Main Menu

হন্টন

রাশেদুল ইসলাম:  হন্টন । মানে হাঁটা । শব্দটা হুমায়ূন আহমেদ থেকে নেওয়া । আমি জেনেছি একজন সাংবাদিকের লেখা থেকে । সাংবাদিকের নাম আমার মনে নেই । তিনি হুমায়ূন আহমেদের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন । তাঁর একটি প্রশ্ন ছিল,  লেখক হুমায়ূন আহমেদের সফলতার পিছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কার ? 
এ প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, ‘হন্টন’। 
এ কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে হুমায়ূন আহমেদ জানান,  তিনি প্রচুর হাঁটেন । ঢাকা শহরের অলিতে গলিতেও  তিনি হাঁটেন । তাঁর লেখার চরিত্রগুলো হাঁটা থেকেই পাওয়া । এমনকি তিনি যখন লেখেন, তখন দুএক প্যারা লেখা হোলেই,  তিনি হাঁটেন । এক কথায় তাঁর জীবনের সফলতার মূলে কাজ করেছে  ‘হন্টন’ । 
হুমায়ূন আহমেদ আমার প্রিয় লেখক । পৃথিবীর সফলতম লেখকদের একজন তিনি । শুধু লেখা দিয়ে যে, কোটি কোটি মানুষের মনে স্থায়ী দাগ কাটা যায়, তার বাস্তব উদাহরণ হুমায়ূন আহমেদ নিজে । ব্যক্তি জীবনে অসম্ভব কৌতুক প্রিয় ছিলেন তিনি ।  নিজের জীবনের অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়েও কৌতুক করেছেন তিনি । তাই, তিনি  যখন  তাঁর জীবনের সফলতার মূলে  ‘হন্টন’ উল্লেখ করেন; তখন প্রথমে  আমার মনে হয়েছে,  এটা একটা  কৌতুক মাত্র । কিন্তু, পরক্ষনেই  মনে হয়েছে,   না ।  এটা  কোন কৌতুক নয় । বরং, এ কথা দিয়ে  হুমায়ূন আহমেদ  শুধু তাঁর নিজের কথা নয়; মানবজীবনে সফলতার  ক্ষেত্রে একটি শাশ্বত সত্যের  কথা বলেছেন । 
অনেকে কালোজিরাকে  সর্বরোগের ঔষধ বলে থাকেন । শারীরিক সুস্থতার জন্য কালোজিরা কতটা কার্যকরী আমার জানা নেই । তবে,  যে কোন ধরণের সফলতার ক্ষেত্রে মূল ঔষধ যে  ‘হন্টন’ – তা বোধহয় প্রমাণিত সত্য । বিশেষ করে  আমাদের দেশের মত দেশগুলোতে এটা অনেক বেশী  কার্যকর । চাকুরী, পদোন্নতি,  ব্যবসা,  বানিজ্য বা যে কোন ক্ষেত্রে উন্নতি করা বা  সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা এই ‘হন্টন’ এর । শুধু হাঁটার প্রকারভেদ  জানতে  হয় । জানতে হয়  কোথায় কিভাবে হাঁটতে হয় । যারা  লক্ষ্য স্থির করতে পারেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথানিয়মে হাঁটতে পারেন,  বিজয় তাঁদের সুনিশ্চিত । আমার কাছে যারা তদবিরে আসেন, তাঁদের অনেককেই আমি এই ‘হন্টন’ ফর্মুলার কথা বলেছি । অনেকে ভালো ফল পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন । তবে, বিখ্যাত অনেক ডাক্তার যেমন নিজের চিকিৎসার জন্য মোটেও ভালো নন;  আমার ক্ষেত্রেও তাই । অন্যকে পরামর্শ দিলেও,  নিজের ক্ষেত্রে এ লাইনে   আমি যে  বেশ দুর্বল  - সেটাও প্রমাণিত । 
যাহোক  আমার আজকের লেখার বিষয় অবশ্য এতকিছু নয় । আমার লেখার বিষয় নিজের  স্বাস্থ্য ভালো রাখা নিয়ে । আর, আমার মত  চাকুরীজীবী  একজন সাধারণ মানুষের  স্বাস্থ্য ভালো রাখার মূল মন্ত্রও   ‘হন্টন’ । তাই, এত কথার অবতারণা !  
আমি ছোটকালে বইয়ের পোকা ছিলাম । খেলাধুলায় কোন আগ্রহ ছিল না । ‘স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল’  জানা থাকলেও কোন স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি আমার । আসলে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য স্বাস্থ্য যে অনেক বড়  বিষয়, খেলাধুলা  বা  বিভিন্ন ধরণের ব্যায়াম যে স্বাস্থ্য  সুরক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক –আমার ছেলেবেলায় তা জানা হয়নি । এ বিষয়ে আমার বোধোদয় হয় ১৯৮০ সালের দিকে – আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে । তখন নতুন করে খেলোয়াড় হওয়া বা খেলাধুলায় ভালো করার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে  । সে কারণে  শুধু  স্বাস্থ্য ভালো রাখার  জন্যই  ‘হন্টন’ শুরু করি আমি ।  ‘হন্টন’ মানে সকালে হাঁটা – মর্নিং ওয়াক করা ।
কিন্তু ‘হন্টন’ কেন ? 
আসলে প্রথম প্রশ্ন হওয়ার উচিত  মানুষ অসুস্থ  হয় কেন ? 
আগেই বলে রাখা ভালো,  আমি ডাক্তার নই । এমনকি আমি বিজ্ঞানের ছাত্রও নই । নির্ভেজাল কলা বিভাগের ছাত্র আমি । ফলে, এ বিষয়ে   ব্যাখ্যা ভুল হতে পারে । তবে,  শুদ্ধ করার জন্য  বিজ্ঞানের অনেক ফেসবুক বন্ধু আছেন আমার । আমি বরং  আমার নিজের  কথা বলে যাই । 
আমার মনে হয় শরীরে রক্ত চলাচল  ঠিক থাকাই সুস্থতা ।  শরীরের কোন জায়াগায় রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়া মানে,   অসুস্থতা শুরু । একজন মানুষের পায়ের নখ থেকে মাথার খুলি পর্যন্ত,    প্রতি শিরা-উপশিরায় যদি রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে – তাহলে তিনি সুস্থ । যারা  নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাঁদের  শরীরের রক্ত সঞ্চালন নিয়ে কোন সমস্যা  নেই ।   আসলে মানুষের দেহকাঠামো এমনভাবে তৈরি যে, একমাত্র কাজ করার মাধ্যমেই তা  সুস্থ রাখা যায় । এজন্য ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘Action is life, inaction is death’ । অর্থাৎ,  ‘কর্মই জীবন; নিষ্ক্রিয়তাই মৃত্যু’ ।  কিন্তু, আমার মত যারা দৈহিক পরিশ্রম করেন না – তাঁদেরই  সমস্যা । এ সমস্যা মূলত দেহের রক্ত চলাচল ঠিক রাখা নিয়ে । এজন্য অনেক প্রকারের ব্যায়াম আছে । কিন্তু ‘হন্টন’ কেন ? 
আমার দুর্বলতা আসলে ভোরের প্রকৃতির প্রতি । ভোরের ঝিরঝিরে বাতাস, পাখির কিচিরমিচির আমাকে সম্মোহিত করে । আমি হাঁটি  । ১৯৮০ সালের পর থেকে  দেশেবিদেশে, ঝড় বৃষ্টি বা ঝঞ্ঝা  যাই হোক –  এমন দিন খুব  কম গেছে,  যেদিন আমি  হাঁটতে বের হইনি । আমার মনে হয়েছে এই ‘হন্টন’  গতি থেমে যাওয়া মানে  মৃত্যু । অথচ,  লকডাউন আমাকে থামিয়ে দিয়েছে । করোনা ভাইরাস আমার হাঁটার গতি থামিয়ে দিয়েছে । কিন্তু,আমার সুবিধা হোল, আমি একজন মানুষ – সৃষ্টির সেরা জীব । মানুষ নামক এই প্রাণীর সবচেয়ে বড় সুবিধা এইযে,  খুব দ্রুত সে  যেকোন পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে ।
 আমরা একবার ভারতের মানালিতে বেড়াতে যাই । সেখানে সাদা ধবধবে বরফের পাহাড় । দূর থেকেই শীতের কাঁপন লাগে । নিচে ভালুক মার্কা  পশম এবং উলের পোশাক ভাড়া পাওয়া যায় । আমরা  ভাড়া করা  পোশাক পরে সেই পাহাড়ে উঠি । সমুদ্র যেমন মানুষকে সম্মোহিত করে । পায়ের নিচে সাদা বরফও মানুষকে ছেলেমানুষ বানিয়ে দেয় । আমরাও ছেলেমানুষের মত  সেই বিস্তীর্ণ  বরফের উপর ছোটাছুটি শুরু করি । কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই গরম পোশাক আমাদের বোঝা মনে হয় । আমরা সেই ভাড়া করা পোশাক  খুলে ফেলি । তারমানে সেই অল্প সময়ে আমরা শীতল বরফে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । একমাত্র মানুষই পারে এরকম খাপ খাওয়াতে । পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণী তা পারে না ।
লকডাউনে হাঁটার বিকল্প কি ? 
আমি আগেই বলেছি সুস্থতা মানে শরীরের রক্ত চলাচল ঠিক রাখা । আমাদের দেশ পীর আউলিয়া এবং   মুনি, ঋষি,  দরবেশের দেশ । তাঁদের অনেকেই মাসের পর মাস একই স্থানে বসে ধ্যান করেছেন বা এখনও করেন ।  তাঁদের বসার ভঙ্গীর  মধ্যে এমন কিছু আছে,  যাতে তাঁদের শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে । একারণে তাঁরা কখনও অসুস্থ হন না । বিভিন্ন যোগ ব্যায়াম ও প্রনায়ামের মাধ্যমে তাঁদের আসন সম্বন্ধে জানা যায় । কোয়ান্টাম ফাউনডেশন আমাদের মত ব্যস্ত মানুষের কথা বিবেচনা করে ‘কোয়ান্টাম ব্যায়াম’  নামে একটা কোর্স পরিচালনা করে । তাঁরা নির্বাচিত কয়েকটি আসনের উপর প্রশিক্ষন দেন । তাঁদের শিক্ষা অনুযায়ী  মাত্র ১০/১৫ মিনিট কয়েকটি আসন করলে শরীরের রক্ত চলাচল ঠিক থাকে । আমি একবার কৌতূহলী হয়ে সেই কোর্সটি করেছিলাম । এখন দেখছি ভালই কাজ দেয় । তবে সবচেয়ে বেশী কাজ দিচ্ছে  পবিত্র রমজানের  নিয়মিত  নামাজ ।  আসলে নামাজ পড়ার পদ্ধতি এমনভাবে  সাজানো যেন শরীরের সকল  অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয় । ফলে নামাজ পড়লে শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে । এই লকডাউনে মুসলমানদের জন্য রোজা  তাই অনেকটা আশীর্বাদ স্বরূপ । 
লেখার এই পর্যায়ে আমাকে পাঠকের কথা ভাবতে হচ্ছে । এই লেখা কি এখানেই শেষ করা উচিত – না চলতে পারে ?  
সকল শ্রমজীবী মানুষ এবং  করোনাযোদ্ধাদের  প্রতি গভীর শ্রদ্ধা  নিবেদন করছি  ।  

ঢাকা, ১ মে, ২০২০ ।  
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT