Main Menu

বাঙালীর ঘটি এবং বাঙাল

জালাল উদ্দিন আহমেদ: অখন্ড বাঙালী স্বত্বায় বাঙালীদের দুটি মুখরোচক টাইটেল যুগ পরম্পরায় আমরা জেনে এসেছি। ঘটি এবং বাঙাল। এই ঘটি-বাঙাল সম্পুরক শব্দ যুগলের সৃষ্টি হয় সম্ভবতঃ চল্লিশের দশকে। ধর্মীয় বিভাজনে ভারত বর্ষের বৃহত্তর বাঙলা যখন পুর্ব পশ্চিমে পাকাপোক্তভাবে দ্বিখন্ডিত হোল তখন এই বিভাজনের রূপকে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বলয়ে না রেখে একটি চটকদার উপমা সৃষ্টির মাধ্যমে তা বৃহত্তর বাঙালী সমাজে উপস্থাপিত হোল। বাংলার পশ্চিম হতে পুবে আসা মুসলমান বাঙালীরা হলেন ঘটি। আর পুব হতে ভিটেমাটি ছেড়ে পশ্চিমে আশ্রয় নেয়া বাঙালীরা হলেন বাঙাল। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর বাঙালী তার উদার অসাম্প্রদায়িকতার মানসিকতায় ভারত বর্ষের ইতিহাসে নিজস্ব স্বকীয়তায় অবস্থান করছেন বলেই মনে হয়। 
ধর্মীয় বেড়াজালের আবর্তে বাঙলা যখন দ্বিখন্ডিত হলো তখন প্রতিটি বাঙালী স্বত্ত¡ার আঁতুড় ঘরে এক অবিনাশী রক্তক্ষরন হয়েছে বৈকি! রাাষ্ট্রীয় কাঠামোর বেড়াজালে বাঙালীর অস্তিত্ব দু’ভাগ হয়ে একপক্ষ পাকিস্থানী আর অন্যপক্ষ ভারতীয় হয়ে গেল। ধর্মীয় বিভাজনের কষাঘাতে বাঙলার পশ্চিমাংশের মুসলমান বাঙালীরা পুবে এবং পুবের হিন্দু বাঙালীরা পশ্চিমে তাদের আবাস ভূমি স্থাপনে ব্রতী হোল। তবে ভারত যেহেতু ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষিত ছিল না এবং ভারতের রাষ্ট্র কাঠামোয় সর্বধর্ম সমন্বয়ের ভিত আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল বিধায় পশ্চিম বাঙলার মুসলমান বাঙালীরা প্ররোচিত হয়ে কিংবা রাষ্ট্র কাঠামোর প্রত্যক্ষ রোষানলে পশ্চিম থেকে পুবে আসার তাগিদ অনুভব করে নি। অপর পক্ষে পুর্ব বাঙলা যেহেতু পাকিস্থান নামক মুসলিম রাষ্ট্র কাঠামোয় সৃষ্টি হয়েছিল সেক্ষেত্রে বাংলার পুর্ব অংশের শাসকেরা অর্থাৎ পাকিস্থানীরা মুসলিম ম্যান্ডেটের মোহজালে পশ্চিম বাঙলার মুসলমান বাঙালী তথা উত্তর পুর্ব ভারতীয় নন বেঙ্গলী মুসলমানদের জন্য পুর্ব পাকিস্থানের মাটি উন্মুক্ত করে দেয়। তবে এই আসার প্রক্রিয়ার মধ্যে ভিন্নমতও পাওয়া যায়। ছেচল্লিশে কোলকাতার দাঙ্গা এবং সীমান্তবর্তী হিন্দু গরিষ্ট প্রভাবের জেলাগুলোতে কিছুটা হলেও প্রেসার গ্রæপের চাপে পশ্চিমের মুসলমান বাঙালীরা পুবে আসতে বাধ্য হয়। তবে তা রাষ্ট্রীয় মদদে কখনোই নয়। সেক্ষেত্রে বিহারী বা নন বেঙ্গলী মুসলিম যারা এসেছিলেন তারা কিন্তু দাঙ্গা বিদ্ধস্ত হয়েই পুর্ব পাকিস্থানে এসছিলেন। পাশাপাশি মুসলিম রাষ্ট্রের মজবুত বুনিয়াদ বিনির্মানের অজুহাতে পুর্ব বাঙলার হিন্দুদের সিংহভাগই কার্য়তঃ বিতাড়িত হন এবং তা রাষ্ট্রীয় মদদেই হয়েছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। অর্থাৎ বাংলার পশ্চিমাংশের বাঙালীদের কিয়দাংশ স্বপ্রনোদিতভাবে উন্নত জীবনের আকাংখায় পুবে ভিড়েছে আর পুবের বাঙালীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার মানসে পশ্চিমে প্রবেশ করেছে। 
পাকিস্থান সৃষ্টির উন্মত্ত চাহিদায় মুসলিম শাসিত কোলকাতায় এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় ছেচল্লিশ সালে। তখন বাংলায় মুসলিম লীগের শাসন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সে সময় মুখ্যমন্ত্রী। পাকিস্থান সৃষ্টিতে কংগ্রেসের অসহযোগ পরিলক্ষিত হলে মুসলিম লীগ কোলকাতায় প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নামে মিছিলের আয়োজন করে। ছেচল্লিশের ১৬ আগষ্ট সে মিছিল এক সময় লুটপাট ও সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের রূপ নেই। সে সময়কার সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে হাজার হাজার বাঙালী নিহত হন যার সিংহভাগই ছিলেন মুসলমান। প্রচুর ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এর প্রভাব পশ্চিম ও পুর্ববাংলার বিভিন্ন জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। ছেচল্লিশের ওই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রচুর বাঙালী প্রাণ হারায়। এবং সেই দাঙ্গার প্রভাবেই কার্যতঃ হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষাক্ত থাবা বাঙালীর উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পোক্ত শেকড় প্রোথিত করে রেখেছে। যার প্রভাব হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে এখনেও  লক্ষ্য করা যায়। এই প্রসংগে নোয়াখালীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথাও এসে যায়। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, সে দাঙ্গা কোলকাতারই ফসল। 
দেশ বিভাজনের পরবর্তী প্রক্রিয়ায় শূন্যস্থান পুরনে বাঙালীর এপার-ওপার সমভাবে না হলেও  উভয় দিকের প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন / প্রত্যক্ষ মদদ দু’দিক থেকেই হয়েছে বলে মনে করা হয়। সাম্প্রদায়িকতার ছোবলে যেমন একপাশের মুসলমান বাঙালী স্বপ্রনোদিত ও প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন চোখ রাঙানীতে ভিটেমাটি ছেড়েছে এবং বাংলার পুবে এসে ঠাঁই নিয়েছে। পাশাপাশি অন্যপারের বাঙালীরা শাসক গোষ্টি ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ রোষানলে ভিটেমাটি ফেলে পশ্চিমে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে। অর্থাৎ বাঙালী বাংলাতেই রয়েছে। শুধু এপার ওপারের ব্যাপার। কেউ সহায় সম্বল নিয়ে এসেছে। কেউ সহায় সম্বল ছেড়ে ভেগেছে। যাহোক, বাঙালী বাংলাতেই আছে। শুধু নিজ ললাটে বাঙাল ও ঘটি এই তক্মা দুটি লাগিয়ে নিয়েছে। 
এই ঘটি-বাঙাল নিয়ে পশ্চিম বাংলার বাঙালী বাবুরা এখনও মাথা ঘামায়। তাদের মিডিয়াগুলোতে এই বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়ে বেশ চটকদার গল্প উপন্যাস লেখা হয়। ইদনিীং এসব নিয়ে তারা টিভি সিরিয়াল বা সিনেমায় হাত পাকানোও শুরু করে দিয়েছে। তাছাড়া তারা এসব ব’লে বা ক’রে বেশ আত্ম তৃপ্তিতে ভোগে বলেও মনে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে বাঙালদের একটি অংশ এখনও নিজেদেরকে বাঙাল বলে প্রকাশ করতে গর্ববোধ করে। কিন্তু এপার বাঙলা অর্থাৎ স্বাধীন বাংলায় এসবের কোন বালাই দেখা যায় না বললেই চলে। তবে এক্ষেত্রে একটি কারন হয়তো কাজ করতে পারে। এবং সেই অন্তর্দাহে তারা অর্থাৎ পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবি মহল এটাকে নিয়ে হাপিত্যেশ করলেও করতে পারেন। তাদেরই বা দোষ কি। এই একবিংশের বটতলায় দাঁড়িয়ে তারা যখন দেখে তাদেরই ছেড়ে আসা এক সহোদর ভাই বাঙালী হয়ে স্বাধীন বাংলায় রাজ করছে তখন তারা বাঙালী হয়েও ভারতীয় নাগরিকত্বের তকমা লাগিয়ে অন্তর্দাহে জ্বলে পুড়ে মরছে। না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা তাদের। ত্ছাাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের এনআরসি নামক মালাউন (নিকৃষ্ট) মার্কা এক দাওয়াই যখন বাংলা অধ্যুষিত রাজ্যগুলিকে চোখ রাঙাচ্ছে তখন সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট বাঙালী সমাজ সাতচল্লিশের সেই হিন্দু মুসলিম খচ্খচানি ভুলে সত্যিকারের বাঙালী হওয়ার দৌড়কেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। 
সেক্ষেত্রে আওয়াজ যে উঠেছে এবং আরো উঠবে তার লক্ষণ কিন্তু প্রকাশ পাচ্ছে। মমতা দেবীর কথা না হয় বাদই দিলাম। তিনি দলবল ও পারিষদ নিয়ে তার বাংলায় নতুনভাবে সৃষ্টি হওয়া দুর্যোধন ও দুঃশাসনদের মোকাবিলায় ব্যস্ত এখন। তিনি দিল্লীর রাবনদের ঠেকাতেও গলদঘর্ম। তবে মজার ব্যাপার হোল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধী দলীয় সংসদীয় নেতা যখন প্রকাশ্যে তার নিজ ইনস্টিগ্রামে বলেন “আমি বাঙালী এবং বাংলাদেশের বাঙালী”। তখন তার মর্মার্থ কিন্তু অন্য কিছু দাঁড়ায়। আরো হয়তো অনেকে বলছেন বা বলবেন। দীর্ঘশ্বাস এভাবেই বাড়তে বাড়তে এক সময় আগ্নেয়গিরির স্ফুলিঙ্গ তৈরী করবে।
সুতরাং ঘটি/বাঙাল আমাদের প্রতীকি নাম। মোটকথা আমরা বাঙালী। বাংলা আমার দেশ। আমার নেতা যেমন উর্দুওয়ালাারাও নয় তেমনি যমুনা পাড়ের হিন্দিওলারাও নয়। আমাদের আছে সুভাস বোস শরৎ বোসের মত নেতা। আছে সোহরোওয়ার্দি শেরে বাংলার মত বটবৃক্ষ। আছে ক্ষুদিরাম, তিতুমীরের ন্যায় অকুতভয় ত্যাগী তরুন-যুবা আর বাংলার মাটিকে মুক্ত করার অগ্নিমন্ত্রে দিক্ষিত অদম্য সাহসী বীরশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। সর্বোপরি  আমরা যাকে সামনে রেখে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলি জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা। মনে রাখা প্রয়োজন আমরা সেই বাঙালী জাতি যে বাঙলাকে শ্রদ্ধাভরে মহামতি গোখলে তার বিচারকের চেয়ারে বসে বলেছিলেন, What Bengal thinks today India thinks tomorrow.

 


 সুতরাং মন্দির, পুজা-অর্চনা, দুর্গা,কালি,শিব কিংবা মসজিদ, নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাত এসব বাঙালীর যার যার ধর্মীয় নিয়মাচারে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম বিশ্বাস। তবে তা অবশ্যই শাশ্বত সহাবস্থানের সার্বজনীনতায় পুষ্ট। বাঙালীর আশা আকাংখা বাঙালীয়ানার সমগ্রতায় পুষ্ট হোক। বিভাজনের ল⊃2;ণ রেখা গুলোকে উপড়ে ফেলে বাঙালী তার আপন ঐতিহ্যে মূর্তমান হোক এই আশাবাদ ব্যক্ত করে একটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায় রইলাম। 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT