Main Menu

করোনা প্যানডেমিক

জালাল উদ্দিন আহমেদ: কি করার ছিল। আর কি হোল। কত পরিকল্পনায় সাজিয়েছিলাম আমাদের পিতার শতবর্ষ উদযাপনের নির্ঘন্টগুলি। জীবনের চেয়েও প্রাণপ্রিয় মানুষটির জন্ম শতবর্ষীয় উদযাপনটা স্মৃতির আয়নায় বেঁধে রাখবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম। আশা ছিল দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করে শতবর্ষের উদ্যাপনে নিজেদেরেকে ধন্য করবো। বাঙালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই দিনটিকে নিয়ে প্রত্যেক বাঙালীর একটা না একটা সুন্দরতম পরিকল্পনা ছিল তা বুকে হাত দিয়েই বলা যায়। মনের মুকুরে সাজিয়ে রাখা স্বপ্ন পুরনের বছরে আমরা হাসবো, গাইবো, নাচবো, জীবন বোধের গল্প রচনা করবো-এটাই তো ছিল আমাদের সিঁড়ি গাঁথার স্বপ্নগুলো।
কিন্তু এ কি হাল আজ বাংলার জনপদে। আইসোলেশান, লকডাউন, কোরেনটাইন, চেষ্ট, পিপিই, কিটস্ ইত্যাদির বহুমুখী চাপে আজ বাংলার প্রশাসন ও জনপদের চিড়ে চিপ্টে অবস্থা। স্বপ্নবাজ মানুষগুলো আজ ঝিমাচ্ছে। নেতা নেত্রীর নামে গগন বিদীর্ণ করা শ্লোগান আজ আল্নায় তুলে রাখা হয়েছে। নিজের বুকে “ শৈরতন্ত্র নিপাত যাক” লিখে মিছিলের সামনে থাকা অকুতোভয় মানূষগুলো আজ আধাপেটা না খাওয়া আদম হয়ে গৃহবন্দি। এটাই নিয়তি ! প্রকৃতির বিরস ছোবলে আজ শুধু বাংলার বাঙালী কেন, গোটা বিশ্ব সম্প্রদায় ধুক ধুক করছে। লাখে লাখে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে কোভিড-১৯ নামের এক মরন ব্যাধিতে। এই ছোঁয়াচে রোগের উৎস করোনা ভাইরাসকে বলা হচ্ছে যমের দূত। চিকিৎসা নাই, প্রস্তুতি নাই এর অজুহাতে আজ গোটা বিশ্বকে লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীন থেকে শুরু করে তাবত দুনিয়ার স্থলপথ, জলপথ ও আকাশ পথ আজ স্থবির হয়ে গেছে। মানুষ গৃহবন্দি হয়ে ভাইরাস সংক্রমনের আশংকায় হেন প্রস্তুতি নাই যা পালনে বা গ্রহনে পিছপা হচ্ছেনা। দুনিয়ার মোড়ল রাষ্ট্রটির প্রধানও আজকের এই দিনে বাঁচার তাগিদে ম্যালেরিয়ার ওষুধ খেয়ে বাঁচার আকুতিকে আরো বেগবান করছেন।
এ এক ব্রীড়িত আগ্নেয় লাভা। শত বর্ষের ব্যবধানে ফিরে আসা এই মহামারী এবার নতুনত্বের ছোঁয়া দিয়ে একবিংশের মানব সভ্যতাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ১৭২০এ আমরা দেখেছি প্লেগ বা বøাক ডেথ নামক এক ভয়ঙ্কর মহামারী। সেদিনের সেই প্লেগ রোগের মহামারী চার বছর জুড়ে চলেছিল যা ইউরোপের অর্ধেক মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিল। এই প্লেগ মহামারীতে সেবার বিশ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর ঠিক এক’শ বছর পর অর্থাৎ ১৮২০ সালে কলেরায় পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ভারতবর্ষ, চীন ও রাশিয়া ছিল এর কেন্দ্রস্থল। ১৯২০ সালে পৃথিবী জুড়ে এসেছিল ইনফ্লুয়েজ্ঞা নামক ভাইরাস জনিত রোগ যার প্রকোপে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পাঁচ কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এই রোগ স্প্যানিস ফ্লু নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এখন ২০২০ সাল। অর্থাৎ ঠিক এক’শ বছর পরের কাহিনী। নোবেল করোনা ভাইরাস আক্রান্তে এখন শুরু হয়েছে কোভিড-১৯ নামের এক মরন ব্যাধি যা গোটা বিশ্বকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে। চীন দেশের উহান প্রদেশ হতে উৎপন্ন হওয়া এই ভাইরাস রোগ এশিয়া মাইনর হয়ে ইউরোপকে গ্রাস করেছে। দ্বিতীয় ধাপে দুনিয়ার প্রবল পরাক্রমশালী মোড়ল রাষ্ট্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে নেতিয়ে দিল তা আতংকিত হওয়ার মতই বটে। গোটা বিশ্ব আজ করোনায় আক্রান্ত। দুনিয়া কাঁপানো এই ভাইরাস রোগ এখন ল্যটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তার বেপরোয়া প্রদুর্ভাব ঘটাচ্ছে। জনবহুল দক্ষিণ এশিয়ায় যাদের দিন-দিনান্তের রোজনামচায় ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়-তারা এখন দিশেহারা হওয়ার চুড়ান্ত পর্যায়ের ক্ষণ গননায় উদ্বিগ্ন। দরিদ্র অর্থনীতির এইসব দেশ যার মধ্যে আমার প্রিয় মাতৃভূমিও রয়েছে, আজ করোনার ছোবলে দিশেহারা অবস্থায় দিনতিপাত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চাপে কিংবা নিজেদের টিকে থাকার সুত্র হিসাবে আজ আমার দেশ বা পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহ যেভাবে লকডাউন, কেরেনটাইন বা আইসোলেশনের লুকোচুরি খেলা শুরু করেছে তাতে অচিরেই এই সংক্রমন মহামারীর আকার ধারন করে কিনা তা সময়ই বলে দিবে। যে দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে হাজার বার’শ লোকের বসতি সেখানে এই আইসোলেশন বা লকডাউন কতটুকু কার্যকর তা দিব্য দৃষ্টিতেই দেখা যায়। সরকার তার সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা দিয়ে সবকিছু নিয়মে আনার চেষ্টায় প্রাণান্ত করে যাচ্ছেন। কিন্তু যে দেশের বারো কোটি হাতকে সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে গোটা ষোল কেটির অন্ন সংস্থানে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয় সেই কর্মীর হাতগুলো হঠাৎ এক করোনা ঘুর্ণিঝড়ে লকডাউন হয়ে গেলে কোন্ আলাদিনের প্রদীপ এই ষোলকোটির অন্ন ও নিত্য নৈমিত্তিক যোগানে এগিয়ে আসবে বলতে পারেন? তাইতো বিপদ আছে এবং হবে জেনেও জীবনের চাহিদা ও মানচিত্রের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আজ সরকারকে অনেক অপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো নিতে হচ্ছে। আমরা তো এমন শক্ত অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির দেশ নই যে ছ’মাস এক বছর ঘরে বসে খেলেও আমাদের কোন সমস্যা হবেনা। সুতরাং যুদ্ধ করে সংগ্রাম করেই আমাদের বাঁচতে হবে। তাছাড়া এই মহামারী এমন এক বিশৃংখল ভাবে গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে যে দৃশ্যতঃ সবার অবস্থাই এখন “না ঘরকা না ঘাটকা”। দেশীয় বাণিজ্য থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আজ লকডাউন চলছে। যেখানে উৎপাদন নাই, সরবরাহ নাই সেখানে বাড়ন্ত কোথায়? 
বিশ্বব্যাপী প্যানডেমিক (পৃথিবীব্যাপী ব্যাধি) ছড়ানো এই করোনা ভাইরাস গোটা মানব জাতিকে আতংকিত ও স্থবির করে দিয়েছে। মানব সভ্যতার কর্মচা ল্য মোটামুটি কেমায় অবস্থান নিয়েছে। এর রেশ কতদিন চলবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। আমরা ধৈর্য্য হারাবো না। আমরা সুন্দর কাঠামো সমৃদ্ধ মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নিজ নিজ ভূখন্ডে অবস্থান করছি। আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। যেকোন প্রতিকূলতা জয়ের সুতীব্র বাসনা আমাদের জয়ী করেছে। আর আমাদের এই জয়ের স্ফুরন বা আলোকবর্তিকা আসে মহাকালের সেইসব ঐশী স্ফুরন থেকে যা যুগে যুগে মানব জাতিকে তার ইহজাগতিক শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করেছে।
সুতরাং সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষাকে মানদন্ডে নিয়ে, আসুন না আমরা সবাই আমাদের কৃত কর্মের ফালনামায় দৃষ্টিপাত করে নতুন উদ্যমে বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো সাজাই। পাশাপাশি সরকার ও সংস্থা নির্দেশিত সাবধানতার পথগুলোকে বেঁচে থাকার আলোকবর্তিকা ভেবে তা গ্রহন করতঃ সুচারুরূপে প্রতিপালন করি।
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT