Main Menu

হন্টন

(দুই)
রাশেদুল ইসলাম: 

ডাঃ ফেরদৌস এঁর কথাগুলো হৃদয় ছোঁয়া । 
ডাঃ ফেরদৌস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন বাঙালি । করোনা প্রাদুর্ভাবের পর পাকা দুই মাস  গড়ে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা কাজ করেছেন তিনি । নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন  সকলের জন্য উন্মুক্ত করেছেন । রাতদিন হাজার হাজার করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবা ও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি । আর এসবই তিনি করেছেন বিনা পারিশ্রমিকে । শুধু আমেরিকা প্রবাসী  বাঙালি নয়, যে কোন করোনা রোগীর প্রতি সমান গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই করোনা সংকটকালে  করণীয় বিষয়ে সরাসরি তাঁর অভিজ্ঞতা অনলাইনে নিয়মিত শেয়ার করেছেন । তাঁর কথাগুলো শুনতে শুনতে গভীর শ্রদ্ধায়  মাথা নত হয়েছে বার বার। একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে বিপদাপন্ন মানুষের সেবা করতে করতে এক সময়  অসাধারণ হয়ে ওঠেন, একটা আইকনে পরিণত হন -তার বাস্তব উদাহরণ ডাঃ ফেরদৌস নিজে  । আজকের এ লেখার শুরুতেই আমি ডাঃ ফেরদৌস এঁর  প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । 
আমার লেখার বিষয় ‘হণ্টন’ । লেখক  হুমায়ূন আহমেদের ‘হণ্টন ‘ । হুমায়ুন আহমেদ মনে করেছেন তাঁর সফলতার মূলে কাজ করেছে ‘হণ্টন’ । মানে হাঁটা । আমার মনে হয়,  শুধু হুমায়ূন আহমেদ নয়, যে  কোন মানুষের,  যে কোন দিকে সফলতার মূলে কাজ করে এই  ‘হণ্টন’ ।  এ কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই  আমার আগের লেখার ধারাবাহিকতায় আজকের এই লেখা । 
এটা জানা কথা যে, হাঁটার জন্য একটা  পথ লাগে । পথ ছাড়া হাঁটা যায় না তা হয়; কিন্তু সেই হাঁটা হয়  ঘুরপাক খাওয়া মাত্র । এক ধরণের পণ্ডশ্রম । হাঁটলে একটা লক্ষ্য নিয়ে হাঁটতে হয় । গন্তব্য ঠিক করে হাঁটতে হয় ।  এ জন্য পথ জানা লাগে । চেনা লাগে । যে কোন পথে হাঁটলেই গন্তব্যে পোঁছানো  যায় না ।  তাই পথ চিনে,  ঠিক পথে হাঁটতে হয় । কিন্তু  গন্তব্য কাকে বলে ?  আসলে মানুষ যা কিছু করে, তার একটা লক্ষ্য থাকে । এই  লক্ষ্যকে গন্তব্য বলে । একজন মানুষের ছোট ছোট অনেক লক্ষ্য থাকে । এইসব   ছোট ছোট  লক্ষ্য  মিলে একটা চূড়ান্ত লক্ষ্য হয় । কিন্তু,  একজন মানুষ নিজের ছোট ছোট লক্ষ্য বুঝলেও,  তার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী,  তা  বুঝতে পারে না ।  মূল সমস্যা এখানেই । যেমন  জন্মের পর  একটি শিশুর  প্রথম  লক্ষ্য থাকে  কথা বলা শেখা ।  তারপর হামাগুড়ি দেওয়া ।  হাঁটতে শেখা ইত্যাদি  । এগুলো সে কেন করে ? কারণ,  শিশুটি বড়দের মত হতে চায় ।   তারপর  শুরু হয় তার  শিক্ষাজীবন । শিক্ষা জীবনের পথ সাধারণত বাবা মা দেখিয়ে থাকে । লক্ষ্য থাকে  শিশুটিকে একটা  পেশার  উপযোগী করে তোলা; যেন শিশুটি বড় হয়ে নিজের ও তার পরিবারের  জীবিকা নির্বাহ করতে পারে ।  তারমানে  একজন মানুষের জীবনের উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য হোল   নিজের ও তার পরিবারের  জীবিকা নির্বাহ করা । কিন্তু কেন ? কারণ বাবামা চান  পারিবারিক জীবনে  তাদের সন্তান সচ্ছল ও  সুখী  হোক । এক সময় বাবামার চাওয়া এবং সন্তানের চাওয়া এক হয়ে যায় । কিন্তু কেন ? কারণ মানুষ   নির্ভেজাল একটা শান্তির জীবন চায় ।  তারমানে একজন মানুষের  চূড়ান্ত লক্ষ্য জীবনে শান্তি পাওয়া । কিন্তু  শান্তি যে একজন মানুষের   জীবনের আসল চাওয়া-  এটাই বেশীর ভাগ  মানুষ জানে না ।  ফলে ছোট এক একটা  লক্ষ্য সামনে রেখে সে  হাঁটতে থাকে । কিন্তু সেই ছোট ছোট লক্ষ্য হাসিল হলেও চূড়ান্ত   শান্তির পথ  খুঁজে পায় না সে  ।
 বিষয়টি ব্যাখ্যার আগের  প্রশ্ন  মানুষের জীবন কয়টি ? 
 মানুষ,  বিশেষ করে  এই উপমহাদেশের  মানুষ  ধর্মবিশ্বাস দ্বারা তাড়িত । জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ডওমিটার এর হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪৪ লক্ষ ৪৪ হাজার ৯ শ’ ৮ জন (৬ মে, ২০২০) । ২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী এ দেশের শতকরা ৯০  ভাগ মানুষ মুসলমান এবং ৮.৫ ভাগ  হিন্দু ।  ধর্ম  আমাদের দেশের মানুষের কাছেও   অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় । নিজে ধর্মপালন করুক   আর না করুক - তারা যে কোন সময় নিজের ধর্মের জন্য জীবন দিতে  সদা প্রস্তুত যেন !  আর, প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস মতে মানুষের জীবন দুটি ।  একটি চলমান জীবন । আর একটি জীবন শুরু হয় মৃত্যুর পর । একটা  ইহলৌকিক জীবন । অন্যটি পারলৌকিক । তাই, ধার্মিক  মানুষ শুধু একজীবনে শান্তি চায় না; তার  দুটি জীবনেই শান্তি চায় । অর্থাৎ আমাদের মত  সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইহলৌকিক ও  পারলৌকিক- উভয়  জীবনের শান্তি । 
এখন প্রশ্ন মানুষের  ইহলৌকিক ও  পারলৌকিক জীবনের শান্তির পথ কি এক- না   আলাদা ? 
প্রচলিত ইসলাম এবং সনাতন হিন্দু-  উভয় ধর্মের বিধান মতে মানুষের  পার্থিব  ও  মৃত্যু পরবর্তী  জীবনের শান্তির পথ এক ও অভিন্ন  হতে পারে । অর্থাৎ,  ইহলৌকিক জীবনে শান্তি অর্জনের জন্য যে কাজ করা হয়;  সেই একই কাজ দিয়ে পারলৌকিক জীবনের শান্তি অর্জন করা সম্ভব- যদি সঠিক পথ চিনে সেই পথে হাঁটা যায়  ।  
 প্রথমে ইসলাম ধর্মের কথাই  বলি । 
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ্‌ মানুষের জন্য সুস্পষ্ট চলার পথ নির্দেশ করেছেন -  যে পথে হাঁটলে বা অনুসরণ করলে একজন মানুষ ইহলৌকিক ও  পারলৌকিক উভয়  জীবনে শান্তি পেতে পারে ।  কোরআনে যে সকল পথের কথা বলা হয়েছে তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপঃ

সহজ সরল আলোকিত পথ ( সূরা ফাতিহা, আয়াত ৫ ও ৬ )
সত্য পথ (সূরা বাকারা, আয়াত ২১৩)
সরল পথ, ইব্রাহিমের পথ (সূরা আনআম, আয়াত ১৬১)
আল্লাহর পথ, সত্য পথ (সূরা তওবা, আয়াত ১৯)’
সরল পথ (সূরা ইউনুস, আয়াত ২৫ )
সরল  পথ, আল্লাহর পথ (সূরা শুরা, আয়াত ৫২, ৫৩) 
ধর্মের পথ, অধর্মের পথ ( সূরা বালাদ, আয়াত ৮-১১) ইত্যাদি ।  
পবিত্র কোরআনের বহুল ব্যবহৃত এবং বহুল পঠিত সূরার নাম সূরা ফাতিহা । এই সুরাকে উম্মুল কোরআন বা কোরআনের জননী বলা হয় । প্রত্যেক মুসলমান দিনের ৫ ওয়াক্ত নামাজে কমপক্ষে ৩২ বার এই সূরা ফাতিহা পাঠ করে । এই সূরার মাধ্যমে একজন মুসলমান দিনে কমপক্ষে ৩২ বার  নিজেকে সহজ সরল পথে পরিচালনার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানায় । সূরা ফাতিহাতে যে সহজ সরল আলোকিত পথের কথা বলা হয়েছে তার অর্থ এবং কোরআনে বর্ণিত অন্যান্য পথ যেমন, সরল পথ, ইব্রাহীমের পথ, আল্লাহর পথ, ধর্মের পথ মূলত একই । কিন্তু দুঃখজনক হোল  আমাদের দেশের বেশীর ভাগ নামাজী জানেন না যে, তিনি প্রতি ওয়াক্ত নামাজে  জীবনে সহজ সরল পথে চলার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন । কারণ, তিনি না বুঝেই  সূরাটি পড়েন । যদি তিনি বুঝে সূরাটি পড়তেন,  তাহলে তাঁর প্রশ্ন হত, সহজ সরল পথ কোনটি ? 
মানুষের সহজ সরল জীবনযাপনের একটা চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় সূরা বালাদ এ । এই সূরার সারকথা এই যে, মহান আল্লাহ্‌ মানুষকে কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমনির্ভর করে তৈরি করেছেন । মানুষ তার পরিশ্রমলব্ধ অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি ধর্মের দুর্গে প্রবেশ করবে  । ধর্মের দুর্গ  হচ্ছে সৎকর্মের সুউচ্চ স্তর । এই স্তরে থেকে সৎকাজে অংশ নেওয়াসহ বিশ্বাসীদের সাথে সংঘবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে বিশ্বজনীন মমতা ও সবরে উদ্বুদ্ধ করবে । এটাই একজন ধার্মিক মুসলমানের কাজ । যিনি এই বিধান অনুসরণ করবেন তিনিই  সফলকাম । 
লেখার শুরুতেই আমি  ডাঃ ফেরদৌসের কথা উল্লেখ করেছি  । করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে  তিনি তাঁর সহজাত বিচারবুদ্ধি দিয়ে মানুষের কল্যাণের একটি সহজ সরল পথ খুঁজে নিয়েছেন ।  তিনি নিজে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার । করোনা সংকটকালে তাঁর মেধা,  দক্ষতা ও প্রজ্ঞা বিপদাপন্ন মানুষের কাজে লাগানো তাঁর নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব বলে  মনে করেছেন তিনি ।  প্রবাসী বাঙালিসহ করোনা আক্রান্তদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন তিনি । একই সাথে নিজের দেশের মানুষকে করোনা মহামারির ভয়াবহতা ও করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ সবরে  সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন  । 
আমাদের সমাজে  অনেকেই  অন্যের জন্য কিছু করতে চান  না । শুধু নিজে করেন না  তা  নয়; অন্য মানুষও যেন কারো জন্যে কিছু না করে,  সেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন অনেকেই  । এজন্য  কেউ কারো জন্যে  কিছু করলে,  কিভাবে তাঁকে থামিয়ে  দিতে হয়,  তা তাঁরা খুব ভালো জানেন । ডাঃ ফেরদৌসকেও অনেকে বিভিন্নভাবে  থামাতে চেয়েছেন । কিন্তু  যেহেতু তিনি তাঁর সহজাত বিচারবুদ্ধি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাই কেউ তাঁকে থামাতে পারেনি । ডাঃ ফেরদৌস নিজেও জানেন না, তাঁর এই মহৎ কাজের দ্বারা ইসলাম ধর্মের  বিধান অনুযায়ী একজন সহী মুসলিম ধার্মিকের কাজ করে ফেলেছেন তিনি । 
 ডাঃ ফেরদৌস তাঁর মানব সেবামূলক  কাজের দ্বারা একদিকে  নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন;  অনাবিল  মানসিক শান্তি পেয়েছেন তিনি । অন্যদিকে  এই একই কাজের দ্বারা  তিনি তাঁর পরকালের পথ পরিস্কার করেছেন । 
লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল । এ ধরণের  নিরস আলোচনা অনেকে পছন্দ করেন না । তবে, কারো কারো ভালো লাগলে লেখাটা চলমান রাখা যেতে পারে  ।
সকল করোনা যোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা । 
ঢাকা, ৭ এপ্রিল, ২০২০ । 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT