Main Menu

আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই !

রাশেদুল ইসলাম: মনটা ভাল নেই । সত্যিই ভালো নেই ।  রাতে ভালো ঘুমও হয়নি । এ কয়দিন লিখে লিখে  ভালই কেটেছে আমার । এখন তাও ভালো লাগছে না ।

অন্যমনস্কভাবে মোবাইলের উপর হাত  পড়তেই একটা গানঃ 

আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই  ? 

চলিতে চরণ চলে না, 

চলিতে চরণ চলে না;  

দিনে দিনে অবশ হই,

আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই ? 

আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই ? 

 গানটা আমার মনোযোগ কেড়ে নেয় । একজন মানুষ ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে গেলে কি কি অসুবিধা হয়, কি ধরণের  অনুশোচনা হয়; তার সহজসরল বর্ণনা এই গানে আছে । এসব গান মুখের গান নয়; বুকের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা গান । হৃদয়ের না বলা কথার একান্ত নির্যাস যেন । আমি বিমোহিত হই । 

এটা একটা বাউল  গান । বাউল গানের একটা মজা আছে । গানের  গীতিকার কে, তা এই গানের মধ্যেই বলা থাকে  । গানটি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান ।

বাউল সম্রাট শাহ  আবদুল করিমের কথা জেনে মনটা আরও খারাপ হয়  আমার । সুনামগঞ্জ জেলার হাওর বেষ্টিত একটি গ্রামে তাঁর জন্ম । গ্রামের পাশে কালনী নদী । অতিদরিদ্র পরিবারে অভাবের মধ্যে জন্ম তাঁর । অভাবের মধ্যেই  বড় হওয়া । ভাটি অঞ্চলের জনজীবন তাঁকে মোহাচ্ছন্ন করে । সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল ঘুরে বেড়ান তিনি । হাওরের মানুষের প্রেম, ভালবাসা, দুঃখ,  হাসি, কান্না ফুটে ওঠে তাঁর গানে । এই হাওর অঞ্চলই তাঁর পৃথিবী । কিন্তু সেই হাওর অঞ্চল থেকেই দুত্যি ছড়ান তিনি । সেখান থেকেই সভ্য জগতের মানুষের দৃষ্টি কাড়েন । ২০০১ সালে বাউল সম্রাট  শাহ আবদুল করিমকে জাতীয় একুশে পদক পুরষ্কারে ভূষিত করা হয় । 

 

বাউল সম্রাট শাহ  আবদুল করিম

সারাজীবন দারিদ্রের সাথে লড়েছেন তিনি; অভাবের সাথে লড়েছেন । কিন্তু কখনও কারো কাছে হাত পাতেননি ।  কারো কাছ থেকে নিজের চিকিৎসার খরচও নিতে চাননি তিনি । ২০০৬ সালে সাউনড মেসিন নামের একটি অডিও প্রতিষ্ঠান তাঁর ১২টি গান নিয়ে  ‘জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম’ নামে একটা এ্যালবাম বাজারে ছাড়ে । সেই এ্যালবাম বিক্রির টাকা ২০০৭ সালের দিকে তাঁর পরিবারকে দেওয়া হয় । বাউল সম্রাট শাহ  আবদুল করিম ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সালে ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন । 

বাউল সম্রাট শাহ  আবদুল করিম অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন । কোন কোন সময় তাঁর পরিবার তিনবেলা  খাবার পায়নি । কিন্তু তাঁর মনটা ভিক্ষুক ছিল না । তিনি কখনও কারোর কাছে হাত পাতেননি । তাঁর মনটা ছিল বিস্তীর্ণ হাওরের মত বিশাল  । আমি এই মহান বাউল সম্রাটকে স্যালুট করি । আমার মনটা বিক্ষিপ্ত এই কারণে যে, গত রাতে আমাকে একজন টেলিফোন করেন । লেখালেখি সূত্রে অনেকে আমার সাথে  কথা বলেন । অনেক সমস্যার কথা জানান । গত রাতে যিনি কথা বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি । তিনি জানান, অনেক সচ্ছল পরিবার এবং ক্ষমতাবান লোক থেকে ত্রাণ দেবার জন্যে তাঁকে  চাপ দেওয়া হচ্ছে । ৪০ জনের তালিকা করা হলেও ৪০০ জন দাবী করছে - যাদের অধিকাংশই ত্রাণ পাওয়ার কথা নয় । 

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট  চলমান এই মহাদুর্যোগ এখন বিশ্বব্যাপী ।   এর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা এখনও সুস্পষ্ট নয় । এই মহাদুর্যোগ  মোকাবেলায় শুধু দেশের সরকার নয় - এ দেশের সকল সচ্ছল ও ক্ষমতাবান লোকদের  সেচ্ছায় ত্রাণ বিতরণকারি হতে হবে – ত্রাণ গ্রহণকারী নয় ।

বোখারী শরীফের একটা হাদিসে বলা হয়েছে,  ‘সেই প্রকৃত ধনী, যে মনের দিক থেকে ধনী’ ।  সে দিক থেকে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম একজন প্রকৃত ধনী ।  সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের একজন অভাবী শাহ আব্দুল করিম  যদি হাদিস শরীফ মতে একজন প্রকৃত ধনী হতে পারেন; তাহলে যারা সচ্ছল এবং কোন না কোনভাবে ক্ষমতাবান,  আমরা কেন ত্রাণ ভিক্ষা করি ? আমরা কেন মনের দিক থেকে ধনী হতে পারিনে ? 

আমি বাউল সম্রাট শাহ  আবদুল করিম এঁর আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । মহান আল্লাহ তাঁকে বেহেস্তের সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন  । 

ঢাকা, ৪ এপ্রিল, ২০২০ । 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT