Main Menu

একটি আদেশ থামাতে পারে ৩০ হাজার পরিবারের কান্না

উনিশ বছর ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন মো. রহিদুল ইসলাম। একই প্রতিষ্ঠানে আঠারো বছর বিনা বেতনে শিক্ষকতায় রয়েছেন মো. ইয়ামিন আলী। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের শিবপুর বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে এই দুজন কর্মরত। বিদ্যালয় থেকে বেতন না পাওয়ায় সংসার চালাতে শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে পানের বরজে কাজ করে টাকা আয় করতেন তারা। আর তা দিয়েই নিজেদের সংসার পরিচালনা এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া কোনও রকমে চালিয়ে নিতেন। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রকোপে সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে খেয়ে না খেয়েই পরিবারের সব সদস্যদের কোনও রকমে বেঁচে থাকার লড়াই চলছে।

গত বছর অক্টোবরে এই দুই শিক্ষকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নতুন এমপিওভুক্ত হয়েছে। শুধু একটি আদেশ জারি না হওয়ায় করোনা সংকটে এদের জীবন আজ প্রায় বিপন্ন। শুধু এই প্রতিষ্ঠানটিই নয়, অর্থ বরাদ্দ থাকার পরও মোট ২ হাজার ৭৩৭টি প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজার পরিবারে কান্না চলছে করোনা সংকটের সময়।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শিবপুর বালিকা বিদ্যালয়টি এবার নতুন এমপিওভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সরকারি আদেশ জারি না হওয়ায় শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই দুই শিক্ষকসহ প্রতিষ্ঠানটির সবাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত আদেশটি জারি করলেই শিক্ষক-কর্মচারীরা করোনার সময় বাঁচার নিশ্চয়তা পাবেন। ’

সহকারী শিক্ষক মো. রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে স্কুল শুরুর আগে পানের বরজে পান ভাঙা (গাছ থেকে ছিঁড়ে গুছিয়ে দেওয়া) ও হিসাব নিকেশ করে দিয়ে টাকা পেতাম। তিন থেকে চার হাজার টাকা পেতাম মাসে। তা দিয়েই কোনও রকমে সংসার চলছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এখন ঘর থেকে বাইরে বেরুতেই পারছি না। তাই খেয়ে না খেয়ে চলছে জীবন। ’

মো. ইয়ামিন আলী বলেন, ‘সকালে ৯টা পর্যন্ত পান ভেঙে দিলে একশ থেকে দুই টাকা পাওয়া যেত। তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলতো। এখন সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানের বরজের কাজ নেই। তাই ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছি। কারও কাছে হাত পাততেও পারছি না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু এই দুই শিক্ষকেরই নয়, করোনা সংকটের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দেশের নন-এমপিও সব শিক্ষক-কর্মচারী। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে চাকরি করেন। বিদ্যালয় থেকে সামান্য কিছু দেওয়া হলেও গত জানুয়ারি মাস থেকে সেটা বন্ধ রয়েছে।

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি পাওয়া নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে পাঁচ হাজার ২৪২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নতুন এমপিও পেয়েছে ২ হাজার ৭৩৭টি। এছাড়া অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির বাইরে রয়েছে আরও ২ হাজারেরও বেশি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বেসরকারি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে এক লাখের বেশি।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিঁয়াজো ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি বলেন, ‘নতুন এমপিও পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি একটি আদেশ জারি না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করলেই আদেশ জারি করতে পারে। তাতে নতুন এমপিও পাওয়া প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষকের পরিবার করোনা সংকটের সময় জীবন বাঁচাতে পারে। একটি আদেশেই পারে এসব পরিবারের কান্না থামাতে।’

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, ‘নতুন এমপিও পাওয়াসহ বেসরকারি এক লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। এরমধ্যে ১০ শতাংশ শিক্ষকের কিছু সহায় সম্পদ রয়েছে, বাকি ৯০ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবার করোনাভাইরাসের এই সময় মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা হাত পেতে সাহায্যও নিতে পারছেন না। আবার সংসারও চালাতে পারছেন না। খেয়ে না খেয়ে চলছে তাদের জীবন। ফলে টাকা বরাদ্দ থাকার পরও ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবারের সদস্যদের মানবেতর জীবনযাপন চলছে।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ থাকার পর গত বছর ২৩ অক্টোবর একযোগে দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত করে তালিকা প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ওই বছরের ১২ নভেম্বর ছয়টি এবং ১৪ নভেম্বর একটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়। নতুন এমপিও পাওয়া এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের গত বছরের (২০১৯) জুলাই থেকে নির্ধারিত বেতন-ভাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু, এমপিও তালিকা প্রকাশ করলেও বেতন ছাড়ের আদেশ জারি করছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন না হওয়ায় সবক’টির আদেশই বন্ধ রয়েছে। অথচ এই আদেশ ১২ জুনের মধ্যে জারি করা না গেলে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। নতুন বছরের বাজটে তা অন্তর্ভুক্ত হয়ে ফেরত আসতে সময় লাগবে আগামী সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। চলতি মাসে আদেশ জারি করলে মে মাসের মধ্যেই শিক্ষকরা বেতন পেয়ে যাবেন। এতে করোনা সংকটের সময় প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা তৈরি হবে।

এদিকে আদেশ জারি বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সব প্রস্তুত রয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আদেশ জারি করা হবে।’


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT