Main Menu

জীবন কি ?

রাশেদুল ইসলাম:  
 ছোট্ট  একটা প্রশ্ন । জীবন কি ? 
 মনে হচ্ছে সহজ প্রশ্ন ।  কিন্তু, এ প্রশ্নের উত্তর  বোধহয় সহজ নয় । 
একটি জীবিত দেহ  এবং  একটি  মৃত দেহের  মধ্যে পার্থক্য কি ? 
এ উত্তরটা সহজ । একটি  জীবিত দেহে  জীবন আছে ।  মৃত দেহে জীবন থাকে না  ।
কিন্তু, একটি দেহে যে  জীবন আছে  বা অন্য দেহে যে জীবন  নেই  এটা কিভাবে বোঝা যায় ? 
এ উত্তরটাও  সহজ  জীবিত দেহ  নিঃশ্বাস  নিতে পারে । মৃত দেহ  নিঃশ্বাস নিতে পারে না ।
তাহলে নিশ্বাসই কি জীবন ?
এ  প্রশ্নের জবাবটা একেবারে বেঠিক নয় বোধহয় । কারণ, এন্ডরু কিশোরের গাওয়া  একটা গান আছে,
‘হায়রে মানুষ,  
রঙ্গিন ফানুস;
দম ফুরাইলে ঠুস । 
এখানে দম মানে নিঃশ্বাস । 
বাউল আব্দুর রহমান বয়াতি মানুষের দেহকে ঘড়ির সাথে তুলনা করেছেন । তিনি গেয়েছেন, 
‘একটি চাবি মাইরা,
দিছে ছাইড়া,
জনম ভইরা চলতা আছে 
মন আমার দেহ ঘড়ি ।
এখানে মানুষের  দেহঘড়ির দম শেষ,  মানেই জীবন শেষ । 
তবে বাস্তবতা হল,  দম বা নিঃশ্বাস  জীবন নয় । শ্বাস প্রশ্বাসে মানুষ অক্সিজেন গ্রহন করে এবং  কার্বন ডাইঅক্সাইড   ত্যাগ করে । এ দুটো জীবন নয়  । তাহলে জীবন কি ?  
একটি জীবন বিহীন দেহকে মৃতদেহ বলে । মৃতদেহ একটা দেহকাঠামো মাত্র । 
পবিত্র কোরআনের মর্ম অনুযায়ী  মহান আল্লাহ্‌ মাটি থেকে একটি মানব দেহকাঠামো তৈরি করেন  এবং সেই দেহকাঠামোর মধ্যে রুহু বা আত্মা সঞ্চার করার পরই প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ)  জীবন পান । সূরা হিজরঃ (২৮-৩১) ।
 কিন্তু আত্মা মানে কি জীবন ?  না, আত্মা  মানে যে জীবন,  সে রকম কোথাও লেখা নেই । তবে এটুকু বোঝা যায়  আত্মা  ছাড়া জীবনের কোন অস্তিত্ব নেই ।  তাহলে  জীবন কি ?  
হিন্দু ধর্ম মতে আমরা সকলেই পরমাত্মার অংশ । পরমাত্মা হচ্ছে  ব্রম্মা বা সৃষ্টিকর্তা বা ভগবান বা  ঈশ্বর । যা কিছুই সৃষ্টি হোক না কেন,  তার মধ্যে পরমাত্মার অংশ রয়েছে । কারণ,  ব্রম্মার হাতেই সবকিছু সৃষ্টি । তিনি জড়তে থাকেন শক্তি রূপে;  আর জীবে থাকেন আত্মা রূপে । জীবের আত্মাকে জীবাত্মা বলে । পরমাত্মার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যখন জীবাত্মায় প্রোথিত হয়,  তখন জীব তার জীবন লাভ করে । জীবের মৃত্যুর পর সেই আত্মা আবার পরমাত্মার কাছে চলে যায় ।
এখানেও আত্মার কথা বলা হয়েছে  জীবন কি ?  তা বলা হয়নি ।
  পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে  হে প্রশান্ত আত্মা ! তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে এসো, সন্তুষ্ট হও (নিজে) ও সন্তুষ্ট করো তাঁকে)। – সূরা ফজর : ২৭-৩০ । 
এখানে মহান আল্লাহকে  পরমাত্মা বলা হয়নি ।  তবে মানবাত্মাকে তার প্রতিপালক অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে । পবিত্র কোরআনে ‘রুহু’  বা আত্মা বিষয়ে নবী করিম (সঃ) কে  বলা হয়েছে-
“তোমাকে ওরা রুহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করে । বলো, ‘রুহ্ আমার প্রতিপালকের আজ্ঞাধীন। ‘এ বিষয়ে আমাকে সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে।” – (সূরা বনি – ইসরাইল : ৮৫)
এখানেই বোধহয় আমার জীবন জিজ্ঞাসা শেষ করা  উচিত । কারণ,  কোরআনের মর্ম অনুযায়ী স্বয়ং আল্লাহর নবীকেই  জীবন ও আত্মা বিষয়ে  খুব সামান্য জ্ঞান দেওয়া হয়েছে । আমরা এখানে এটুকুই  বুঝি যে,  মানুষের আত্মাসহ জীবন মহান আল্লাহর একটি হুকুম মাত্র। হুকুম তুলে নেওয়া মানেই একজন মানুষের  জীবন শেষ। তারমানে মানুষের জন্ম এবং মৃত্যু সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন ।
এখন প্রশ্ন হল আল্লাহর ইচ্ছাধীন এই জীবনকে  মানুষ  কে,  কিভাবে দেখছে ? 
অতিসম্প্রতি বোন তানিয়া তাবাসসুম এবং হিমাদ্রী খীসার মর্মস্পর্শী ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে । বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের  সে সকল সম্মানিত সদস্য করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন,   তাঁদের মধ্যে এই  দুজন আছেন । ইতোমধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব জনাব জালাল সাইফুর রহমান কোরনা আক্রান্ত হয়ে শহীদ হয়েছেন । বোন তানিয়া তাবাসসুমের মা ও স্বামীও করোনায় আক্রান্ত  ।  মহান আল্লাহ  তাঁদের নিরাময় করুন ।  এই মহাদুর্যোগে শত বিপদের মধ্যেও তাঁদের  যে মনোবল, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন এবং অন্যরাও যে একই মন্ত্রে  উজ্জীবিত হয়েছেন,  এতে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে ।  প্রশ্ন হোল, এঁরা জীবনকে কিভাবে দেখেন ? 
এই করোনা যুদ্ধে ফ্রন্ট লাইনে কাজ করছেন আমাদের সম্মানিত ডাক্তার,  নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীগণ । ইতোমধ্যে কয়েকজন ডাক্তার করনাযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, দুই শতাধিক ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য । কিন্ত এত কিছুর মধ্যেও  সকলে যেন নতুন এক উদ্দীপনা নিয়ে জীবনবাজি রেখে করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন । নিজেদের জীবনকে তাঁরা কিভাবে দেখছেন ? 
এই করোনা যুদ্ধে আমাদের পুলিশ বাহিনী যেন এক নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন । বাংলাদেশ পুলিশ বোধহয় তাঁদের শতবর্ষের গ্লানি মুছে ফেলার সংগ্রামে নেমেছেন এই  যুদ্ধে । পুলিশ যে জনগণের বন্ধু -প্রতিক্ষেত্রে এটাই প্রমাণ করে চলেছেন তাঁরা । কয়েক শ’ পুলিশ ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত । কিন্তু  থোড়ায় কেয়ার করেন তাঁরা । নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে জনসেবার ব্রত নিয়েছেন যেন ।  তাঁরা জীবনকে  কিভাবে দেখছেন ? 
ব্যাংকের কর্মকর্তা –কর্মচারীগণ জীবনবাজি রেখে  এই  মহাদুর্যোগে কাজ করছেন । যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজে জিনোম সেন্টারে  করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করছেন । প্রতিরক্ষা বাহিনির সম্মানিত সদস্য, আনসার বাহিনীর সদস্য, অনেক নেতা,কর্মী , ছাত্র, ছাত্রী স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান- সবাই  জীবনবাজি রেখে করোনা যুদ্ধে কাজ  করছেন । একজন ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন তাঁর জীবনের সঞ্চিত  সব  টাকা ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়েছেন ।  দুই ভাই ২৫ লক্ষ টাকা জমি বিক্রি করেছেন এই দুঃসময়ে অসহায় মানুষের সেবার  জন্য -  এরকম শত শত উদাহরণ । এঁরা জীবনকে কিভাবে দেখছেন ? 
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র । ইতালির  ৯৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ডাঃ গিয়া্মপিয়েরো  গিরন  করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য  হাসপাতালের কাজে যোগ দিয়েছেন । সুইডেনের রাজকুমারি সোফিয়া রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসেছেন । তিনি এখন   করোনা  রোগীদের হাসপাতালে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করছেন ।  মিস ইংল্যান্ড খ্যাত ভাষা মুখারজী  করোনা রোগী চিকিৎসার জন্য ডাক্তারি পেশায় যোগ দিয়েছেন ।  
অতিসম্প্রতি প্রফেসর সারা গিলবাটের ছবি ভাইরাল  হয়েছে ।  অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রফেসর  করোনা ভাইরাসের  টিকা আবিস্কার করেছেন  । সেই টিকা পরীক্ষামূলক ভাবে পুশ করা হয়েছে  এলিছা গ্রানাটোর  শরীরে । ৩২ বছর বয়সী সুন্দরি  এই  মহিলা নিজেকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন । এই পরীক্ষা তাঁর মৃত্যুর কারণ হতে পারে । তাঁর টিকা নেওয়ার  সেই ছবিও ভাইরাল হয়েছে ।   তাঁর  হাসিমাখা মুখ  দেখে মনে হয়েছে, তিনি  যেন মরণকে রাধার মত  কৃষ্ণ মনে করেন । কবিগুরুর  সেই গানের  প্রথম কলি-,
মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান ! 
 এ রকম হাজার হাজার  উদাহরণ রয়েছে । 
প্রশ্ন হোল এঁদের সকলে জীবনকে কিভাবে দেখেন ? 
পৃথিবীর সকল ধর্মেই  মৃত্যুর পর সকল  মানবাত্মাকে   সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে । আজকের এই মহাদুর্যোগে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের জীবনের এই শ্রেষ্ঠতম কাজের জন্য তাঁরা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে যথাযোগ্য মর্যাদা ও পুরস্কার পাবেন । 
আমি এ ধরণের সকল মানুষের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । 
এই করোনা সঙ্কটকালে বিপরীত চিত্রও লক্ষণীয় । অনেকেই এই মহাদুর্যোগে চুরি বা বিভিন্নভাবে নিজেদের আখের গোছানোর চেষ্টা করছেন । মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা  সত্ত্বেও  অনেকে এ ধরণের অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে । অনেকে গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে বা অন্য কোনভাবে সমস্যার সৃষ্টি করছেন- যাতে জনদুর্ভোগ বাড়ে বা দেশে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয় । প্রশ্ন  তাঁরাই বা  জীবনকে কিভাবে দেখেন ? 
পৃথিবী একটা মজার জায়গা । এখানে প্রত্যেকে মানুষকে তার নিজের কৃতকর্মের ফল নিজেকেই ভোগ করতে হয় । কেউ সাক্ষী  থাক আর না থাক, প্রকৃতি তাকে জানিয়ে দেয়, কোন পাপের ফল সে ভোগ করছে । আবার তার আত্মা যখন পরমআত্মার কাছে বা  সৃষ্টিকর্তার কাছে যায়, তখনও তাকে সৃষ্টিকর্তার রোষানলে পড়তে হয় ।  হুমায়ুন আহমেদের সেই গানের মত, এই দিন দিন নয়; আরও দিন আছে । তাই, মানুষের বিচারের জাল ছিঁড়তে পারলেও, মহাপ্রভুর  সেই বিচারে ঠিকই তাকে ধরা পড়তে হবে ।
পৃথিবীর সকল মানুষ করোনার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাক – এই প্রার্থনা ।
সকলকে  পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা । 
ঢাকা, ২৭ এপ্রিল, ২০২০ । 
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT