Main Menu

ঈদ বিভ্রাট

তারিকুল খান: রোজা প্রায় শেষ। আর ক’দিন পরেই হবে ঈদ এবং তার দু’এক দিন আগে হবে চাঁদ দেখা নিয়ে বিতর্ক। এটা এখন প্রতি বছরের নিয়মিত বিষয়। ঈদ এখন কোন কোন যায়গায় একই বাড়ীতে দুই দিনে হয়ে থাকে। বাড়ী বলতে আমি এপার্টমেন্ট বাড়ী অথবা গ্রামের বাড়ী যেখানে পাশাপাশি অনেকগুলো পরিবার বসবাস করেন তা বুঝাতে চেয়েছি।

পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকে আছেন যারা পীরের মুরিদ। সবার পীর আবার এক নয়, বিভিন্ন জনের পীর বিভিন্ন যেমন: মাইজভান্ডারী, আটরশী, এনায়েতপুরী, শর্শিনা, জৈনপুরী, চর মোনাই, দেওয়ানবাগী ইত্যাদি। কেউ আছেন তবলীগ পন্থী; তবলীগীরাও আবার দুই ভাগ, জুবায়ের ও সাদ পন্থী। মুসলিমরা চার মাযহাবে বিভক্ত। কেউবা আবার হচ্ছেন লা-মাযহাবী বা কোন মাযহাবই অনুসরণ করেন না। অনেকে আছেন ওয়াহাবী এবং কেউবা আছেন মওদুদীপন্থী।
এক আল্লাহ, এক রাসুল ও এক ইসলাম। তবে ধর্ম পালন ও ধর্মের আচার অনুষ্ঠান নিয়ে এদের আছে বিপরীতমুখী নানান ব্যাখ্যা ও মতবাদ। প্রত্যেকেরই আছে নিজ নিজ তত্ব ও তথ্যের পক্ষে দলিল। এরা কেউ নিজ নিজ যুক্তি ও জ্ঞাণ থেকে একচুলও সরতে রাজী নন। এরা কখনো কখনো ভিন্ন মতানুসারীকে বাক্যবানে তুলোধুনো করে ছাড়েন এবং নানান চ্যালেন্জ ছুড়ে দেন।

নামাজ, রোজা এবং ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানাদি পালন করার জন্য দিন, ক্ষণ ও সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ন।
যেমন নামাজ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত। ফজরের নামাজ সুবহ সাদেকের সময় অর্থাৎ পূর্ব দিগন্তের সাথে সূর্য ১৮ ডিগ্রীতে অবস্থান করলে আরম্ভ হয় এবং সূর্য্যদয়ের আভাস বা পূর্বাকাশে লালিমা দ্বারা সমাপ্ত হয়।

যোহর ও আছরের সময় নিজ ছায়া বা লাঠির ছায়ার দিক ও দৈর্ঘ্য দ্বারা নির্ধারন করা হয়। সূর্যাস্ত দ্বারা নির্ধারন করা হয় মাগরীবের সময়। ঊপরে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো যখন ঘড়ির প্রচলন হয়নি তখন ব্যাপকভাবে অনুসরন করা হত।কিন্তু ঘড়ি প্রচলন যখন ব্যাপক হল তখন নামাজের সময় নির্ধারনের জন্য চাঁদ বা তারার অবস্থান, সূর্য্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং ছায়ার দৈর্ঘ্য ও দিক এর উপর নির্ভর না করে বরং ঘড়ির কাঁটায় ঘন্টা মিনিট হিসাব করে সুনিপুনভাবে নির্ধারন করা হয়।মসজিদ গুলোতে এখন ইলেকট্রনিক বোর্ডে নামাজের সময়সূচী ঘন্টা মিনিটে প্রদর্শন করা হয়।

রোজার দিনে ইফতারের সময় হল সূর্যাস্তের পরে। ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি মেঘলা বা বাদলা দিনে মুরব্বিরা আছরের সময় নির্ধারন করতেন ঝিংগে ফুল ফোঁটা দেখে, মাগরীব বা ইফতারের সময় নির্ধারন করতেন মুরগীর খোপে ঢোকা বা অনুরুপ কিছু প্রাকৃতিক নিদর্শন দেখে । কিন্তু আলোকিত বা মেঘলা দিন যাই হোক না কেন, এখন আর সূর্য্য ডোবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিদর্শনের উপর নির্ভর না করে বরং ঘড়ির কাঁটায় ভড় করে ইফতার ও মাগরীবের সময়সূচী নির্ধারন করা হয়। সেহরীর ক্ষেত্রেও তাই রাতের চাঁদ তারার অবস্থানের উপর নির্ভর না করে ঘড়ির কাঁটায় নির্ধারন করা হয় সঠিক সময়সূচী। এপদ্ধতিতে সারা বছরের জন্য নামাজ, সেহরী ও ইফতারের সময়সূচী তৈরী করে বাৎসরিক ক্যালেন্ডারও করা হয়ে থাকে।

আমরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতে যারা বসবাস করি তারা সাধারনত কিবলার অবস্থান পশ্চিম দিকে ধরে নামাজ আদায় করি। কিন্তু সঠিক বিচারে তা কিন্তু নয়। এরকম একটা বিশাল ভূখন্ডের জন্য কিবলার দিক কেবলমাত্র পশ্চিম দিক নয়। ইদানিং কম্পাস ব্যাবহার করে কাবার সঠিক অবস্থান নির্নয় করে কিবলা নির্ধারন করা হচ্ছে। অনেকে এ সংক্রান্ত এপ্ মোবাইল ফোনে ধারন করে কিবলা
নির্ধারন করে নামাজ আদায় করছেন।

চাঁদ, সূর্য্য, গ্রহ ও নক্ষত্রের ডোবা উঠা, দেখা বা না দেখা ভৌগলিক অবস্থান ও আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল। আবহাওয়ার উপর নির্ভরতা কাটাতে ব্যবহ্রত হয় ঘড়ি ও বৈজ্ঞানিক হিসেব নিকেশ। ঘড়ি দ্বারা সময় নির্ধারন সুনির্দিষ্ট এবং সর্বজন গ্রাহ্য। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসেব নিকেশ দ্বারা চাঁদ ও সূর্য্যের ভৌগলিক ও আপেক্ষিক অবস্থান নির্নয় করে অমাবশ্যা পূর্নিমাসহ দিন, রাত ও ক্ষণের নানান বিষয় নিখুঁতভাবে নির্ধারন করা যায়।

রোজা ২৯ না ৩০টা হবে তা নিয়ে একটা টানাটানি প্রতি বছরই আমরা দেখে আসছি। রোজা রাখা ও রোজা ভাংগার জন্য চাঁদ দেখার আবশ্যকতা ইসলামের বিধান। এ বিধানটি হয়েছিল যখন, তখন ঘড়ি ছিল না বা বৈজ্ঞানিক হিসেব নিকেশও ছিলনা এবং থাকলেও তা নিখুঁত ছিল না। কাজেই সেসময়ের জন্য ঐ বিধানটি ছিল সর্বোত্তম।
চাঁদ দেখা বা না দেখা আবহাওয়া ও ভৌগলিক অবস্থানের উপর নির্ভরশীল।ইদানিং শহুরে জীবনে আকাশ মেঘমুক্ত থাকলেও বহুতল ভবনের উচ্চতা ভেদ করে চাঁদ দেখা বেশ কঠিন।চাঁদ দেখার বিভ্রাটের কারনে কোন কোন বছর রাত এগারটা বা তারও পরে ঘোষনা করা হয়েছে যে আগামীকাল ঈদ। ঈদের ঘোষণার আগেই পরের দিনের জন্য মসজিদে বা ঘরে তারাবীর নামাজ আদায় হয়েছে, অনেকে ঘুমাতে গিয়েছেন এবং পরের দিনের জন্য সেহরী ও রোজার আয়োজন করে ফেলেছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেক সময় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি সঠিক সময় সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি।

বিগত অনেক বছর ধরে বাংলাদেশে দুই মতবাদে ঈদ উদ্জাপিত হচ্ছে- প্রথম মতবাদ হল চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও ভাংগা; অধিকাংশ মানুষজন এই পথের অনুসারী। ২য় মতবাদ অনুযায়ী, কিছু মানুষ সৌদি আরবে যেদিন ঈদ হচ্ছে সেদিন ঈদ উদযাপন করছেন ।অর্থাৎ নিজে বা নিজ দেশের কারো চাঁদ দেখার উপর নির্ভর না করে সৌদী আরবে চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করছেন।ফলে পাশাপাশি দুই বাড়ীতে বা একই বাড়ীর দুই ফ্লাটে দুই দিনে ঈদ উদ্জাপিত হচ্ছে।

আমরা যেভাবে নামাজের সময় নির্ধারন, সেহরী খাওয়া, ইফতার করা ও কিবলা নির্ধারনের জন্য বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করছি, সেভাবে মেঘলা দিনের চাঁদ দেখা বা না দেখা বিষয়টি বৈজ্ঞানিক নিয়মের উপর নির্ভর করতে পারি কিনা? যদি পারা যায় তাহলে অনেক আগে থেকেই বলা যাবে রোজা ২৯ না ৩০টা হবে। রোজার সংখ্যা পূর্ব থেকে নির্ধারন করা গেলে তা অনেক সিদ্ধান্ত সঠিক সময় নিতে সহায়ক হবে। তাতে কি আমাদের ধর্মের নিয়মের কোন গুরুতর ব্যতিক্রম হবে?

যারা সৌদী আরবের সাথে মিল রেখে রোজা রাখছেন ও শেষ করছেন, তারা কিন্তু নিজে বা নিজ দেশে কারো চাঁদ দেখার উপর ভরসা না করেই রোজা আরম্ভ ও শেষ করছেন।ইদানিং সৌদী আরবের সাথে একই দিনে রোজা আরম্ভ ও শেষ করার দেশ ও মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যদি ষোল কোটি মুসলমানের রোজা আরম্ভ ও শেষ করার ব্যাপারে আকাশে আলো বা মেঘের উপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক সমাধানের আশ্রয় নেয়া হয় তবে সেটা ইসলাম ধর্মের মৌলিক নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক হবে কি? যদি নামাজের সময় নির্ধারন, ইফতার ও সেহরীর সময় নির্ধারনের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক সমাধানের আশ্রয় নেয়া যায়, তাহলে রোজা আরম্ভ ও শেষ করার ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক সমাধানে সমস্যা হবে কেন?

মহান আল্লাহ তায়ালা বৈচিত্র্য পছন্দ করেন এবং বিভেদ অপছন্দ করেন।

উপরে আলোচিত বিষয় জ্ঞাণীদের মতামত গুরুত্বপূর্ন।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT