Main Menu

অচেনা মায়ের পাগলী মেয়ে

তারিকুল খান: যেসকল মানুষজন ঢাকার জিগাতলা এলাকার ট্যানারী মোড় বা তার আশপাশে থাকেন তারা হয়ত ছবির মেয়েটিকে চিনেন।মেয়েটিকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ২০১৬ সালের শীতকালে।রুপালী ব্যাংকের মোড়ে আমার অফিসে ঢোকার গলির মুখে মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল ময়লা একখানা চাঁদর গায়ে। চেহারাটা ভারি মিষ্টি, বয়স আনুমানিক ২০/২১ হবে, তবে চাহনি ও হাবভাব দেখে বুঝতে কষ্ট হয়না যে মেয়েটি পাগল। মেয়েটির খানিক দূরে মেয়েটির উপর দৃষ্টি রাখছিলেন মাঝ বয়সী পাঁচ ফুট উচ্চতার ক্ষীণ ও বক্রদেহী এক লোক। মনে মনে ধরে নিয়েছি তিনি হয়ত মেয়েটির বাবা। তার পরনেও মলিন পোশাক। সব মিলিয়ে বুঝতে কষ্ট হয়না যে মেয়েটি গরীব ঘরের সন্তান। প্রবাশে থাকা নিজ কন্যার সাথে মেয়েটিকে পাশাপাশি মিলিয়ে নিতে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। জীবনে এরকম আরো পাঁচ/ছয় জন রাস্তার পাগল চিকিৎসা করিয়ে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই মেয়েটিকেও চিকিৎসা করিয়ে দু:খি মায়ের কাছে ফেরত দিব; বিনিময় মা হয়ত মাথায় হাত বুলিয়ে আশির্বাদ করবেন।ওই টুকুই ছিল একমাত্র প্রত্যাশা।
একদিন ড্রাইভারকে দিয়ে মেয়েটির বাবাকে ডেকে আনলাম।সামনে এসে দাঁড়াতে দেখি বাবাটির একটি চোখ অন্ধ।
ইশারা করতে তিনি সামনের চেয়ারে বসলেন।
: কেমন আছেন?
:ভাল। আপনি কেমন আছেন?
: ভাল
: বাসা কোথায়?
: মিয়ার বাড়ী(ট্যানারী মোড়ের সবাই মিয়া ভাইদের বাড়ী চিনেন)।
:রাস্তার মোড়ে চাদর গাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি আপনার কি হয়?
: আমার মেয়ে
: বয়স কত?
: বিশ একুশ
: আপনার মেয়ের সমস্যা কি?
: মাথা খারাপ
: ডাক্তার দেখিয়েছেন?
: না, তবে পীর , ফকির, কবিরাজ দেখিয়েছি।
: ভাল হয়েছে?
: না


আমাদের সমাজে শিক্ষিত/অর্ধ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত প্রায় সব স্তরেই দেখেছি মস্তিস্ক বিকৃতির কারন মানুষের ক্ষতি করা বা তাবিজ কবজ এর ফল বলে মনে করেন। এটিকে তারা ডাক্তারের চিকিৎসাযোগ্য কোন রোগ বলেও মনে করেন না। এই রোগকে পীর ফকির দরবেশের ঝাড় ফুঁকের অসুখ বলে মনে করেন।আমি তাকে পূনরায় জিজ্ঞেস করি-
: আমি যদি আপনার মেয়েকে ডাক্তার দেখিয়ে দেই, আপনি রাজী আছেন? হাসপাতালে তিন/চার সপ্তাহ থাকতে হবে।ইনশাল্লাহ ভাল হয়ে যাবে।
: কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন তারপরে বললেন, আমি ওর মার সাথে কথা বলে আপনাকে জানাব।
: ঠিক আছে।
আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বাবাটিকে সব বুঝিয়ে বললাম; মিরপুর সাড়ে এগার নম্বরে ডা: হেদায়েতের মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ” ৩/৪ সপ্তাহ থাকতে হবে। এসময়ের যাবতীয় দায়িত্ব আমার।
বাবাটি সব শুনলেন, আমার কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না; তিনি চলে যাবার পরে আমি বেশ ক’দিন আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছি; কিন্তু তিনি আর এলেন না এবং আজো এলেন না। আমিও আর কোনদিন খোঁজার চেষ্টা করিনি, কারন পাগলিটা একটা মেয়ে আরো অল্প বয়সী এবং রুপসী । বাবাটা কি ভেবেছে জানিনা। হয়ত কোন দূরভিসন্ধির কথা ভাবতে পারেন; অপরিচিত কোন মানুষ ডেকে নিয়ে সহায়তা করবে, কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই কোন মতলব থাকতে পারে।আমি নিজে কিছুটা সংকেচবোধ করি; আসলে এটা মনে হয় ঠিকক করিনি, লোকটা না আমাকে বাজে কিছু ভাবছে।

বছর চারেক পরে ২০২০ সনের ১২ই মে বিকেল তিনটার দিকে অফিস থেকে বেরোতেই প্রায় একই যায়গায় রুপালী ব্যাংকের কাছে আগের মতই মেক্সির উপরে চাদর গায় মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। চেয়ারায় সে লাবন্য নেই। উস্ক খুস্ক চুল, মলিন কাপড়।মাটি মাখা পায় রাবারের স্লিপার। স্পষ্ট বোঝা যায় অনেক দিন শরীরে জল সাবানের ছোঁয়া পরেনি। শরীর খুব একটা সোজা করে চলতে পারেনা, সামনের দিকে ঝুঁকে পরে। পেটে দানাপানি ঠিকক মত পরে বলে মনে হয় না।চোখ কোটরাগত।কারো কাছে কিছু চায়না। কোন চিৎকার চেচামেচি নেই; শুধু রাস্তার পাশে ফ্যাল ফ্যাল করে দাঁড়িয়ে থাকা।দেখলাম মাত্র চার বছরে কোন এক মায়ের ২৪/২৫ বছরের পাগলী মেয়ে নাসিমার ৩৫/৪০ বছরে পৌঁছে যাওয়া।

সেই এক চোখ অন্ধ বুড়িয়ে যাওয়া বাবাটা আজও অদুরে দাঁড়িয়ে পাগলীটাকে দেখছে।জানিনা ওর মা জানে কিনা যে কেউ একজন নাসিমা পাগলীর চিকিৎসা নিজ ব্যায় করিয়ে দিতে চেয়েছিল।

ড্রাইভারকে দিয়ে ২/৩টা ছবি তুলে আনলাম।গাড়ীর ব্যাক সীটে হেলান দিয়ে নিজ চোখে নিজেরই ব্যার্থতা নিরবে অবলোকন করলাম। এসির ইন্ডিকেটরটা আরো বেশী ঠান্ডামুখী করে নিলাম। মনের ভেতর অজস্র ভাবনায় মেয়েটির বিগত জীবনে কি কি দু:সহ ঘটনা ঘটতে পারে তা ভাবতে ভাবতে বাসা অব্দি পৌঁছালাম।গাড়ী থেকে নামার সময় ব্যাক শেলফ থেকে হাত মুখ মোছার এক পিস সাদা কাগজ টেনে চোখ মুছে ওয়েস্ট বক্সে ফেলে দিলাম।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT