Main Menu

এলেবেলে ভাবনা

জালাল উদ্দিন আহমেদ: অবসরে আছি তাই এলোমেলো ব্যাপার গুলো বেশ চোখে পড়ে। অফুরন্তÍ সময়। ভাবনার ডানাগুলো পাখা মেলে উড়তে চায়। চোখে চশমা সেই তিন যুগ আগে চড়িয়েছি। পাওয়ারের পারদ উঠতে উঠতে তা বেশ পুরু হয়েছে। সেক্ষেত্রে দেখার ভ্রান্ত বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াও মুস্কিল। অবসরের এলিয়ে যাওয়া এই শরীরে এবং পুরু পাওয়ারের ভারী চশমার আবছা দৃষ্টিতে তবুও কেন যেন অচেনা মনে হচ্ছে নিজেকে। সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে নিজের নামটা লিখেছিলাম জীবন যুদ্ধের প্রথম দিনেই। তারপর থেকে বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ অবসরের আদম হয়ে জীবনের শেষ প্রহরে অবস্থান নিয়েছি। আমার এই লেখার তাড়না যেসব বিষয় নিয়ে তা নিয়েই না হয় একটু নাড়াচাড়া করি। পাঠক, স্থির হয়ে বসুন। কবিতার ভাষাতেই বলি-
“এস আজ বস সবে শোন সাতকাহন
কবিতার কন্ঠ আজ রূদ্ধ্র কেন কেন মুহ্যমান”।
রাজনীতিঃ আমরা রাজনীতির শিখরে থাকা ব্যক্তি সমষ্টিকে নিয়ে যেভাবে সময় ও বাক্য ব্যয় করি তা দৃষ্টিকটুভাবে আমাদের চোখ ও কানকে প্রতিনিয়ত জর্জরিত করে তুলে। এক্ষেত্রে রাজনীতির মূল কারিগর হিসাবে যারা তাদের শ্রম ও মেধা লাগিয়ে রাজনীতিকে উচ্চকন্ঠ করতে চান তারা অন্ধকারেই থেকে যান। ফলে রাজনীতি প্রকৃত শুদ্ধাচারে না থেকে ব্যক্তি বা পরিবার তান্ত্রিক হয়ে যায় এবং তা  সমাজ তথা রাষ্ট্রে মধ্যস্বত্বভোগী আগাছা স্বরূপ এক শ্রেণীর পোঁকা সৃষ্টি করে। এখানে স্তাবক আছে, আছে পদাধিকারী পারিষদবর্গ। কিন্তু বিশুদ্ধ রাজনীতির অনুশীলন বা উচ্চারন এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা বোধ হয় রাজনীতির সেই ক্রান্তিকালে আছি।

সমাজ নীতিঃ সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র আজ কেমন যেন নাটবল্টু ছাড়া হাতল বিহীন এক চেয়ার। এ সমাজকে কারা যেন এক অজানা অশান্তির কালো ছায়া দিয়ে চারিদিক আচ্ছন্ন করে রেখেছে।  কোথাও স্বস্তি নেই। অস্থিরতা আজ সমাজের প্রতিটি আনাচে কানাচে। বংশ পরম্পরার সামাজিক শুভ্রতা আজ সমাজে পশ্চিমাকাশের হেলে যাওয়া জ্যেতিহীন সূর্যের মত টিমটিম করছে। সমাজ পরিচালনার যে পরম্পরা আবহমান বাংলায় যুগ পরিক্রমায় আমাদেরকে স্বস্তি দিয়েছে তা এখন নতুন মাত্রার এক উড়নচন্ডী পদচারনার বিবর্তন এনে দিয়েছে। 
সমাজে হোমড়া চোমড়া ও সমাজপতি আজ তারাই যারা কলুষিত পথ ধরে অর্থাৎ সন্ত্রাস মস্তানী করে রাজনীতির ছত্রছায়ায় সামনের সারিতে চলার পথ পেয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী চলনে বলনে তারা আজ সমাজে “ভাই” সম্বোধনে পরিচিত। এই ভায়েরাই তো আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ নিয়ামকের ভূমিকায় অবস্থান করছে। আজকের সমাজে ওরা ওরাই। কোথায় নেই তারা। পাড়া মহল্লা ওয়ার্ড সবখানেই ওদের দৌর্দান্ড আধিপত্য। শৌয-বীর্যে ওদের পদচারনা আজ সমাজ রাষ্ট্র তথা সরকার পরিচালনার সর্বক্ষেত্রেই সপ্রতিভ। ওদের হাজারো অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা আজ রাষ্ট্রজীবনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। সমাজের নিয়মক তো আজ ওরাই। ওদেরই দাপটে সমাজ বদ্ধতার শাশ্বত অঙ্গীকার আজ ফিকে পান্সে হয়ে গেছে। মানুষের মানবিক মূল্যবোধ যেন কচুপাতার ফোঁটাজল। 

শিক্ষা ব্যবস্থাঃ  শিক্ষা অংগনের দিকে তাকালে কি দেখতে পাই আমরা! সত্যিকার অর্থে  সুস্থ্য পরিবেশ ও পরিবেশনা কি আমাদের বিদ্যাপীঠের ঊঠানে আছে! শিক্ষক-ছাত্র সর্বক্ষেত্রে আজ পার্টিজান রাজনীতির সদম্ভ বিচরন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলির কর্ণধার হতে হলে রাজনীতির আর্শীবাদ নিয়ে প্রকাশ্য হতে হয়। শিক্ষকদের দলবাজির কারনে ইদানীংকালের বাংলাদেশের শিক্ষার মান কোন স্তরে নেমে গেছে তা চাক্ষুস দেখা যায়। শিক্ষা প্রশাসন আজ দলবাজির নোংরা আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ছাত্র রাজনীতির নামে দেশে যা চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। ছাত্র রাজনীতির নামে কোমলমতি তরুন-যুবাদের যেভাবে দেশের বর্তমান কলূষিত রাজনীতির পাঠে দিক্ষিত করা হচ্ছে এবং বৈষয়িক আচরনের আঙ্গিনায় বিচরনের অবাধ লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে তা মোটেই শুভ নয়। এভাবে চললে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভবিষ্যত কান্ডারী খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

স্বাস্থ্যঃ  ব্যবস্থার দিকে তাকালে সেখানেও যে সুস্থ্য পরিবেশ নাই তা সহজেই অনুমান করা যায়। এক্ষেত্রে রাজনীতির প্রকটতা না থাকলেও একটা প্রচ্ছন্ন ছায়া বা কায়া যে ওই ময়দানে বিরাজমান তা কিন্তু সহজেই অনুমান করা যায়। সামান্য একটা উদাহারন দিলেই এর মর্মার্থ পাওয়া যাবে। একজন অশীতিপর বৃদ্ধা যিনি এক সময় এদেশের প্রধান শাসক ছিলেন। তিনি একটি কথিত মামলায় দোষী সব্যস্ত হয়ে বর্তমানে জেলে অন্তরীন। তার রোগ জটিলতা ও অবনতিশীল স্বাস্থ্যের চিকিৎসা এদেশে সম্ভব নয় বলে জনশ্রæতি আছে। কিন্তু রাজনীতির কুটিলতায় স্বাস্থ্য বিভাগের নিজস্ব স্বকীয়তার রং ফিকে করে ওই বিষয়ে মেরুদন্ড সোজা করে একটি যুতসই রিপোর্ট তারা আইন বিভাগকে জানাতে পারছে না। অথচ সামান্য সর্দি-কাশি বা অতি সামান্য রোগ নিরাময়ের জন্য কথায় কথায় শাসক বা তাদের দোসররা ইউরোপ আমেকিায় চিকিৎসা সেবা নিতে বিমানে উঠেন। দেশের প্রচলিত স্বতঃসিদ্ধতায় তা ওই স্বাস্থ্য বিভাগের সুপারিশেই সম্পন্ন হয়। তাছাড়া ইদানীংকার করোনা আতংকের এইসব দিনগুলিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তথৈবচ অবস্থা আজ দেশবাসী কেন বিশ্ববাসীও খোলা চোখে দেখতে পাচ্ছেন। 

প্রশাসন ও আইন এবং শৃংখলাঃ  প্রশাসন ও আইনের দিকে তাকালে কতটুকু সুস্থ্য পরিবেশ আমরা ওই উঠানগুলোতে দেখতে পাই ! সত্যি কথা বলতে কি বাংলার প্রতিটি উঠানেই আজ বিষাক্ত অজগরের ফোঁস ফোঁস শব্দ। একজন কাষ্টমস এপ্র্যাইজার থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদের ব্যক্তি সমূহের এবং তাদের পরিবার পরিজনের জৌলুষ দেখে কি আমরা বলতে পারি না যে বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট এই স্বপ্নের সোনার বাঙলায় আজ শকুনীর কচ্কচানিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে গেছে। সরকারী কর্মচারীদের চাকচিক্য ও কলার উঁচিয়ে চলার ধরনে জনগন সহজেই বুঝতে পারে যে এরাই তো এক সময় কোন একটি রাজনীতির ছাত্র ও যুব শাখার ভাই হয়ে আমাদের মাথার উপর ছড়ি ঘুরিয়েছিল। প্রশাসনে এই নব্য ক্যাডারদের আগমন ও উত্থানে ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনের চিরায়িত ভাবমূর্তি আজ ধুলাই গড়াগড়ি খাচ্ছে। 
আইন বিভাগের কথা বলতে মানা। গন্ডির মধ্যে থেকে যা বলা যায় তা হোল সরকারী নিয়োজিত কৌশুলিদের চালনে বলনে এবং তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাবে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ক্ষমতার আশীর্বাদ পুষ্ট হয়ে তারা সরকারী কর্মচারীর চাইতেও একটি রাজনৈতিক গোষ্টির কর্মী হিসাবে নিজেদেরকে পরিচিত করাতে ধন্য হন। 
তাকিয়ে দেখুন শৃংখলা বাহিনীর দিকে। কি মনে হয়! সুষ্ঠ্যভাবে চলছে কি তাদের রোজ-নামচা! তারা কি পারছে? যে শপথ নিয়ে তাদেরকে মাঠে নামানো হয়েছিল সে শপথে তারা কি বিচরন করতে পারছে! আর এই না পারার ফাঁক গলে তারাও আজ সমাজের বিত্তবানের খাতায় নাম লেখার প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছে। এই প্রবনতা আগেও ছিল। কিন্তু ইদানিংকার জবাবদিহিহীনতার শাসনে তারা একটু বেশীই বেপরোয়া বলে মনে হয়।

বিদেশ নীতিঃ বিদেশ ও সার্বভৌম নীতির দিকে তাকালে সেখানে স্বচ্চ¦তা পাওয়া যায় কি? অকৃত্রিম বন্ধু এবং প্রতিবেশীর দোহায় দিয়ে যেভাবে একচক্ষু দৈত্যের ন্যায় বর্তমানের বিদেশনীতি সাজিয়ে রাখা হয়েছে তা মোটেই গ্রহন যোগ্য নয় বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। ঐতিহ্যের পরম্পরা ও বর্তমান নেতৃত্বের গুনে হয়তোবা এটা সাময়িক চালিয়ে নেয়া যাচ্ছে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী পথচলায় তা কখনোই কার্যকরী হতে পারে না। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এতই সুসংগঠিত যে দেশের সার্বভৌম রক্ষার নমুনা হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দু’জন করে বাঙালীকে প্রিয় প্রতিবেশীর বুলেটে ঝাঁঝরা হতে হয়। 
     
অর্থনীতিঃ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যে নয়ছয় ও হরিলুট দৃশ্যমান তা একটি স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংসের অশনি বলেই বিজ্ঞজনেরা বলাবলি করছেন। বাইশ পরিবারের কপাটে লাথি মেরে আমরা তাদের কপাট ভেঙ্গেছি বটে কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম দেশে আজ আমরা বাইশ’শ পরিবার তৈরী করে বাঙালীকে আরো হাড্ডিসার করে ফেলেছি। গার্মেন্টস শিল্প ও রেমিট্যন্স যোগান আছে বলেই হয়তো আমরা এখনো দু’পায়ে দাঁড়িয়ে আছি। 
শিল্পনীতির ভঙ্গুর দোলাচাল আমরা এই করোনা যুগেই টের পেলাম। নিজস্ব বলতে চামড়া, পাট ও চা ই সম্বল। বাকীগুলো সব ধার করা মেরুদন্ড। সুতরাং আর্টিফিসিয়াল মেরুদন্ড লাগিয়ে কতদিন বাঁচা যাবে তাতো এই করোনা জাতীয় দু একটা ধাক্কা খেলেই বোঝা যাবে। আমরা নন-প্রডাক্টিভ খাতে দোদার খরচ করে উপরের চাকচিক্য বাড়াতে ব্যস্ত। অথচ মৌলিকতার নিরিখে শিল্প ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় আমরা উদাসীন বলেই মনে হয়। কৃষিখাতে প্রভূত উন্নয়ন হলেও লাগসই সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষক আজ মাঠ বিমূখ হচ্ছে। ব্যবসা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রাচারে আজ বাণিজ্যের রমরমা সর্ব উঠানে। 

 ভাবনাগুলো এত তিতা বা কষা হোত না যদি আমার দেশের রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থা স্বচ্ছ¡ ও সরল পথে হাঁটাচলা করতো। স্বাধীনতার প াশ বছরে পা ফেলতে যাচ্ছি আমরা। অথচ একটি স্বচ্ছ ও  সহাবস্থানের রাজনীতির আলোকবর্তিকায় আমরা এখনও সিক্ত হতে পারিনি। আমরা এক মহানায়কের তেজদীপ্ত উচ্চারন ও নেতৃত্বে মুক্ত ভুখন্ড পেয়েছি ঠিকই কিন্তু তার সংস্পর্শে নিজেদেরকে শুদ্ধ করে গড়ে তোলার আগেই তাকে হারিয়েছি। মাঝখানে নিজেদের অস্তিত্বের আঁতুড়ঘর খুঁজে পেতে আমাদেরকে পনেরটি বছর জলপাইয়ের বুটে জর্জরিত হতে হয়েছে। গনতন্ত্র পেয়েছি বলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার আগেই আমরা উত্তরাধিকারের রাজনীতির পঁচা প্যাঁকে আঁটকে গিয়ে নিজেদেরকে বিভাজিত করে ফেলেছি। আজকের দিনে উত্তরাধিকারের ঘুনে ধরা এই রাজনীতি আমাদেরকে দুই মেরুর দুই শাসক তৈরী করে দিয়েছে। রাজনীতির প্রকৃত শিক্ষা, সহমর্মিতা, সহাবস্থান, সৌজন্য ও সম্মানবোধের অনুশীলনে না গিয়ে তারা সরাসরি শাসক হয়েছেন। ক্ষমতা ও বিত্ত বৈভব সৃষ্টির সোপান হিসাবে রাজনীতির পরজীবিরা এই নির্ভরশীল অপরাজনীতিতে স্বাচ্ছ¡ন্দ বোধ করছেন বলেই হয়তো আজকের দিনে রাজনীতির এই দূরাবস্থা। নৈতিকতা আমাদের এতই উজ্জ্বল যে, মহান নেতার নামে আমরা উঠতে বসতে যেভাবে প্রাণপাত করি; ব্যক্তি ও সামাজিক অনুশীলনে কিন্তু তার ধারে কাছেও থাকি না। রাজনীতির নৈতিকতা নাই বলেই আমাদের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক নৈতিকতা আজ শতছিদ্র উইপোকার ঢিপি হয়ে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র ও সমাজকে জর্জরিত করছে। 
তো এটাই হচ্ছি আমরা। আরো আছে। সে এক লম্বা ফিরিস্তি। মস্তিষ্ক প্রসারিত করে অনুশীলনে হয়তোবা বিশাল বিশাল ভলিয়্যুম তৈরী হবে। সেখানে শুধুই পাওয়া যাবে মেঠো বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের ঘামের গন্ধ আর দুখিনি বাঙলা মায়ের অ¤ø মধুর জীবন বোধের হাজারো গল্প।    


 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT