মত। তিন বা পাঁচ কামরায় ভাড়া করা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সন্তানদের ডিগ্রী দেওয়ার জন্য। ব্যাশ! তবে আর ভাবনা কেন। তাও ভাল, ওরা পড়তে পারছে। ডিগ্রী পাচ্ছে। এভাবেই আমাদের নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে। ডিগ্রী নিচ্ছে। না আছে তাদের জীবন বোধের গল্প না আছে দেশের ভবিষ্যত বিনির্মানে নিজেদেরকে মনুষ্য উৎকর্ষতায় বড় করে গড়ে তোলার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। 

এতো গেল নাগরিক হয়ে বেড়ে ওঠা বাংলার ভবিষ্যতের গল্প। কিন্তু এই গল্পের পিছনেই লুকিয়ে আছে নতুন করে গল্প লেখার রসদ। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের এই ক্ষেত্রটিই ছিল আমাদের এতদিনের শুদ্ধ স্বপ্নের জলন্ত আধার। কিন্তু অসুস্থ রাজানীতির দুরাচারী খায়েসে নব প্রজন্মের একটি ধারা যেভাবে মুর্তমান আতংক হয়ে ছাত্র সমাজে ছড়ি ঘোরাচ্ছে তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় সামনের দিনে নেতৃত্ব শূণ্য হয়ে বাংলাদেশ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। 

রাজনীতির কথা এসে গেলে হতাশা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। পারিবারিক বলয়ের আবর্তে কতিপয় ছন্নছাড়া পরজীবি এদেশের রাজনীতিকে রাজতন্ত্রের মোড়ক দিয়ে নিজেদের জৌলুষ বাড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। রাজনীতির ন্যুনতম মূল্যবোধে তারা কখনোই দুটি পরিবারের বলয় থেকে বেরিয়ে নিজেদেরকে প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে দৃশ্যমান কোন ঘটনা নেই। যদিওবা স্বচ্ছতার আবর্তে দু’একজন হাঁটার চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারিবারিক চামচ লাগানো রাজনীতির দুর্বৃত্ত চাঁইদের সম্মিলিত প্রতিরোধে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছেন। 

আসুন এবার সমাজ নীতিতে। সেখানেও অসম কায় কারবার। মাসল ম্যান দৃর্বৃত্তরাই আজ সমাজের মোড়ল। চেয়ারম্যান মেম্বার কাউন্সিলর। কেথায় আজ স্বচ্ছ ও সম্মানিত মানুষের উপস্থিতি? মসজিদের সভাপতি স্কুল কমিটির চেয়াম্যান। কোনো দিকে কি তাকানো যায়! সমাজ সংস্কৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান সবখানে তাদের দপ্দপানি। সবই কিন্তু রাজনীতির মোড়কে সৃষ্ট উলোট করা কুলকুচি।
  শাসন নীতি! রাজনীতির কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন আজ গোটা প্রশাসন ব্যবস্থা। তুষের আগুনে খাক্ হয়ে থাকা পাঠক ও তার পরিপাশকে এর বেশী ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি? 
 আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও তার আচরণ! প্রতি নিয়ত ঘটে যাওয়া বুজরূকি তো আমরা মিডিয়ার কল্যানে হররোজ অবলোকন করছি। কমবেশী সে উত্তাপ তো বাংলার কোন না ঘরে প্রতিদিনই আহাজারির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও বিদেশ নীতি, রাষ্ট্রীয় ভ্রমণ নীতি, চিকিৎসা নীতি, চাকুরী নীতিসহ চলমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ছড়িয়ে আছে হাজারো নীতি ও রীতি। কোথায় নিয়ম আছে বলতে পারেন? 

বঙ্গবন্ধু, তুমি দেখে যাও - তোমার নুর হোসেনদের গলায় আজ আর আওয়াজ নেই। আইজুদ্দিনদের দিন ভাল যাচ্ছে না। আর মিশির আলীর চশমাটা ফুটো হয়ে গেছে। ফলে সে আর দেখেও দেখতে পায় না। তোমার বাঙালী আজ উর্দ্ধপানে চেয়ে আছে কখন সেই বজ্র কন্ঠ আবারো নিনাদ কম্পনে বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তাদের আশ্বস্ত করে বলবে  “আমি তোমাদেরই লোক”। 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT