Main Menu

করোনায় ধর্মচর্চা

রাশেদুল ইসলাম: 

পূর্ব প্রকাশিত লেখার পর পর্ব ২

‘করোনায় ধর্মচর্চা’  বিষয়ে গতকালের লেখাটি অনেকে পছন্দ করেছেন  । তাই, আবারও লেখার চেষ্টা । এখানে বলতে দ্বিধা নেই যে,    কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এ লেখাটা শুরু হয়নি । এখনও এ বিষয়ে কোন গোছালো পরিকল্পনা আমার নেই ।  লেখাটা তাই এলোমেলো হতে পারে । সম্মানিত পাঠকের কাছে এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী । এখানে আর একটা কথা বলা দরকার যে,  ধর্ম আমাদের অনেকের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আবেগের বিষয় । এ লেখার আলোচনা ও ব্যাখ্যা অনেকটা আমার নিজস্ব । আমার আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে,   কেউ যেন এ ব্যাখ্যায় কোনভাবে আহত না হন । তারপরও কোন বিষয়ে কারো মনে প্রশ্ন থাকলে, অনুগ্রহ করে জানাবেন – আমি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব । এর  অর্থ এই যে, কাউকে কোন ভাবে আহত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয় । 

ধর্ম বিষয়ে আমার আনুষ্ঠানিক কোন পড়াশুনা নেই । ব্যক্তি জীবনে আমি উত্তম ধর্মচর্চাকারি কোন ব্যক্তি- তাও  নই । কিন্তু, আমার লেখায় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে বিস্তর উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয় । বর্তমানে আমার লেখা  ৫ টি বই বাজারে আছে । আমার এমন কোন বই নেই, যেখানে ধর্মের বিধানের কথা উল্লেখ নেই । এ কারণে অনেকে বলেন,   আমার লেখা সার্বজনীন নয় । অনেকে বলেছেন, আমার লেখায় ঘুরেফিরে যদি ধর্মের প্রসঙ্গ না টানা হয়; তাহলে লেখা কালজয়ী হতে পারে । তারপরও আমি ধর্ম নিয়ে লিখি; আমার লেখায় ধর্মের প্রসঙ্গ  টেনে আনি । কিন্তু, কেন ? 

এ প্রশ্ন আমার কাছে নতুন নয় । জবাবও দিয়েছি  কয়েকটি লেখায় । প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানেও  এ প্রশ্নের একটা জবাব দিতে চাই আমি। আসলে সাহিত্য সৃষ্টি  করা আমার লক্ষ্য নয় । কোন সাহিত্যিক হওয়াও আমার জীবনের উদ্দেশ্য নয় । একটা বিশেষ কারণে  আমি ২০১৬ সাল থেকে লেখা শুরু করি । আমার লেখার সেই পটভূমি বেশ কিছুটা নয়; বলা যায় পুরোটাই আবেগের । আমাদের দুটি শিশুপুত্র  ১৯৯২ এবং ১৯৯৪ সালে মারা যায় । ছেলে দুটির নাম অর্পণ এবং দর্পণ । সেদিন আমার মনে হয়েছে ছেলে দুটিকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার । সেই চিন্তা  থেকেই পরবর্তীতে ‘অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউনডেশন’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান (এখনও পুরোপুরি চলমান নয়) গড়ে তোলা হয় । তখন প্রশ্ন আসে, এই প্রতিষ্ঠানটি  কি কাজ করবে ? অকাল প্রয়াত দুটি শিশুর নামে তৈরি এই প্রতিষ্ঠান কি কাজ করতে পারে ? মূল আবেগের ব্যাপার হয় তখনই । ইসলাম ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী শিশু অবস্থায় যারা মারা যায়,  তারা ফেরেশতার মত । তারা নিস্পাপ । 

 

তাহলে  যারা নিস্পাপ শিশু,  তারা যদি নিস্পাপ অবস্থাতেই   বড় হয়, তখন তারা কি করে ? নিশ্চয়ই  নিস্পাপ বড় বড় শিশুরা পৃথিবীর যাবতীয় ভালো কাজ করে । আবার   প্রশ্ন আসে, পৃথিবীর ভালো কাজ কি কি এবং তা কত প্রকার ? পরের প্রশ্ন,  একজন ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কি দুনিয়ার সব ভালো কাজ করা সম্ভব ?  যদি তা অসম্ভব হয়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের করণীয় কি হতে পারে ? 

 

‘ শেষ পর্যন্ত ‘অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউনডেশন’ এর কাজ দাঁড়ায় দুটিঃ 

 এক) পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী  মানুষের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক  সৎকর্ম করা এবং

 দুই) সকল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা,  যেন তারা সবাই ভালো কাজ করেন ।

 সকলে যদি যার যার অবস্থান থেকে ভালো কাজ করেন;   তাহলেও প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে । 

 ফাউনডেশন’ এর এই  দুই নম্বর কাজের উদ্দেশ্য পূরণ করতেই  লেখালেখিতে আমাকে হাত দিতে হয় । তবে,  প্রশ্ন আসে একজন মানুষ আমার কথায় ভালো কাজ করবেন কেন ? জীবনটা যদি একটাই হয়, তাহলে একজন মানুষ যতদিন বাঁচেন,  আরাম আয়েস করেই বাঁচবেন; তিনি কেন অন্যের ভালো নিয়ে চিন্তা করবেন ? আবার এটাও সত্য, সমাজের অনেকেই কাজ করে থাকেন ।   তাহলে প্রশ্ন, মানুষ ভালো কাজ করেন কেন ? এবং কার কথায় করেন ? এ সব প্রশ্ন থেকেই বিভিন্ন মতাদর্শ, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্রের  কথা আসে ।  

আমি নিজে  সাধারণ মানুষ পছন্দ করি ।  সাধারণ জীবন পছন্দ করি । একজন সাধারণ মানুষ নিজে নিরলস পরিশ্রম করেন  । সুখদুঃখের মাঝে চরম দুর্দিনেও সংসার থেকে পালিয়ে যান না । আমার মনে হয়, সংসারে পাওয়া না পাওয়ার  দ্বন্দ্বের মধ্যে টিকে থেকে, একটা নীতি বজায় রেখে, যিনি অন্য মানুষ এবং সমাজের জন্য মঙ্গলজনক কাজ করতে পারেন,  তিনিই আদর্শ মানুষ । এ ধরণের সফলতম একজন মানুষের নাম হযরত মোহাম্মদ (সঃ) । মানুষ ভালো কাজের উদাহরণ দেখতে চায় । একটা  গাইডলাইন চায় । সেদিক দিয়ে নবী করিম (সঃ) আদর্শ এবং অনুসরনীয় । এখানে ইসলাম ধর্ম এবং এ ধর্মের বিধান অনিবার্যভাবে চলে আসে । আমাদের  দেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান এবং ধর্মভীরু । আমার মনে হয়েছে নবীর জীবন দৃষ্টান্ত এবং ধর্মের বিধান ঠিকমত বোঝাতে পারলে,  তাঁদের দ্বারা সমাজে অনেক মঙ্গলকর কাজ করানো সম্ভব । তবে, পৃথিবীর সকল ধর্মের মানুষকে আমি সম্মান করি । শুধু ইসলাম ধর্ম নয়, পৃথিবীর সকল ধর্মের মানুষ আমার লক্ষ্য দল  । সকল ধর্মেই সমাজ ও মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে । আমি আমার লেখায় সেগুলো তুলে ধরি; যেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষ সৎকাজে উদ্বুদ্ধ হয় ।

 

 

এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় । এই  পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশে ধর্ম এমন স্পর্শকাতর বিষয় যে, এখানে সমাজের জন্য কিছু করতে হোলে,  অবশ্যই ধর্মের ছায়াতলে করতে হবে । উদাহরণ হিসাবে রাজা রামমোহন রায়ের কথা বলা যায় । রাজা রামমোহন রায় নিজে যে খুব  ধার্মিক ছিলেন, তা নয় । কিন্তু, তিনি হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের উপর ব্যাপক পড়াশুনা করেন । লেখালেখি করেন । নিজের প্রিয় বৌদিকে জোর করে  তাঁর মৃত স্বামীর জলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারতে দেখে, তিনি মর্মাহত হন । সেদিনই এই জঘন্য অমানবিক প্রথা উচ্ছেদ করার সংকল্প নেন তিনি এবং ১৮১২ সাল থেকে সতীদাহ প্রথা বিরোধী  আন্দোলন শুরু করেন । সতীদাহ প্রথা ৪ ডিসেম্বর, ১৮২৯ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় । কিন্তু, বাস্তবে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত এদেশের মাটিতেও সদ্য হিন্দু বিধবা মেয়েদের শ্মশানে নিয়ে    স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত । রাজা রামমোহন রায় বেদ- উপনিষদ ঘেঁটে দেখিয়েছেন, এটা সনাতন হিন্দু ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থের বিধান নয় । কথিত আছে, দক্ষ রাজার কন্যা শিবের স্ত্রী সতী স্বামীর সাথে জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেন । এই পৌরাণিক কাহিনী থেকেই সতীদাহ প্রথার জন্ম ।  এটা সনাতন হিন্দুধর্মের মৌলিক কোন বিধান নয় । অথচ, একটা হিসাবে দেখা যায়, ১৫০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত এই উপমহাদেশের হাজার হাজার হিন্দু বিধবা মেয়েকে সতীদাহ প্রথার নামে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা হয়েছে । রাজা রামমোহন রায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছের লোক ছিলেন । তাঁর সাথে ছিলেন  উইলিয়াম কেরীর মত ঋষিতুল্য ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত লোকেরা । সর্বোপরি তখন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেনটিঙ্ক । তিনি সাহসী এবং মানবিক গুণসম্পন্ন ছিলেন । হিন্দুদের ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা’র অভিযোগে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ভয় থাকা সত্ত্বেও তিনি  ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর, সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার আইন পাশ করেন ।  

সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে পরবর্তীতে হাজার হাজার হিন্দু বিধবা মেয়ে  স্বামীর জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয়ে পুড়ে মরার হাত থেকে রক্ষা পায় । আমি এই সুযোগে লর্ড উইলিয়াম  বেনটিঙ্কসহ যারা সতীদাহ প্রথার বিলোপ সাধনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন; তাঁদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । 

সমাজের সংঘটিত অপরাধের একটা বড় অংশ ধর্মের অপব্যাখ্যার কারণে হয়ে থাকে । দেশের নীতিনির্ধারণের সাথে যারা জড়িত,  তারাসহ দেশের সাধারণ মানুষের যদি ধর্ম বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকে; তাহলে এমনি এমনিই সমাজের অনেক অপরাধ কমে যায় । এই বিশ্বাস থেকেই আমি  আমার লেখায় ধর্মকে টেনে আনি । 

অনেক লেখা হয়েছে । আজ এ পর্যন্তই । সম্মানিত পাঠক যদি চান- এ লেখা চলমান থাকতে পারে । 

 

সম্মানিত ডাক্তারগণসহ মাঠ পর্যায়ে যারা করোনাভাইরাসের  কারণে সৃষ্ট এই মহাদুর্যোগে জীবনবাজি রেখে কাজ করছেন- তাঁদের সকলের প্রতি  গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি ।

পৃথিবীর সকল মানুষ করোনা ভাইরাসের এই মহাদুর্যোগ থেকে মুক্তি পান – এই প্রত্যাশা । 

৩০ মার্চ, ২০২০ । 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT