Main Menu

করোনায় ধর্মচর্চা

রাশেদুল ইসলাম: 

(পর্ব-চার)

একজন তরুণের   অনুরোধেই  আমার আজকের এই লেখা ।  ছেলেটি তার বাবাকে নিয়ে চিন্তিত । তাঁর বাবা মসজিদে নামাজ  পড়া বন্ধ করবেন না । 
‘মরণ যেখানে লেখা,  সেখানেই হবে’ ; এটাই ধর্মের বিধান । তাই তার বাবা  মসজিদ ছাড়বেন না । তাঁর কপালে যা লেখা আছে, তাই  হবে’ - এটাই তার বাবার শেষ কথা । 
 এটা ধর্মের  প্রতি অন্ধবিশ্বাস এবং এক ধরণের ধর্মীয় উন্মাদনা । নিঃসন্দেহে এ ধরণের ধর্মপাগল মানুষ আমাদের দেশের  সৌন্দর্য ।  এই বিশ্বাস এবং  উন্মাদনার সাথে দেশপ্রেমের  উন্মাদনা যোগ করেই ১৯৭১ সালের  মুক্তিযুদ্ধে  আমাদের দেশের সোনার ছেলেরা  ঝাপিয়ে পড়ে এবং দেশ স্বাধীন করে । এ ধরণের  উন্মাদনায় উন্মত্ত  হতে পারে বলেই ,  শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে  মাথা উঁচু করে থাকে । হয়ত এ কারণেই  গণমানুষের কবি  সুকান্ত ভট্টাচার্য   বলেনঃ        
সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
 অবাক তাকিয়ে রয়,
জ্বলে- পুড়ে- মরে  ছারখার,  
তবু মাথা নোয়াবার নয় ! 
এখনও গোটা বিশ্বের মানুষ অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে ।  তবে এখনকার  পরিস্থিতি ভিন্ন । বিশ্ব এখন  আমাদের সাধারণ মানুষের করোনা বিষয়ে অজ্ঞতা  নিয়ে  উদ্বিগ্ন । তাঁরা মনে করেন,  ইতালী,স্পেন  এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিকে করোনাকে  হেলাফেলা না করে,  অধিক সচেতন হোলে – আজকের অবস্থায় তাঁরা পড়তেন না । বাংলাদেশ সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে,  একই পথে চলেছে । ফলে, বালাদেশের কপালে ভোগান্তি আছে । যে কোন সময়  একটার পর  একটা মৃত্যুর  ঘটনা ঘটবে সেখানে  । মৃত্যুর মিছিল দেখা যাবে বাংলাদেশে ।   বিশ্ব জনমতের  চলমান এই উৎকণ্ঠাকে বাংলাদেশ সরকারও সবিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন । আমাদের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল । অতিজরুরি প্রয়োজন না হোলে,  সেনা মোতায়েন করা হয় না । সরকার করোনা পরিস্থিতিকে সর্বাধিক  গুরুত্ব প্রদানের 


কারণেই,   ইতোমধ্যে  মাঠপর্যায়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে ।  স্বাস্থ্য বিভাগসহ কোন না কোন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারী বেসরকারি  পর্যায়ের লোকজন জীবনবাজি রেখে  এখন নিরলসভাবে স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করছেন ।  স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজে এ সংক্রান্ত সার্বিক  বিষয় তদারকি করছেন । তারপরও এ ধরণের সরল ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের  অসচেতন আচরণ নিঃসন্দেহে  করোনার বিপর্যয় প্রতিরোধের  ক্ষেত্রে   অনেক    বড় অন্তরায়  । আমাদের দেশের অতিসাধারণ অন্ধবিশ্বাসী মানুষ এবং এই তরুণের বাবার মত ধর্মপাগল মানুষকেও এখন প্রকৃত  বাস্তবতা বুঝতে হবে । তা না হোলে,  সত্যিই আমাদের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে । 
আমি নিজে  কোন আলেম নই । এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে  মসজিদের ইমাম বা আলেমগণ মুসল্লিদের  বুঝিয়ে বলতে পারেন । আমার জানামতে ইতোমধ্যে ইসলামিক ফাউনডেশনের মাধ্যমে যথানিয়মে  সকল মসজিদের ইমামগণকে  নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে । ইমামগণ সেভাবেই বলেছেন বলেই আমার জানা । কিন্তু, ছেলেটির মতে অনেক মসজিদের ইমাম তাঁর বাবার মত একই মত পোষণ করেন । একারণেই  তাঁর বাবা মসজিদে নামাজ পড়া ছাড়বেন না । অন্য সাধারণ মানুষও  এই  অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের  কারণে কোন গাইডলাইন মানতে চাচ্ছেন  না । 
আমি নিজে  বিনীত ভাবে এ বিষয়ে আমার নিজস্ব কিছু মতামত দিতে চাই । নিজস্ব মানেই আমার একান্ত নিজস্ব নয় । কোরআন- হাদিস  এবং এ  সংক্রান্ত  ধর্মীয় ইতিহাস  পড়ে আমার নিজের যা মনে হয়েছে,  সেটাই  বলতে চাই এখানে । আমার ব্যাখ্যায় ভুল থাকলে বা আরও সুন্দর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকলে অনুগ্রহ করে  জানাবেন । আমি নিজেকে সংশোধন করে নেব । 
ইসলাম ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনায় আমার মনে হয়েছে,   কোরআন এবং হাদিসের  অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে যথাযথভাবে প্রচারিত হয়নি ।   সাধারণ মুসলমান মনে করেন  নামাজ মানেই ইসলাম এবং ইসলাম মানেই নামাজ । সাধারণ মানুষের বিশ্বাস,  মুসলমান হওয়ার একমাত্র প্রমাণ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া । কিন্তু, বাস্তবে কোরআন -হাদিসের ব্যাখ্যা কিন্তু তা বলে না ।  
১৯৭৩ সালে আমি ষষ্ট শ্রেণির ছাত্র । মাওলানা মোবারকউল্ল্যা   আমাদের স্কুলের উর্দু  ও আরবী  শিক্ষক । স্বাধীন  বাংলাদেশে  উর্দুকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ।  তিনি আমাদের  আরবী  শিক্ষার বই ‘আল আদাবুল যাদিদ’ পড়ান ।  মাওলানা হুজুর  একটা কথা আমাদের   প্রায়ই বলেন, ‘তোরা যা ইচ্ছে  কর; কিন্তু, তোরা নামাজ  পড়’ ।  এখনকার অনেক  মাওলানা হুজুরেরও  একই কথা ।  তবে,  তাঁরা মসজিদে গিয়ে  নামাজ  পড়ার কথা বলেন  । আজ দীর্ঘ ৪৭ বছর পর,  এই  ধর্মচর্চা লিখতে  গিয়ে  শ্রদ্ধেয়  সেই মাওলানা মোবারকউল্ল্যা হুজুরের  কথা মনে পড়ল আমার । মহান আল্লাহ তাঁর বেহেস্ত নসিব করুন । কিন্তু, কি ভুলশিক্ষাই না আমরা 

পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে । আমি যদি,  ‘যা খুশী তাই করি’; তাহলে আমার নামাজ পড়ার দরকার কি ?  একজন নামাজীর সাথে,  অন্য একজন বেনামাজীর  তাহলে  পার্থক্য থাকে  কি ? 
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, নামাজ পড়া একজন মুসলমানের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । ইসলামের ৫ টি স্তম্ভের মধ্যে এক নম্বর হচ্ছে  নামাজ । এটা মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অঙ্গ । একজন মুসলমান হওয়া মানে এই যে,  তিনি ৫ টি মৌলিক গুণের অধিকারী । 
একজন মুসলমান- ১.  কলেমা জানেন এবং তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ২,  পাঁচ ওয়াক্ত  নামাজ  পড়েন,   ৩.  রমজান মাসের ১ মাস রোজা রাখেন,  ৪.   সামর্থ্য থাকলে জীবনে  অন্তত একবার মক্কায় গিয়ে হজ্ব করেন এবং  ৫.  আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হারে  যাকাত দেন । 
 উপরে বর্ণিত  ৫ টি দায়িত্ব পালন করা  একজন মুসলমানের  মৌলিক ধর্ম  । যদি একজন মুসলমান হন,   তাহলে অবশ্যই তাঁকে এগুলো  পালন করতে হবে । তবে, এ কথাও মনে রাখা দরকার যে,  বোখারী শরীফের মত সহী হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী নবী করিম (সঃ) বলেছেন, ‘তোমারা  কখনও  ধর্মকে  অজুহাত হিসেবে নিও না’  । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে,  রোজা পালনরত একজন  চাকুরীজিবি মুসলমান  যদি বলেন,  আমি রোজা আছি,  তাই কাজটা পারব না;   তাহলে এটা হবে  তাঁর অজুহাত  । এই অজুহাত দেখালে তাঁর রোজা হবে না  । নামাজ পড়ার বিষয়টিও তাই । নামাজ না পড়ার  বিষয়টি  একজন মুসলমান যেন অজুহাত হিসেবে না নেয়, এ কারণে নামাজ প্রয়োজনে শুয়ে, বসে-  এমনকি ইশারাই পড়ার বিধান রয়েছে । আর  বিশ্বাসের কোন  বিষয়, প্রদর্শনের বিষয় নয় । সাধারণ অবস্থায় মসজিদে নামাজ পড়া প্রদর্শনের বিষয় নয়; কিন্তু, মহামারির সময় যেখানে যার যার অবস্থানে থাকার জন্য মহানবীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা  রয়েছে;  সেখানে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া অনেকটা লোক দেখানো পর্যায়ে পড়ে । ফলে, এ অবস্থায় মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকা মুমিনদের ধর্মীয় দায়িত্ব  বলে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে  । 
এখানে উল্লেখ্য যে,  ১৮৬২ সালে হজ্ব পালনরত অবস্থায়  ৬০ হাজার হাজী মহামারি প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন । পরের দুবছর মড়কের ভয়ে হজ্বপালন বন্ধ থাকে ।  এর অর্থ এই যে, মহামারির কাছে ঈমানের কোন মুল্য নেই-  মুসলিম অমুসলিমের কোন পার্থক্য নেই । বাজারে আগুন লাগলে যেমন মসজিদ-মন্দির- গির্জা রক্ষা পায়না– করোনার মত মহামারিতেও তেমনি কেউ রক্ষা পায় না । তাই, বিশেষজ্ঞ জনের মতামত আমাদের সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে । করোনা  ভাইরাস প্রতিরোধে আপনার আমার কি করণীয় তা বার বার বলা হচ্ছে । দয়া করে আমরা সবাই এ ব্যাপারে সচেতন হই  এবং আমাদের সঠিক নাগরিক দায়িত্ব পালন করি । 
আপনার আমার সচেতনতা দিয়ে আসুন  আমরা নিজেদের  এবং একইসাথে   আমাদের প্রিয় দেশ – বাংলাদেশকে   রক্ষা করি ।
পৃথিবীর সকল মানুষ করোনা আতংকমুক্ত সুস্থ জীবন ফিরে পাক – এই প্রত্যাশা । 

 ঢাকা, ২ এপ্রিল, ২০২০ ।
 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT