Main Menu

করোনার সময়ে ঘরে ঘরে জুমা না জোহর পড়তে হবে?

করোনার কারণে জুমার নামাজ সীমিত পরিসরে আদায়ের নির্দেশনামা এসেছে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে। সর্বোচ্চ দশজন প্রতিটি মসজিদে জুমা পড়তে পারবে বলে বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। বাকি মুসল্লিরা ঘরে নামাজ আদায় করবে। কথা হচ্ছে ঘরে জোহর, না কি জুমাও পড়তে পারবে ইচ্ছে হলে? ফতোয়ার কিতাব কী বলে?

এ সংক্রান্ত মাসআলা দেখলে সত্যি অবাক হতে হয়। আমাদের ফিকহের ইমামগণ কত সূক্ষ্মতার সঙ্গে একেকটি মাসআলা কুরআন-হাদীস ঘেটে বের করে গেছেন।

করোনার মতো পরিস্থিতি পৃথিবীতে আর কখনও হয়নি। এর আগে অবশ্য ৭৪৯ হিজরী সনে বিশ্বব্যাপী মহামারী দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তর ফারাক আছে।

৭০০ বছর পূর্বের পৃথিবী আর বর্তমান পৃথিবী এক নয়। স্থান-কাল পরিবর্তনের কারণে অনেক মাসআলায় পরিবর্তন হতে পারে।

রাসূল সা. মদীনা মুনাওয়ারা এসে দোয়া করেছিলেন যেন মদীনা মুনাওয়ারা থেকে আল্লাহ তায়ালা মহামারী উঠিয়ে নেন। যার কারণে নবীজীর জীবদ্দশায় মদীনায় কোনো মহামারী দেখা দেয়নি। (পাঠক খুব ভালো করেই জানেন বর্তমান সময়ে মক্কা-মদীনাতেও করোনায় মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়েছে বহু সংখ্যক মানুষ।)

রাসূল সা.-এর সময়ে মদীনায় যদি মহামারী আসত তাহলে হয়ত অনেক মাসআলা আমাদের সামনে স্পষ্টভাবেই হাদীসে আমরা পেয়ে যেতাম। তবু অবাক হতে হয় যখন আমরা দেখতে পাই রাসূল সা. বেশকিছু নির্দেশনা মহামারীর সময়ের জন্য আমাদের দিয়ে গেছেন।

হোম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন ও লকডাউনের কথা নবীজীর হাদীসেই আমরা খুঁজে পাই। এ ভারী বিস্ময়ের ব্যাপার। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যা হাজার বছরের গবেষণার পর পেয়েছে প্রিয় নবী সা. তা প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই বলে গেছেন।

মূল বিষয়েই ফিরে যাওয়া যাক। জুমার দিন ঘরে জুমার নামাজ পড়তে হবে, না জোহরের নামাজ আদায় করতে হবে? আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় এ মাসআলা।

ফতোয়ার কিতাবাদিতে জুমার নামাজ ফরজ হওয়ার জন্য ছয়টি শর্ত করা হয়। এর ভেতর একটি হচ্ছে সুস্থতা। অসুস্থতার আশংকা থাকলে জুমার আবশ্যকতা আর বাকি থাকে না।

ফিকহের পরিভাষায় সে তখন মাজুর হয়ে যায়। করোনার দিনগুলোতে মূলত এ নীতির ভিত্তিতেই জুমার ফরজিয়ত থাকছে না। বাকি রইল যদি মাজুর মানুষ জুমা আদায় করে তাহলে জুমা আদায় হয়ে যাবে কি না?

এ মাসআলা ফাতোয়ার কিতাবাদিতে স্পষ্ট রয়েছে। যেমন মুসাফিরের উপর জুমা নেই। নারীর উপরও জুমা নেই। কিন্তু কোনো মুসাফির বা নারী যদি জুমার জামাতে শরিক হয় তাহলে তার জুমা আদায় হয়ে যাবে।

এ মূলনীতির ভিত্তিতেই আমাদের বক্তব্য হচ্ছে করোনার সময়ে যদি কেউ জুমা আদায় করে তাহলে জুমা আদায় শুদ্ধ হবে। আর জুমার ফজিলতের কারণে যদি কেউ জুমা পড়তে পারে তাহলে অবশ্যই সে অধিক সওয়াব লাভ করবে।

জুমা শুদ্ধ হওয়ার জন্য রয়েছে কয়েকটি শর্ত। এক হচ্ছে অবশ্যই জামাত হতে হবে। ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতে, জুমার জামাতের জন্য ইমাম ছাড়া আরও তিনজন পুরুষ মুসল্লি লাগবে। অর্থাৎ চারজন পুরুষ মুসল্লি হলেই জুমা আদায় করা যাবে। সঙ্গে পর্দা রক্ষা করে নারীরাও অংশগ্রহণ করতে পারবে জুমার জামাতে।

দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে খুতবা দিতে হবে। খুতবা হচ্ছে জুমার নামাজের শর্ত। খুতবা ছাড়া জুমা হবে না। সুতরাং খুতবা দিতে পারে এমন কেউ থাকতে হবে।

তৃতীয় শর্ত হচ্ছে ওয়াক্ত। আর চতুর্থ শর্ত যেটি সবচেয়ে বিতর্কের সেটি হচ্ছে সাধারণ অনুমতি। অর্থাৎ এমন স্থানে জুমা হতে হবে যেখানে অন্য কেউ এসে শরীক হতে চাইলে শরীক হতে পারে।

এখন বাড়ি-ঘরে যেহেতু সবার প্রবেশের অনুমতি থাকে না তাই সেখানে জুমা আদায় বৈধ নয় বলে ফতোয়া দেয়া হয়ে থাকে।

কথা হচ্ছে কোথাও যদি সাধারণ অনুমতি দিয়ে রাখা হয় তাহলে কী জুমা জায়েজ হবে না? উত্তরে নিঃসন্দেহে বলতে হয়, সেখানে না জায়েজ হওয়ার কোনোই কারণ নেই।

বিশেষত যখন মসজিদ ঘরেই সাধারণ অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও জুমা জায়েজ হচ্ছে। আর এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে এটি একটি বিশেষ অবস্থা। সেই একই কারণে ঘরে সীমিত পরিসরে যদি অনুমতির বিষয়টি থাকে তাহলে জুমা না হওয়ার ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কারণ নেই।

বিশেষত বহুতলবিশিষ্ট বাড়ির ছাদে যদি মুসল্লি জমায়েত হয় তাহলে এ বিশেষ পরিস্থিতিতে জুমা আদায় করে মুসল্লিরা নিজেদের মন শান্ত রাখতে পারেন। অবশ্য সে ক্ষেত্রেও অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন খুব বেশি মানুষের সমাগম না হয়।

কারণ মসজিদে জুমা নিষেধ করা হয়েছে এ জনসমাগম রোধ করতেই। বাড়ি-ঘরেও যদি এমন জনসমাগম হয় তাহলে তা সমাজ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হবে।

জুমা আর ফরজ থাকছে না বর্তমান সময়ে এ তথ্য যে মুসল্লি জানতে পারছেন তিনি শুধু শুধু ঝামেলা করতে যাবেন না জুমা আয়োজনের। তবু মাসআলাটা জেনে রাখা ভালো। কোথাও যদি জুমার শর্তগুলো সহজে সম্পন্ন হয় তাহলে জুমা আদায় করারও অবকাশ রয়েছে।

শরিয়তের মাকাসেদ যারা বুঝেন তারা বর্তমান সময়ে স্বাস্থ ও নিরাপত্তার কথাটিকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিবেন। কিন্তু মাসআলা এই, প্রয়োজন ছাড়া এক এলাকায় একাধিক স্থানে জুমা জায়েজ নেই।

প্রয়োজন হলে ফতোয়ার সব কিতাবেই এ কথা রয়েছে যে, একাধিক স্থানে জুমা অবৈধ নয়। বর্তমান সময়ে প্রয়োজনের কারণেই ঘরে ঘরে জুমা হলে সমস্যার কিছু নেই।

সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় মাসআলাটিও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। সেটি হচ্ছে জুমা না পড়ে ঘরে যে জোহর পড়া হবে তা কি একাকী পড়া ভালো, না জামাতের সঙ্গে পড়া ভালো?

এর উত্তরে ফতোয়ার কিতাবে দেখতে পাই, জুমার দিন যারা ঘরে জোহর পড়বেন তারা একাকীই নামাজ পড়বেন। এবং অবশ্যই এলাকার মসজিদে জুমার জামাত শেষ হওয়ার পর তারা একাকী ঘরে জোহর আদায় করবেন।

এটা জুমার পৃথক গুরুত্ব বোঝায়। জুমার নামাজের বিশেষ একটি মর্যাদা প্রকাশ করে এ বিধান। জমায়েত হবে কেবল জুমায়। বিকল্প জোহর নামাজে জামাতবদ্ধতা কাম্য নয়। একাকী নামাজ আদায় করাই উত্তম।

আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা প্রার্থনা করি যেন দ্রুতই আমাদের থেকে করোনার কঠিন পরিস্থিতি কেটে যায়। আবার যেন আমরা সবাই মিলে মসজিদে জুমা আদায় করতে পারি।

হে আল্লাহ তুমি আমাদের বদ আমলির কারণে আমাদের ধ্বংস করে দিয়ও না। তুমি আমাদের তোমাকে ডাকার আরও সুযোগ করে দাও। দীর্ঘ নেক হায়াত দাও সবাইকে। আমীন। তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে শামি, মাজমাউল আনহুর, কাজিখান, বাহরুররায়েক, বাযযাযিয়া, আলমগিরি, তাতারখানিয়া ও মুহিতে বুরহানী।


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT